মিলিন্দ সোমানের সঙ্গে মধু সাপ্রের জুতার বিজ্ঞাপনচিত্র ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। কোলাজ
মিলিন্দ সোমানের সঙ্গে মধু সাপ্রের  জুতার বিজ্ঞাপনচিত্র ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। কোলাজ

নগ্ন পোজ দিয়ে বিতর্কে, কখনোই মডেল হতে চাননি মধু

ভারতে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম আলোচিত সুপারমডেল মধু সাপ্রেকে আজও অনেকে মনে রাখেন একটিমাত্র ছবির জন্য। ১৯৯৫ সালে মডেল-অভিনেতা মিলিন্দ সোমানের সঙ্গে একটি জুতার বিজ্ঞাপনচিত্রে তাঁর সাহসী উপস্থিতি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। সেই একটি ছবি তাঁকে যেমন আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তেমনি বছরের পর বছর আদালতের লড়াই, পেশাগত ক্ষতি এবং ব্যক্তিগত সংকটও বয়ে আনে। তবে সেই বিতর্কিত ছবির বহু আগে মধু সাপ্রের স্বপ্ন ছিল একেবারেই অন্য রকম। তিনি কখনোই মডেল হতে চাননি।

খেলোয়াড় থেকে মিস ইন্ডিয়া
ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে বেড়ে ওঠেন মধু। বাবার উৎসাহে জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেট হিসেবে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন এবং একাধিক পদক জেতেন। ফ্যাশন–জগতের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্কই ছিল না। একটি অনুষ্ঠানে খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শান্তনু শিওরে তাঁর প্রতি নজর দেন এবং মডেলিংয়ের প্রস্তাব দেন। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন যাত্রা। প্রথম কাজ ছিল একটি পোশাক ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন। এরপর ১৯৯২ সালে প্রায় খেয়ালের বশেই অংশ নেন ফেমিনা মিস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায়।

সেই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে সাপ্রে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায়। সেখানে দ্বিতীয় রানারআপ হয়ে ইতিহাস গড়েন। তখন পর্যন্ত কোনো ভারতীয় প্রতিযোগী শীর্ষ তিনে পৌঁছাতে পারেননি।

ইংরেজিতে দুর্বলতা, কিন্তু সততায় জয়
মিস ইউনিভার্স প্রতিযোগিতায় তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এক দিনের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে কী করতেন? মধু উত্তর দিয়েছিলেন, এক দিনে দেশের দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব নয়। তবে শিল্প ও খেলাধুলার উন্নয়নে কাজ করা জরুরি। কারণ, একজন খেলোয়াড় হিসেবে তিনি নিজেই পর্যাপ্ত মাঠ ও সরঞ্জামের অভাব অনুভব করেছেন।
পরে মধু স্বীকার করেন, ইংরেজিতে সাবলীল না হওয়ায় নিজের ভাবনা ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারেননি। তবু হৃদয়ের কথা বলেছিলেন বলেই আজও সেই উত্তর মানুষের মনে রয়েছে।

যে ছবি বদলে দিল সবকিছু
মিস ইন্ডিয়া হওয়ার পর মধু সাপ্রে দ্রুতই ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় সুপারমডেলদের একজন হয়ে ওঠেন। একের পর এক বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন, চলচ্চিত্রের প্রস্তাব—সবই আসছিল। ঠিক তখনই আসে ১৯৯৫ সালের সেই বহুল আলোচিত বিজ্ঞাপন।
টাফ শুজের প্রচারণার জন্য তোলা সাদা-কালো ছবিতে মধু সাপ্রে ও মিলিন্দ সোমানকে নগ্ন অবস্থায় একটি অজগর সাপ জড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছবিটি প্রকাশের পর শুরু হয় তীব্র বিতর্ক। অশ্লীলতা এবং বন্য প্রাণী সুরক্ষা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালতে সেই মামলা চলতে থাকে টানা ১৪ বছর। শেষ পর্যন্ত দুজনই খালাস পান।

