‘কুলি’র সেটে প্রায় মৃত্যুর মুখে চলে গিয়েছিলেন। একসময় ঋণের বোঝা, মামলা আর কাজ না পাওয়ার হতাশায় ডুবেছিলেন। রাজনৈতিক বিতর্কেও জড়িয়েছিল তাঁর নাম। তবু প্রতিবারই ফিরে এসেছেন অমিতাভ বচ্চন। আজ ১১ অক্টোবর অমিতাভ বচ্চনের ৮৪তম জন্মদিন। তাঁর জীবনে ঘটনার অভাব নেই, জন্মদিনে আবারও চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক জানা–অজানা সেই ঘটনাগুলোতে।
১৯৪২ সালের এই দিনে উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে (বর্তমানে প্রয়াগরাজ) জন্মেছিলেন অমিতাভ। কবি হরিবংশ রাই বচ্চন ও তেজি বচ্চনের ছেলে হিসেবে বেড়ে ওঠা এই অভিনেতার জীবনের শুরুটা অবশ্য আজকের তারকাসুলভ জৌলুশে মোড়া ছিল না। লম্বা গড়ন ও ভারী কণ্ঠস্বরের কারণে চলচ্চিত্রজগতে শুরুর দিকে তাঁকে নিয়ে সংশয় ছিল। সেই কণ্ঠস্বরই পরে হয়ে ওঠে তাঁর অন্যতম পরিচয়। আর যে চেহারা একসময় প্রচলিত নায়কের ছাঁচে ঠিকমতো খাপ খেত না, সেটিই একসময় ভারতীয় মধ্যবিত্তের ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
আরও অমিতাভ ১বাবা কবি হরিবংশ রাই বচ্চন প্রথমে ছেলের নাম ‘ইনকিলাব’ রাখার কথা ভেবেছিলেন। পরে কবি সুমিত্রানন্দন পন্তের পরামর্শে নাম রাখা হয় অমিতাভ।১৯৬৯ সালে ‘সাত হিন্দুস্তানি’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর।‘জঞ্জির’ বদলে দেয় জীবন। এটি তাঁকে তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ছবিটি তাঁর ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ পরিচয় তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখে।‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ পরিচয়: ‘দিওয়ার’, ‘শোলে’, ‘ত্রিশূল’ ও ‘কালা পাথর’-এর মতো ছবিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ক্ষুব্ধ তরুণের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি জনপ্রিয়তা পান।অমিতাভের বহু সিনেমায় চরিত্রের নাম ছিল বিজয়। তবে ২০টির বেশি ছবিতে এই নাম ছিল।
যে দুর্ঘটনায় থমকে গিয়েছিল পুরো দেশ
১৯৮২ সালের ২৬ জুলাই। বেঙ্গালুরুতে মনমোহন দেশাইয়ের ‘কুলি’ সিনেমার শুটিং চলছিল। সহ-অভিনেতা পুনীত ইসারের সঙ্গে একটি মারপিটের দৃশ্য করতে গিয়ে গুরুতর আহত হন অমিতাভ। দৃশ্য অনুযায়ী, লাফ দিয়ে একটি টেবিলের ওপর পড়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু সময়ের সামান্য এদিক-ওদিক তাঁকে টেবিলের কোণে আঘাত পেতে বাধ্য করে। আঘাত লাগে পেটে, ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্ত্র।
শুরুতে ঘটনাটি শুটিংয়ের সাধারণ দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও দ্রুত পরিষ্কার হয়ে যায়, পরিস্থিতি ভয়াবহ। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসা চলে। একাধিক অস্ত্রোপচার করতে হয়। চিকিৎসকেরা তাঁর জীবন বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। ভারতজুড়ে ভক্তদের উদ্বেগ আর প্রার্থনার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন তিনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে ১৯৮২ সালের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনে অমিতাভের সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থার বিস্তারিত তুলে ধরেছিল। দুর্ঘটনার পর কয়েক মাস ধরে তাঁর সুস্থ হয়ে ওঠার লড়াই চলেছিল। অমিতাভ নিজেও পরবর্তী সময়ে ঘটনাটিকে নতুন জীবন পাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন।
এই দুর্ঘটনা শুধু একজন অভিনেতার জীবনকেই ওলটপালট করেনি, বদলে দিয়েছিল ‘কুলি’ সিনেমার ভাগ্যও। পরিচালকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছবির শেষ দিকে অমিতাভের চরিত্রের মৃত্যুর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁকে হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন দর্শকেরা পর্দায়ও তাঁর মৃত্যু মেনে নিতে পারবেন না—এমন ভাবনা থেকে বদলে দেওয়া হয় ছবির সমাপ্তি। ১৯৮৩ সালে মুক্তির পর ‘কুলি’ হয়ে ওঠে বছরের অন্যতম বড় ব্যবসাসফল সিনেমা।
