পরিণীতি চোপড়া
পরিণীতি চোপড়া

‘সন্তানের দায়িত্ব আমরা ৫০-৫০ ভাগ করে নিয়েছি’

মা হওয়ার পর অনেকটাই বদলে গেছে বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়ার জীবন। এখন তাঁর প্রতিটি পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকে ছোট্ট ছেলে নীর। তবে মাতৃত্বের কারণে অভিনয়জীবনে বিরতি টানতে চান না তিনি; বরং সংসার ও সন্তান সামলে আরও ভালো চরিত্রে অভিনয় করতে চান। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই করেছেন নেটফ্লিক্সের সিরিজ শক: ট্রাস্ট নো ওয়ান–এর শুটিং। নতুন এই সিরিজ, মাতৃত্বের অভিজ্ঞতা, অভিনয়জীবনের চ্যালেঞ্জ এবং রাজনীতিবিদ স্বামী রাঘব চাড্ডার সঙ্গে সংসার নিয়ে সম্প্রতি মুম্বাইয়ে নেটফ্লিক্সের কার্যালয়ে প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্যের সঙ্গে কথা বলেছেন পরিণীতি চোপড়া

আলাপের শুরুতেই শক: ট্রাস্ট নো ওয়ান–এর চিত্রনাট্য হাতে পাওয়ার পর কী হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা শোনালেন পরিণীতি, ‘আমি প্রচুর বই পড়ি। এটা আমার অন্যতম অভ্যাস। কিন্তু চিত্রনাট্য পড়ার সময় মাঝেমধ্যে মন অন্যদিকে চলে যায়। তাই সাধারণত কাউকে পড়ে শোনাতে বলি। সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রা ও রেনসিল স্যার যখন চিত্রনাট্যটি পাঠালেন, তখন আমি শহরের বাইরে ছিলাম। ভেবেছিলাম, শেষ করতে দু-তিন দিন লাগবে। অথচ আড়াই ঘণ্টায় এক বসায় পুরোটা পড়ে ফেলি। শেষ পাতা পড়েই মনে হয়েছিল, আমাকে এই সিরিজে অভিনয় করতেই হবে।’
শুধু গল্প নয়, সিরিজটির সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর জন্যও কাজটি করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন পরিণীতি। তাঁর কথায়, ‘চিত্রনাট্যটা এতটাই দুর্দান্ত ছিল যে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া বোকামি হতো। তার ওপর নেটফ্লিক্সের সঙ্গে কাজের সুযোগ, সিদ্ধার্থের মতো প্রযোজক আর রেনসিল স্যারের পরিচালনা। সব মিলিয়ে আমার কাছে এটা ছিল বিশেষ একটি কাজ।’

অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় শুটিং
শক: ট্রাস্ট নো ওয়ান–এর শুটিংয়ের সময় অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন পরিণীতি। জীবনের এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন ছিল? প্রশ্ন শুনে অভিনেত্রী জানান, পুরো ইউনিটের সহযোগিতায় কাজটি সহজ হয়ে উঠেছিল। ‘শুটিংয়ের সময় সবাই আমার খুব খেয়াল রেখেছেন। এমন পরিবেশে কাজ করেছি, যেখানে কোনো বাড়তি চাপ ছিল না। আমরাও একে অপরকে সহযোগিতা করেছি। ফলে শুটিংয়ের সময়সূচিতে কোনো সমস্যা হয়নি।’


শুধু সহকর্মীরা নন, পরিবারের সদস্যরাও সেই সময় পাশে ছিলেন। বিশেষ করে স্বামী রাঘব চাড্ডার সহযোগিতার কথা বলতে গিয়ে পরিণীতির কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা। ‘খবরটা শোনামাত্রই রাঘব শিমলায় ছুটে এসেছিল। আমার মা, শাশুড়ি, এমনকি ভাইয়েরাও আমাকে দেখতে এসেছিল। সবাই হয়তো ভাবছিল, পরিণীতির পুরো পরিবার কি শুটিংয়ে চলে এসেছে?’
সেই সময়ের একটি মজার স্মৃতিও শোনালেন অভিনেত্রী। ‘আমরা মজা করে বলতাম, এটা যেমন নীরের (সন্তানের) ডেবু, তেমনি ওয়েব–দুনিয়ায় আমারও ডেবু। তাই এই সিরিজ আমার কাছে সব সময় বিশেষ হয়ে থাকবে।’

পরিণীতি চোপড়া

‘মা হয়েছি বলে অভিনয় ছাড়ব কেন’
মাতৃত্বের পর অভিনয়জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবছেন পরিণীতি। তবে মা হয়েছেন বলে কাজ থেকে সরে দাঁড়ানোর কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই; বরং সন্তান জন্মের পর অভিনেত্রীদের কাজের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়েই বেশি ভাবেন তিনি। পরিণীতির কথায়, ‘মা হয়েছি বলে কাজ করা বন্ধ করে দিতে চাই না। তবে বিষয়টি দুই দিকের। আমাকে কাজের প্রস্তাবও পেতে হবে। সন্তান জন্ম দেওয়ার মতো এত গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। এরপর শুধু মা হয়েছি বলে যদি কাজের সুযোগ হারাতে হয়, সেটা আমার খুব খারাপ লাগবে।’

