ঋষি কাপুর
ঋষি কাপুর

টাকা দিয়ে পুরস্কার কিনে অনুশোচনায় পুড়েছেন এ বলিউড তারকা

মাত্র তিন বছর বয়সে সিনেমার পর্দায় দেখা দিয়েছিলেন ঋষি কাপুর। রাজ কাপুর ও নার্গিস ছাতা মাথায় ‘প্যায়ার হুয়া, ইকরার হুয়া’ গাইতে গাইতে রাস্তা ধরে হাঁটছেন, পাশ দিয়ে রেইনকোট পরা তিনটি শিশু চলে যাচ্ছে। ১৯৫৫ সালের ‘শ্রী ৪২০’ ছবির সেই শিশুদের একজন ঋষি। বাবার সঙ্গে শুটিং দেখতে গিয়ে নার্গিসের দেওয়া চকলেটের লোভে দৃশ্যটিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। সেই শিশুই পরে হয়ে ওঠেন হিন্দি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় রোমান্টিক নায়ক। আজ ৪ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে জন্মেছিলেন তিনি।

পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন ঋষি কাপুর। তবে একটি পুরস্কার তাঁকে আনন্দের চেয়ে বেশি দিয়েছে অস্বস্তি। কারণ, সেটি পেতে নাকি নিজেই টাকা দিয়েছিলেন অভিনেতা। জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে নিজের সেই কাজের কথা প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছিলেন ঋষি।
১৯৭৩ সালে মুক্তি পায় ‘ববি’। রাজ কাপুর পরিচালিত ছবিটিতে ঋষির নায়িকা ছিলেন ডিম্পল কাপাডিয়া। কিশোর প্রেমের এই ছবি মুক্তির পর ভারতজুড়ে সাড়া পড়ে যায়। রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠেন ঋষি। ছবিটির জন্য ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতার পুরস্কারও পান তিনি।

কিন্তু বহু বছর পর ঋষি জানান, পুরস্কারটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে তাঁর নিজেরই সংশয় ছিল। আত্মজীবনী ‘খুল্লাম খুল্লা: ঋষি কাপুর আনসেন্সরড’ এবং পরবর্তী বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, এক ব্যক্তি তাঁকে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে পুরস্কারটি পাইয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তারুণ্যের উত্তেজনায় সেই প্রস্তাবে রাজি হয়ে টাকা দিয়েছিলেন ঋষি।

অগ্নিপথ ছবিতে ঋষি কাপুর

অভিনেতার ভাষ্যে, তিনি নিশ্চিত ছিলেন না ওই টাকা সত্যিই আয়োজকদের কারও কাছে পৌঁছেছিল, নাকি মধ্যস্থতাকারী তাঁকে ঠকিয়েছিলেন। তাই সরাসরি পুরস্কার ‘কিনেছিলেন’—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছাতে চাননি। তবে টাকা দেওয়ার বিষয়টি তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। পরে এ নিয়ে গভীর অনুশোচনাতেও ভুগেছেন।
ঋষির অস্বস্তির আরেকটি কারণ ছিলেন অমিতাভ বচ্চন। সে বছর ‘জঞ্জির’ ছবিতে অভিনয় করেছিলেন অমিতাভ। ছবিটি তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল বলিউডের নতুন ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ হিসেবে। ঋষির ধারণা ছিল, সেরা অভিনেতার পুরস্কারটি অমিতাভের প্রাপ্য ছিল। ‘ববি’র জন্য নিজের পুরস্কারপ্রাপ্তি দুজনের সম্পর্কের শুরুতেও কিছুটা দূরত্ব তৈরি করেছিল বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

‘ববি’ অবশ্য শুধু ঋষিকে একটি পুরস্কারই দেয়নি, হিন্দি সিনেমাকে দিয়েছিল নতুন প্রজন্মের এক রোমান্টিক নায়ক। ছবিতে তাঁর তারুণ্য, পোশাক, হাসি ও প্রেমিকসুলভ উপস্থিতি দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল।

‘ববি’তে ডিম্পল কাপাডিয়া ও ঋষি কাপুর

পরের দুই দশক ‘লাইলা মজনু’, ‘সারগাম’, ‘কর্জ’, ‘প্রেম রোগ’, ‘চাঁদনি’, ‘হেনা’, ‘বোল রাধা বোল’সহ একের পর এক ছবিতে প্রেমিক নায়কের পরিচয়টি আরও পোক্ত করেন তিনি।তবে ঋষির যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও আগে। ১৯৭০ সালে বাবা রাজ কাপুর পরিচালিত ‘মেরা নাম জোকার’ ছবিতে কিশোর রাজুর চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সেই অভিনয়ের জন্য শিশুশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। অর্থাৎ নায়ক হিসেবে যাত্রার আগেই অভিনয়ের স্বীকৃতি তাঁর হাতে উঠেছিল।ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পর্বে রোমান্টিক নায়কের চেনা ছক ভেঙে চরিত্রাভিনেতা হিসেবেও নিজেকে নতুনভাবে তুলে ধরেন ঋষি।

‘অগ্নিপথ’, ‘ডি-ডে’, ‘কাপুর অ্যান্ড সন্স’, ‘মুলক’ ও ‘১০২ নট আউট’–এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়। নিজের বয়স ও পর্দার ভাবমূর্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহসই তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও প্রাসঙ্গিক রেখেছিল।

মা নিতু সিং (বাঁয়ে) ও বাবা ঋষি কাপুরের সঙ্গে রণবীর কাপুর (মাঝে)

‘ববি’র পুরস্কার নিয়ে ঋষির স্বীকারোক্তি তাঁর জীবনের এক বিব্রতকর অধ্যায়। তবে ভুলটি আড়াল না করে প্রকাশ্যে বলার সাহসও তাঁর অকপট ব্যক্তিত্বের পরিচয় দেয়। ২০২০ সালের ৩০ এপ্রিল ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে মুম্বাইয়ে মারা যান ঋষি কাপুর। কিন্তু ‘শ্রী ৪২০’র সেই ছোট্ট শিশু থেকে ‘ববি’র প্রেমিক তরুণ এবং পরিণত বয়সের শক্তিমান চরিত্রাভিনেতা—পর্দায় রেখে যাওয়া তাঁর দীর্ঘ যাত্রা এখনো দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।