ক্যারিয়ারের কোনো পর্যায়েই আমি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম না।অমিতাভ বচ্চন
দুর্ঘটনার পর শুটিংয়ে ফেরার ঘটনাটিও ছিল স্মরণীয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ঋষি কাপুরের স্মৃতিচারণার উল্লেখ রয়েছে—অমিতাভের প্রত্যাবর্তনের শুটিং দেখতে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। যে দৃশ্যে আঘাত পেয়েছিলেন, সেখান থেকেই আবার শুটিং শুরু করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন অমিতাভ। যেন নিজের ভয়কে জয় করে আবার দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।
তবে এই দুর্ঘটনার শারীরিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়। ২০১৭ সালে হেপাটাইটিস-বি সচেতনতা কার্যক্রমে অমিতাভ জানিয়েছিলেন, দুর্ঘটনার পর রক্তসঞ্চালনের সময় সংক্রমিত রক্তের মাধ্যমে তাঁর শরীরে হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস প্রবেশ করে। বহু বছর পর, ২০০০ সালে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বিষয়টি ধরা পড়ে। তখন তিনি জানান, তাঁর যকৃতের প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
রাজেশ খান্নার সঙ্গে দূরত্ব, ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’-এর উত্থান
অমিতাভের উত্থানের গল্প বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় সত্তরের দশকের শুরুতে। তখন হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়কদের একজন রাজেশ খান্না। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। সেই সময়ই ‘আনন্দ’ (১৯৭১) ও ‘নমক হারাম’–এর (১৯৭৩) মতো ছবিতে রাজেশের পাশে অভিনয় করেন অমিতাভ।
‘আনন্দ’-এ রাজেশ খান্নার প্রাণবন্ত চরিত্রের বিপরীতে অমিতাভের সংযত, অন্তর্মুখী চিকিৎসকের অভিনয় দর্শকের নজর কাড়ে। ‘নমক হারাম’-এও দুজনের অভিনয় ছিল আলোচনায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে দর্শকের পছন্দ। সামাজিক বৈষম্য, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ক্ষুব্ধ তরুণের চরিত্র তখন পর্দায় নতুন আবেদন তৈরি করছে। অমিতাভের গম্ভীর কণ্ঠ, দীর্ঘদেহী উপস্থিতি এবং চাপা ক্রোধ সেই চরিত্রের জন্য যেন আদর্শ হয়ে ওঠে।
আমাদের সবাইকে মেনে নিতে হবে যে বয়স বাড়বেই। আর বয়স বাড়াটা সব সময় যে চেহারার জন্য সুখকর হবে, তা নয়অমিতাভ বচ্চন
‘জঞ্জির’ (১৯৭৩), ‘দিওয়ার’ (১৯৭৫), ‘শোলে’ (১৯৭৫) ও ‘ডন’ (১৯৭৮) তাঁকে পৌঁছে দেয় অন্য উচ্চতায়। তৈরি হয় ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ পরিচয়। রাজেশ খান্নার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে। তবে তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্যের চেয়ে পেশাগত দূরত্ব ও বদলে যাওয়া
আরও অমিতাভ ২‘ডন’, ‘কসমে ওয়াদে’, ‘দ্য গ্রেট গ্যাম্বলার’, ‘সত্তে পে সত্তা’ ও ‘সূর্যবংশম’-এর মতো ছবিতে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছেন।‘মহান’ ছবিতে তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন।‘লাওয়ারিস’, ‘সিলসিলা’ ও ‘তুফান’-এর মতো ছবিতে গান গেয়েছেন অমিতাভ।‘মুকাদ্দর কা সিকান্দার’, ‘মিস্টার নটওরলাল’, ‘সিলসিলা’ ও ‘সুহাগ’-এর মতো ছবিতে রেখার সঙ্গে তাঁর জুটি দর্শকের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।১৯৮৪ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন অমিতাভ। এলাহাবাদ আসন থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে জয়ী হন।১৯৮৭ সালে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেন তিনি।
