‘টক্সিক’ সিনেমায় যশ। এক্স থেকে
‘টক্সিক’ সিনেমায় যশ। এক্স থেকে

যশের দাপট আছে, কিন্তু গল্প কোথায়—‘টক্সিক’ নিয়ে ৭ অভিযোগ

চার বছর ধরে ‘টক্সিক’-এর অপেক্ষায় ছিলেন ভারতীয় দর্শকেরা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মুক্তি পাওয়া যশ অভিনীত ছবিটি বক্স অফিসে এখন পর্যন্ত ভালো ব্যবসা করলেও দর্শক ও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। বিশেষ করে গল্পের বুনন, নারী চরিত্রের উপস্থাপন, মাত্রাতিরিক্ত অ্যাকশন, অভিনয় ও সম্পাদনা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।

যশের পাশাপাশি ‘টক্সিক’-এ অভিনয় করেছেন কিয়ারা আদভানি, হুমা কুরেশি, তারা সুতারিয়া, রুক্মিণী বসন্ত ও নয়নতারা। গীতু মোহনদাস পরিচালিত ছবিটির প্রচারণায় এই পাঁচ অভিনেত্রীকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ফলে ধারণা তৈরি হয়েছিল, যশের পাশাপাশি গল্পে তাঁদের চরিত্রগুলোরও শক্ত অবস্থান থাকবে। কিন্তু মুক্তির পর সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়েই চলছে আলোচনা। সব মিলিয়ে ‘টক্সিক’ নিয়ে আলোচনায় উঠে আসছে সাতটি বিষয়—

পুরুষতান্ত্রিকতার দাপট
‘টক্সিক’কে বড় পরিসরের বাণিজ্যিক অ্যাকশন ছবি হিসেবে নির্মাণের চেষ্টা স্পষ্ট। কিন্তু সেই চেষ্টায় ছবিটি অনেকটাই পুরুষতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে বলে সমালোচনা করছেন দর্শকদের একাংশ। গীতু মোহনদাসের ছবিতে ছন্দ মিলিয়ে তৈরি কিছু সংলাপও অনেকের কাছে আরোপিত ও শ্রুতিকটু মনে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানের দৃশ্যায়ন ও নির্মাণশৈলীর সঙ্গে ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবির চেনা ‘মসলা’ মেশানোর চেষ্টা রয়েছে। কিন্তু অ্যাকশন, অপরাধ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আবেগ ও চাকচিক্য—সবকিছু একসঙ্গে ধরতে গিয়ে গল্পটি অনেক জায়গায় খেই হারিয়েছে। বিভিন্ন ঘরানাকে এক ছবিতে মেলানোর এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ছবির নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকেই দুর্বল করেছে বলে মত অনেকের।

‘টক্সিক’–এ কিয়ারা ও যশ। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

নারী চরিত্র আছে, বিকাশ নেই
মুক্তির আগে ‘টক্সিক’-এর অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল পাঁচ অভিনেত্রীকে। পর্দায় তাঁদের উপস্থিতিও বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে চরিত্রগুলোর নির্মাণে। তাঁদের প্রত্যেকের গল্প শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে যশের চরিত্রটিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।

ফলে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের নিজস্ব সংকট, আকাঙ্ক্ষা কিংবা ব্যক্তিত্ব খুব একটা বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। বিশেষ করে একজন নারী নির্মাতার ছবিতে নারী চরিত্রগুলোর আরও দৃঢ় ও স্বতন্ত্র অবস্থান প্রত্যাশা করেছিলেন অনেকে। সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় বিষয়টি আরও বেশি আলোচনায় এসেছে।

নারীবাদের দাবি নিয়ে প্রশ্ন
ছবির প্রচারণার সময় নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের কথায় ‘টক্সিক’-এর নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রসঙ্গ এসেছিল। মুক্তির পর সেই দাবিই এখন প্রশ্নের মুখে। সমালোচকদের একাংশের মতে, ছবির নারীরা স্বাধীন ও শক্তিশালী হিসেবে হাজির হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের জীবন ও আবেগ মূল পুরুষ চরিত্রটির ভালোবাসা, কামনা, আকর্ষণ কিংবা ঘৃণার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কোনো কোনো দৃশ্যে নারী চরিত্রগুলোকে ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেয়ে তাঁদের যৌন আবেদনকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে ছবির নারীবাদী অবস্থান আসলে কতটা গভীর, সেই প্রশ্ন উঠছে।