বলিউডে এখন অনেক অভিনেত্রীই মা হওয়ার পর নিয়মিত কাজ করছেন। বিষয়টিকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখেন পরিণীতি। প্রসঙ্গক্রমে উঠে আসে আলিয়া ভাট, দীপিকা পাড়ুকোন ও তাঁর দিদি প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার নাম। ‘আমি খুব খুশি যে আমাদের প্রজন্মের অভিনেত্রীরা মা হওয়ার পরও কাজ করতে পারছে। আলিয়া, দীপিকা, আমি কিংবা আমার দিদি প্রিয়াঙ্কা—সবাই কাজ করছি। প্রিয়াঙ্কা পশ্চিমা ছবিতেও কাজ করছে। আমরা সবাই ভালো কাজ করছি; বরং আমার মনে হয়, এখন আমরা আরও ভালো কাজ করছি।’
অভিনয়ের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু, ঘোরাঘুরি কিংবা নিজের জন্য সময় রাখা—সবকিছুই পরিণীতির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বরাবরই ব্যক্তিজীবন ও কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু মা হওয়ার পর সেই ভারসাম্যের হিসাবও বদলে গেছে। ‘আমি সব সময় জীবনে ভারসাম্যকে গুরুত্ব দিয়েছি। কাজের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধু, ঘোরাঘুরি, ছুটি কাটানো, উৎসব আর নিজের জন্য সময়—সবই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’

পরিণীতি চোপড়া

সন্তানের দায়িত্ব দুজনেরই
পরিণীতির স্বামী রাঘব চাড্ডা রাজনীতির মানুষ। তাঁরও ব্যস্ততা কম নয়। অন্যদিকে শুটিং, প্রচার ও নানা আয়োজনে ব্যস্ত থাকতে হয় পরিণীতিকে। তাহলে ছোট্ট ছেলের দেখাশোনা করেন কে? প্রশ্ন শুনে পরিণীতি জানান, সন্তানের দায়িত্ব দুজনেই সমানভাবে ভাগ করে নিয়েছেন। ‘সন্তানের দায়িত্ব আমরা ৫০-৫০ ভাগ করে নিয়েছি। আমরা দুজনেই মা-বাবা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাই সন্তানের দায়িত্বও আমাদের দুজনেরই। আমি কাজে থাকলে রাঘব ছেলের সঙ্গে থাকে। আবার রাঘব কাজে থাকলে আমি ছেলের দায়িত্ব নিই।’

শুধু সন্তানের দেখাশোনা নয়, অভিনয়ের ব্যস্ততার মধ্যেও স্বামীর কাছ থেকে ভরসা পান পরিণীতি। ক্লান্তিকর দিনের শেষে রাঘবের সহযোগিতাই তাঁকে নতুন করে কাজের শক্তি জোগায়।

২০২৩ সালে গাঁটছড়া বাঁধেন আম আদমি পার্টির সংসদ সদস্য রাঘব চাড্ডা আর বলিউড অভিনেত্রী পরিণীতি চোপড়া

হালকা হেসে অভিনেত্রী বলেন, ‘এমন অনেক দিন যায়, যখন আমি একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সেই সময় রাঘব আমার পাশে থাকে। যখন বলি, আমাকে কাজ করতেই হবে, আমি পারব, তখন ও বলে, “তুমি যাও, বাকি সব আমি সামলে নেব।” এই সহযোগিতা আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার।’

দুই জগতের দুই মানুষ
একজন বলিউড অভিনেত্রী, অন্যজন রাজনীতিবিদ। পেশাগতভাবে পরিণীতি চোপড়া ও রাঘব চাড্ডার জগৎ একেবারেই আলাদা। সংসারে দুজনের বোঝাপড়া ভালো হলেও একে অপরের পেশাগত বিষয়ে খুব একটা নাক গলান না তাঁরা। এ প্রসঙ্গ উঠতেই হেসে ফেললেন পরিণীতি। জানান, রাজনীতির জটিল হিসাব যেমন তাঁর অজানা, তেমনি সিনেমার দুনিয়া থেকেও অনেকটাই দূরে রাঘব। ‘রাঘবের সংসদীয় বক্তৃতা বা নির্বাচন নিয়ে আমার তেমন জ্ঞান নেই। তাই সেসব বিষয়ে ওকে পরামর্শ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। একইভাবে সিনেমার চিত্রনাট্য নিয়েও ওর পরামর্শ না নেওয়াই ভালো।’
স্বামী যে তাঁর অভিনয়জগৎ সম্পর্কে কতটা অনভিজ্ঞ, তার একটি মজার উদাহরণও দিলেন পরিণীতি। ‘এমনও হয়েছে, কোথাও আমার গান বাজছে, আর আমাকে ওকে বলতে হয়েছে, এটা আমার গান!’ কথাটি বলেই হেসে ওঠেন অভিনেত্রী। এরপর যোগ করেন, ‘তাই কাজের ক্ষেত্রে একে অপরের থেকে দূরে থাকাই ভালো।’