তারকাখ্যাতির গল্পই বেশি স্পষ্ট।
১৯৯০ সালে হিন্দুস্তান টাইমসে প্রকাশিত এক যৌথ সাক্ষাৎকারে দুই অভিনেতা দীর্ঘ বিরতির পর একসঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেখানে তাঁদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য ও অস্বস্তি থাকলেও কথোপকথন এগিয়েছিল স্মৃতিচারণার মধ্য দিয়ে। এ ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, তারকাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার গল্প পর্দার বাইরেও দর্শকের আগ্রহ তৈরি করলেও, সব দূরত্বকে ব্যক্তিগত বিবাদ বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
রাজনীতি, বফর্স বিতর্ক ও আস্থার সংকট
অমিতাভের জীবনে বিতর্কের আরেকটি বড় অধ্যায় রাজনীতি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব ছিল দীর্ঘদিনের। ১৯৮৪ সালে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এলাহাবাদ আসন থেকে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন তিনি এবং জয়ী হন। কিন্তু সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর পথ দীর্ঘ হয়নি। ১৯৮৭ সালে সংসদ সদস্যের পদ ছেড়ে দেন।
এরপর বফর্স কামান কেনাকাটা নিয়ে দুর্নীতির বিতর্কে অমিতাভ ও তাঁর পরিবারের নাম জড়িয়ে পড়ে। রাজীব গান্ধীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচিত হয়। অভিযোগের কারণে তাঁকে জনসমক্ষে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। তবে অভিযোগ আর প্রমাণ এক নয়—এ কথা মনে রাখা জরুরি।
বফর্স অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত সাবেক সুইডিশ পুলিশ কর্মকর্তা স্টেন লিন্ডস্ট্রম দাবি করেছিলেন, অমিতাভের নাম ওই কেলেঙ্কারিতে জড়ানোর পেছনে ভারতীয় তদন্তকারীদের ভূমিকা ছিল। একই সময়ে সিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, সংস্থার নিয়মিত মামলা বা পরবর্তী অভিযোগপত্রে অমিতাভকে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি; অর্থাৎ বিতর্কটি তাঁর ভাবমূর্তিতে আঘাত করলেও তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছিল—এমন দাবি করার ভিত্তি নেই।
রাজনীতি থেকে সরে এসে অমিতাভ আবার অভিনয়ে মনোযোগ দেন। কিন্তু সামনে তখন আরও বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছিল—এবার পর্দায় নয়, নিজের ব্যবসায়িক উদ্যোগে।
ইশ্, যদি আমাদের দেশের সব ভাষা শেখার সময় পেতাম! ইশ্, যদি কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাতে শিখতে পারতাম! এমন অনেক কিছু আছে, যা শেখা হয়নি বলে আমার আফসোস হয়।অমিতাভ বচ্চন
যে ব্যবসা তাঁকে প্রায় নিঃস্ব করে দিয়েছিল
নব্বইয়ের দশকে অমিতাভ অভিনয়ের পাশাপাশি বিনোদনশিল্পের নানা ক্ষেত্রে ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেন। তাঁর প্রতিষ্ঠান অমিতাভ বচ্চন করপোরেশন লিমিটেড (এবিসিএল) চলচ্চিত্র প্রযোজনা, অনুষ্ঠান আয়োজন ও বিনোদন ব্যবসার বিভিন্ন শাখায় কাজ করার পরিকল্পনা করেছিল। লক্ষ্য ছিল, বিনোদনশিল্পকে করপোরেট কাঠামোয় নিয়ে আসা। কিন্তু বড় পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটে পড়ে।
এবিসিএলের সঞ্চিত লোকসান ৭০ কোটি রুপির বেশি হয়ে গিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটিকে অসুস্থ কোম্পানি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ঋণদাতাদের চাপ, মামলা এবং ব্যবসায়িক ব্যর্থতা অমিতাভের ব্যক্তিগত জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলে।
২০১৩ সালে ইন্ডিয়া টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অমিতাভ স্মরণ করেছিলেন, ঋণদাতারা তাঁর বাড়িতে এসে টাকা চাইতেন; কখনো তাঁদের আচরণ ছিল অপমানজনক ও হুমকিমূলক। তাঁর ভাষ্যে, পেশাজীবনের সবচেয়ে অন্ধকার সময়গুলোর একটি ছিল সেটি। একসময় যাঁর উপস্থিতিতে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক উল্লাস করতেন, তাঁকেই তখন পাওনাদারদের চাপ সামলাতে হয়েছে।