মধু সাপ্রে। এক্স থেকে

‘জানলে কখনোই করতাম না’
বহু বছর পর মধু সাপ্রে বলেন, তিনি কখনোই কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ছবিটি তোলেননি। তাঁর ভাষায়, যদি জানতেন এত বড় বিতর্ক তৈরি হবে, তাহলে কাজটি করতেন না। অনেকেই ভেবেছিলেন, প্রচার পাওয়ার জন্য তিনি এমন ছবি তুলেছিলেন। কিন্তু মধুর দাবি ছিল ভিন্ন।

মধু জানান, অর্থ বা প্রচারের জন্য নয়, ভারতের অন্যতম সেরা আলোকচিত্রী প্রবুদ্ধ দাশগুপ্তের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ থেকেই ছবিটি তুলেছিলেন। এমনকি ওই কাজের জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিকও নেননি।

থমকে যায় চলচ্চিত্রজীবন
বিতর্কের প্রভাব আদালতের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রযোজকদের সংগঠন মধুকে নিয়ে কাজ না করার পরামর্শ দিয়েছিল। মিলিন্দ সোমানের বিপরীতে অমোল পালেকরের একটি ছবিতে অভিনয়ের কথা থাকলেও সেটি আর নির্মিত হয়নি।
পরে আন্তর্জাতিক মডেলিংয়ের ব্যস্ততা এবং দীর্ঘ সময় লন্ডন ও প্যারিসে থাকার কারণে মধুও সেই প্রকল্প থেকে সরে আসেন।

আলোচিত প্রেমের বিচ্ছেদ
মিলিন্দ সোমান ও মধু সাপ্রে একসময় ভারতের সবচেয়ে আলোচিত তারকা জুটির অন্যতম ছিলেন। অনেকেই মনে করেছিলেন, তাঁদের বিয়ে সময়ের অপেক্ষামাত্র। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে মতপার্থক্যের কারণে তাঁদের সম্পর্ক ভেঙে যায়।

ইতালিতে নতুন জীবন
২০০১ সালে ইতালীয় ব্যবসায়ী জিয়ান মারিয়া এমেন্দাতোরিকে বিয়ে করে ইতালিতে চলে যান মধু। সেখানে থেকেও আন্তর্জাতিক মডেলিং চালিয়ে যান। ২০০৩ সালে বুম চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হলেও ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি।

মাতৃত্বের জন্য ছেড়ে দিলেন ক্যারিয়ার
দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক মডেলিং, চলচ্চিত্র ও পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যে জীবন কাটানোর পর ২০১০ সালে তিনি কাজ থেকে বিরতি নেন। কারণ, তিনি মা হতে চেয়েছিলেন। বহু বছর চেষ্টা করার পর ২০১২ সালে জন্ম নেয় তাঁর মেয়ে ইন্দিরা। এরপর অভিনয় ও মডেলিংয়ে পুরোপুরি ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও একের পর এক ব্যক্তিগত বিপর্যয় তাঁকে বদলে দেয়। বাবার মৃত্যু, মানসিক সংকট, বিবাহবিচ্ছেদ এবং পরে ভাইয়ের মৃত্যু—সব মিলিয়ে জীবনের কঠিন সময় পার করতে হয় তাঁকে।
তবু তিনি ভেঙে পড়েননি। মধুর ভাষায়, ‘জীবন বারবার আমাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছে, আর আমি প্রতিবারই নিজে উঠে দাঁড়িয়েছি।’

পরিবারই এখন অগ্রাধিকার
বর্তমানে ইতালিতেই বসবাস করছেন মধু সাপ্রে। মেয়ে ইন্দিরার দেখাশোনায় সময় কাটান। স্কুল, খেলাধুলা, দৈনন্দিন যত্ন—সবকিছুতেই নিজে অংশ নেন। তিনি বলেন, জীবনে মিস ইন্ডিয়া হওয়া, আন্তর্জাতিক সুপারমডেল হিসেবে সাফল্য পাওয়া—সবই অসাধারণ অভিজ্ঞতা। কিন্তু মা হওয়ার পরই তিনি নিজেকে সবচেয়ে পরিপূর্ণ মনে করেছেন।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে