বলিউডে সাফল্যের সংজ্ঞা প্রায়ই নির্ধারিত হয় প্রচার আর জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে। কিন্তু এমন কিছু অভিনেতা আছেন, যাঁদের অবদান দীর্ঘদিন ধরে আড়ালেই থেকে যায়। তেমনই এক নাম রাকেশ বেদি। প্রায় পাঁচ দশকের ক্যারিয়ার শেষে এসে তিনি পেলেন সেই স্বীকৃতি, যা বহু আগেই প্রাপ্য ছিল।
স্বপ্নের জন্য বিদ্রোহ
দিল্লির মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম রাকেশ বেদির। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল। কিন্তু পরিবার চেয়েছিল তিনি ইঞ্জিনিয়ার হন। সেই লক্ষ্যেই তাঁকে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউটস অব টেকনোলজির ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়।
তবে জীবনের মোড় ঘুরে যায় এক সিদ্ধান্তে। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পথে না গিয়ে রাকেশ বেদি ভর্তি হন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়াতে। সেই সময় এই সিদ্ধান্ত ছিল ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু এটাই তাঁর শিল্পীজীবনের ভিত গড়ে দেয়।
ক্যারিয়ারের শুরু ও ধীরে এগোনো পথ
১৯৭৬ সালে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু। প্রথম থেকেই রাকেশ বেদি নিয়মিত কাজ করলেও খুব কম সময়েই প্রধান চরিত্রে সুযোগ পেয়েছেন। বলিউডে তখন শক্তিশালী নায়ককেন্দ্রিক ধারার আধিপত্য, যেখানে পার্শ্বচরিত্রের অভিনেতাদের গুরুত্ব সীমিত। তবু তিনি থেমে থাকেননি। ছোট ছোট চরিত্রে, কখনো কমেডিয়ান, কখনো পার্শ্বচরিত্র—সব জায়গাতেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন।
বড় তারকাদের সঙ্গে কাজ, তবু আড়ালে
রাকেশ বেদি কাজ করেছেন সঞ্জীব কুমার, ঋষি কাপুর, অমিতাভ বচ্চন, দেব আনন্দের মতো বড় তারকাদের সঙ্গে। ‘চশমে বাদ্দুর’ তাঁকে জনপ্রিয়তা দেয়। এরপর ‘মেরা দামাদ’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর কমিক উপস্থিতি দর্শকের নজর কাড়ে। কিন্তু এই জনপ্রিয়তা তাঁকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়নি। বরং তিনি থেকে যান ‘সহ-অভিনেতা’ হিসেবেই।
টেলিভিশনে প্রতিষ্ঠা, কিন্তু একঘেয়েমি
টেলিভিশনই রাকেশ বেদিকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। ‘ইয়ে জো হ্যায় জিন্দেগী’, ‘শ্রীমাণ শ্রীমতি’, ‘ইয়েস বস’, ‘ভাবিজি ঘর পর হ্যায়’, ‘তারক মেহতা কা ওলট চমশা’ ধারাবাহিকগুলো তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। তবে এরও একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। তাঁকে প্রায়ই একই ধরনের কমেডি চরিত্রে দেখা যেত। ফলে অভিনয়ের বিস্তার সীমিত হয়ে পড়ে।
নিজের স্বীকারোক্তি
একাধিক সাক্ষাৎকারে রাকেশ বেদি বলেছেন, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি কখনো নিজেকে তারকা মনে করেননি। কাজই ছিল তাঁর একমাত্র পরিচয়। এই স্বীকারোক্তি তাঁর অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে—তিনি ছিলেন একজন কর্মী অভিনেতা, যিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন না।
মোড় ঘোরানো মুহূর্ত
পরিবর্তন আসে পরিচালক আদিত্য ধরের হাত ধরে। ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্টাইক’-এ ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রাকেশ বেদির অভিনয় নজর কাড়ে পরিচালকের। পরবর্তী সময়ে সেই আস্থার ফল হিসেবে তিনি পান বড় সুযোগ—‘ধুরন্ধর’ সিনেমার দুই কিস্তিতে। এরপরের গল্প তো সবারই জানা।
নতুন পরিচয়ে রাকেশ বেদি
‘ধুরন্ধর’–এ ‘জমিল জামালি’ চরিত্রে রাকেশ বেদি হাজির হন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। এখানে নেই চেনা কমেডির ছাপ, বরং আছে গভীরতা, নিয়ন্ত্রণ আর পরিণত অভিনয়। এই চরিত্রই তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। দর্শক নতুন করে আবিষ্কার করেন তাঁকে।
বক্স অফিসে ঝড়
‘ধুরন্ধর’ ফ্র্যাঞ্চাইজি শুধু সমালোচকদের প্রশংসাই পায়নি, বক্স অফিসেও নজির গড়েছে। দুই চলচ্চিত্র মিলিয়ে আয় ছাড়িয়েছে ২০০০ কোটি রুপি। এই বিপুল সাফল্যের সঙ্গে রাকেশ বেদির নামও নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে।
মুম্বাইয়ে প্রথম জীবনে টিকে থাকার জন্য নানা ধরনের ছোট কাজ করেছেন। কখনো পারিশ্রমিক কম, কখনো চরিত্র ছোট—তবু রাকেশ বেদি কাজ করে গেছেন। এই ধারাবাহিকতা ও ধৈর্যই শেষ পর্যন্ত তাঁকে এনে দিয়েছে প্রাপ্য সম্মান।
ইন্ডিয়াডকম অবলম্বনে