এই সংকটের মধ্যেই অমিতাভ নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি নেন। অভিনয়ই তাঁর মূল শক্তি—এই উপলব্ধি থেকে আবার কাজের সন্ধানে নামেন। প্রতিবেশী যশ চোপড়ার কাছে গিয়ে কাজ চেয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকেই আসে ছেলে আদিত্য চোপড়ার ‘মোহাব্বতে’ (২০০০) সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ। ছবিটি তাঁর ক্যারিয়ারে নতুন অধ্যায় খুলে দেয়।
জীবনে কত কিছুর মধ্য দিয়ে গিয়েছি, আর আমার শরীর যেভাবে সেসবের সঙ্গে লড়াই করেছে, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য। হয়তো এ কারণেই আমি ধর্মের প্রতি বেশি বিশ্বাসী হয়ে উঠেছি। কারণ, কখনো বুঝতে পারি না কেন কোনো ঘটনা আমার জীবনে ঘটছে, আবার কীভাবে সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি, সেটাও বুঝতে পারি না।অমিতাভ বচ্চন
ছোট পর্দায় বড় প্রত্যাবর্তন
যখন চলচ্চিত্রে নিয়মিত কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছিল, তখনই আসে টেলিভিশনে কাজের প্রস্তাব। ২০০০ সালে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ সঞ্চালনার দায়িত্ব নেন অমিতাভ। সেই সময় অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, বড় পর্দার সুপারস্টার ছোট পর্দায় এলে তাঁর তারকাখ্যাতি ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাঁর স্ত্রী জয়া বচ্চনও প্রথম দিকে সিদ্ধান্তটি নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন বলে পরে জানিয়েছেন।
অমিতাভ ঝুঁকি নিয়েছিলেন। আর সেই ঝুঁকিই হয়ে ওঠে তাঁর পুনর্জন্মের অন্যতম সোপান। প্রতিযোগীদের সঙ্গে সহজ কথোপকথন, সংযত রসবোধ, আন্তরিকতা এবং পর্দার বাইরের মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার ক্ষমতা তাঁকে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও জনপ্রিয় করে তোলে। একসময় যাঁকে শুধু সিনেমার পর্দায় দেখা যেত, তিনি হয়ে ওঠেন ঘরের পরিচিত মুখ।
নিজের ব্লগে অমিতাভ পরে লিখেছিলেন, ২০০০ সালে তাঁর হাতে কাজ ছিল না, অর্থকষ্ট ছিল, আর্থিক প্রতিষ্ঠানটিও ভেঙে পড়েছিল এবং আইনি জটিলতা ছিল অনেক। টেলিভিশনের এই প্রস্তাব তাঁর জীবনের হিসাব বদলে দেয়। টাইম সাময়িকীও ২০০৫ সালে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখিয়েছিল, ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ কীভাবে পুরোনো তারকাকে নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল।
আমার কাছে রাজেশ খান্নাই প্রকৃত অর্থে একমাত্র সুপারস্টার। তাঁর সাফল্য ও কঠোর পরিশ্রম ছিল অসাধারণ। তাঁর অর্জনের তুলনায় আমার অর্জন কিছুই নয়। ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ ঘরানায় সাফল্য পাওয়ার পর আমাকে সেই ধরনের চরিত্রেই আটকে থাকতে হয়েছিল। অন্য কিছু করার চেষ্টা করলে অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু খান্না এসব নিয়ে ভাবতেন না। ১৯৬৫ সালে তাঁর কথা প্রথম শোনার পর থেকেই তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা। একসঙ্গে কাজ করার পর সেই শ্রদ্ধা আরও বেড়েছে। আজও তাঁকে আমার চেয়ে বড় অভিনেতা মনে করি।অমিতাভ বচ্চন
এরপর ‘বাগবান’ (২০০৩), ‘ব্ল্যাক’ (২০০৫), ‘সরকার’ (২০০৫), ‘চিনি কম’ (২০০৭), ‘পা’ (২০০৯) ও ‘পিকু’–এর (২০১৫) মতো ছবিতে তিনি নিজের অভিনয়ের নতুন দিক তুলে ধরেন। শুধু অ্যাকশন নায়ক নয়, বয়সের সঙ্গে মানানসই জটিল চরিত্রেও যে তিনি সমান শক্তিশালী, তা প্রমাণ করেন। ‘ব্ল্যাক’-এ অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ‘পা’ ও ‘পিকু’র মতো ছবির স্বীকৃতি তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসকে আরও দৃঢ় করে।