‘টক্সিক’–এ যশ। এক্স থেকে

যশের অভিনয়ে বাড়াবাড়ি
‘টক্সিক’ যে মূলত যশকে ঘিরেই নির্মিত, ছবির শুরু থেকেই তা স্পষ্ট। প্রথমার্ধের বড় অংশজুড়ে তাঁর চেনা দাপুটে উপস্থিতি, হাঁটাচলা, সংলাপ বলার ধরন ও নায়কোচিত উপস্থিতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয়ার্ধে চরিত্রটির তরুণ বয়স সামনে আসার পর গল্পে আরও নাটকীয় গভীরতার সুযোগ তৈরি হয়। দুই সময়ের চরিত্রে পার্থক্য আনতে যশ শারীরিক ভঙ্গি ও অভিনয়ের ধরনেও পরিবর্তন এনেছেন। তবে কিছু দৃশ্যে তাঁর অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি নাটকীয় হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়েছে সমালোচকদের একাংশের। চরিত্রের আবেগের চেয়ে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ তারকা যশকে তুলে ধরার প্রবণতাই সেখানে বেশি চোখে পড়ে।

অ্যাকশনের চাপে হারিয়েছে আবেগ
‘টক্সিক’-এর প্রায় পুরোটা জুড়েই অ্যাকশনের দাপট। কথায় কথায় গোলাগুলি, সংঘর্ষ ও হত্যার দৃশ্য এসেছে। কোনো কোনো জায়গায় সহিংসতার মাত্রাও বেশ তীব্র।
অথচ গল্পে বাবা-ছেলের সম্পর্ক, ভাই-বোনের বন্ধন, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, অপরাধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মতো আবেগনির্ভর অনেক উপাদান রয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই সেভাবে দর্শকের মনে দাগ কাটার সুযোগ পায়নি। আবেগ তৈরির আগেই পর্দা চলে গেছে আরেকটি অ্যাকশন দৃশ্য, গোলাগুলি কিংবা চাকচিক্যের দিকে। ফলে গল্পের মানবিক দিকগুলো ক্রমেই আড়ালে পড়ে গেছে।

দৃশ্য ঝকঝকে, সম্পাদনায় তাল কেটেছে
দৃশ্যায়ন ও গ্রাফিকস ‘টক্সিক’-এর বড় শক্তি। বড় পর্দায় ছবির অনেক দৃশ্যই চমক তৈরি করে। কিন্তু সেই চমক গল্প বলার ক্ষেত্রে সব সময় কাজে আসেনি। বরং সম্পাদনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে।

ছবিতে ঘটনা, চরিত্র ও উপকরণের অভাব নেই। সমস্যা হলো, সেগুলো সব সময় স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় এগোয়নি। এক ঘটনা থেকে আরেক ঘটনায় যাওয়ার ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও ছন্দপতন ঘটেছে। ফলে গল্প সহজ হওয়ার বদলে আরও জটিল মনে হয়েছে। দর্শকের সঙ্গে চরিত্র ও ঘটনার আবেগপ্রবণ সংযোগ তৈরির আগেই দৃশ্য বদলে যাওয়ায় ছবির দৈর্ঘ্যও কোনো কোনো সময় ভারী মনে হয়েছে।

জমকালো শেষ, কিন্তু অর্থ কোথায়
বরফে ঢাকা এলাকায় ছবির চূড়ান্ত লড়াইয়ের দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে জমকালো। অ্যাকশনের পাশাপাশি সেখানে ‘রায়া’কে—যশ অভিনীত চরিত্র—নিজের অতীতের ভুলগুলোর মুখোমুখি হতে দেখা যায়। যশের দ্বৈত চরিত্রের উপস্থিতিও শেষ অংশে আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

দৃশ্যায়ন, আবহ ও অ্যাকশনের দিক থেকে শেষ অংশটি নজরকাড়া হলেও গল্পের এত দীর্ঘ যাত্রার পর যে আবেগপ্রবণ বা নাটকীয় পরিণতি প্রত্যাশিত ছিল, তা পাওয়া যায়নি বলে মত অনেক সমালোচকের। বরং শেষ দৃশ্যটি আরও কিছু প্রশ্ন রেখে যায়। চোখধাঁধানো আয়োজন আছে, যশের তারকাসুলভ উপস্থিতিও আছে; কিন্তু গল্পের সমাপ্তি হিসেবে প্রয়োজনীয় গভীরতা ও তৃপ্তির জায়গাটিই থেকে গেছে অপূর্ণ।