কেন এই কাদা-ছোড়াছুড়ি

গত ঈদুল ফিতরে গলুই ও শান ছবি দিয়ে ঢালিউড ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া পরাণ দর্শকের মধ্যে সাড়া জাগায়। ঈদের তিন সপ্তাহ পর হাওয়া মুক্তি পেলে দর্শকের মধ্যে আরও বেশি আগ্রহ দেখা যায়। বাংলা সিনেমা নিয়ে দর্শকের এই আগ্রহকে যখন সিনেমাসংশ্লিষ্ট অনেকে ‘নতুন জোয়ার’, ‘ঢালিউডের ঘুরে দাঁড়ানো’সহ নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করছেন, অন্যদিকে তখন চলচ্চিত্রের মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে কাদা–ছোড়াছুড়ি। পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, একে–অপরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ চলছে। এ নিয়ে ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এসব ভিডিওর নিচে অনেক ভক্ত-দর্শকই নেতিবাচক মন্তব্য করছেন। অনেকে বলছেন, এই কাদা–ছোড়াছুড়ি বাংলা সিনেমার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
চলচ্চিত্র পরিচালক ও বিশ্লেষক মতিন রহমান বলেন, ‘যাঁরা এ কাজটি করছেন, তাঁদের সংযত হওয়া উচিত। যখন একটা সাফল্যের বার্তা ছড়িয়ে যায়, তখন কিছু ব্যর্থতাকে চেপে রাখতে হয়। সেটা না করে আমরা সিনেমার ক্ষতি করছি।’

ফেসবুকের একটি গ্রুপে মিশা সওদাগরের বিরুদ্ধে অনন্ত জলিলের বক্তব্যের একটি ভিডিও ফুটেজের নিচে রাসেল হোসেন নামের একজন লিখেছেন, ‘শিল্পীরা এমন কেন? শিল্পী সমিতির নির্বাচনের সময়ও এমন অবস্থা দেখেছি। আবার নতুন করে এখন শুরু হয়েছে। এসব শিল্পীর সিনেমা দেখতে আমরা হলে যাই। অথচ এদের মধ্যে এত রেষারেষি, কোন্দল, না দেখলে দর্শকেরা বিশ্বাসই করত না। এসব কারণে আমাদের সিনেমা পিছিয়েছে।’

নায়ক বাপ্পী চৌধুরী ও মিশা সওদাগর

কিছুদিন আগে পর্দার বাইরে মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছিলেন ঢাকাই ছবির খলনায়ক মিশা সওদাগর ও নায়ক বাপ্পী চৌধুরী। ঘটার সূত্রপাত বাপ্পীর এক রেডিও সাক্ষাৎকার। সেখানে তিনি মিশা সওদাগরকে ‘সুবিধাবাদী’ বলে আখ্যা দেন। পরে বাপ্পীর অভিনয়–ক্যারিয়ারকে তাচ্ছিল্য করে গণমাধ্যমে পাল্টা বক্তব্য দেন মিশা। এখানেই শেষ নয়, কিছুদিন পর দর্শকদের দেখতে হয় মিশা ভার্সেস অনন্ত পর্বও। এক টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে অনন্তর দিন দ্য ডে নিয়ে মন্তব্য করেন মিশা। তিনি বলেন, ‘অনন্ত জলিলের শতকোটি টাকা দিয়ে নির্মিত দিন দ্য ডে দিয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কোনো লাভ হয়নি। এই অর্থ দিয়ে বছরে কমপক্ষে অর্ধশত সিনেমা নির্মাণ করলে ইন্ডাস্ট্রির চেহারা পাল্টে যেতে। অনন্ত সিনেমা করেন শখে। এতে ইন্ডাস্ট্রির জন্য কোনো লাভ নাই।’ যথারীতি পাল্টা বক্তব্য আসে অপর পক্ষ থেকে।

সংবাদ সম্মেলন করে মিশাকে পাল্টা আক্রমণ করেন অনন্ত, ‘মিশা সওদাগর একজন শিল্পী। চলচ্চিত্রের উন্নয়নে আসলে তার কোনো অবদানই নেই। মিশা সওদাগর প্রযোজকও না, সৃজনশীল ব্যক্তিও না। তার দ্বারা সিনেমার উন্নতি হয় না। যার কোনো ধরনের ইনভেস্টমেন্ট নেই, ক্রিয়েটিভিটি নেই, তার দ্বারা চলচ্চিত্রের উন্নতি হবে কীভাবে?’

জেনিফার ফেরদৌস ও মাহিয়া মাহি

মিশা ও অনন্ত জলিলের দ্বৈরথ যে শেষ নয়, তখন কে জানত! এরপরই দর্শকের জন্য আরও বড় বিতর্ক নিয়ে হাজির হয় আশীর্বাদ সিনেমার পুরো টিম। ছবির প্রযোজকের সঙ্গে মুখোমুখি অবস্থানে চলে যান পরিচালক, নায়ক ও নায়িকা। ইটটি মারেন প্রযোজক জেনিফার ফেরদৌস। ছবির মুক্তি উপলক্ষে নায়ক রোশান ও মাহিয়া মাহি ছাড়াই হাজির হন সংবাদ সম্মেলনে। সেখানে তিনি রোশান ও মাহির বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসেন। বলেন, ‘টাকা বিনিয়োগ করে কি নায়ক–নায়িকার প্রচার করব?’ রোশন ও মাহিই–বা চুপ থাকবেন কেন! তাঁরা বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের দিন থেকেই প্রযোজক নিজের প্রচার নিয়ে ব্যস্ত। অনুদানের টাকা লাভের জন্য শুটিংয়ে খরচ বাঁচিয়ে সিনেমার মান নষ্ট করেছেন। শুধু তাই-ই নয়, একটি গানের শুটিং না করেই সিনেমা মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ করেন রোশান ও মাহি।

পরে সংবাদ সম্মেলন করে পরিচালক, নায়ক ও নায়িকার বিরুদ্ধে মামলারও হুমকি দেন প্রযোজক। ওই বক্তব্যের পর মাহি শিল্পী সমিতিতে বিচার চেয়ে আবেদন করেন। গত ২৯ জুলাই হাওয়া মুক্তির প্রায় এক মাস পর নতুন ছবি মুক্তি পাচ্ছে। কিন্তু অবস্থা যা, তাতে ছবির চেয়ে প্রযোজক ও ছবির পাত্র–পাত্রীদের ঝগড়া-বিবাদই এখন বড় খবর। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাবেক সভাপতি মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা নিজেরা নিজেদের ছোট করছি। সমস্যা হলে নিজেরা বসেই সমাধান করা যায়। বাইরের মানুষ জানবে কেন? কিন্তু কী হচ্ছে, গণমাধ্যমের কাছে গিয়ে একে–অপরের বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে। এসব বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষ কী ভাবছে? সমাজের কাছে আমরা হেয় হয়ে যাচ্ছি। এমন পরিবেশ দেখলে দর্শকেরা আমাদের সিনেমা দেখতে হলে আসবে কেন?’
চলচ্চিত্রের মানুষদের সাম্প্রতিক নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করলেন পরিচালক কাজী হায়াৎও, ‘সিনেমা দেখতে মানুষ হলে যেতে শুরু করেছে। আর আমরা ঝগড়া করছি। এভাবে চললে দর্শকেরা ভুল বার্তা পাবেন। সিনেমার ওপর প্রভাব পড়বে।’

পরাণ–এর পরিচালক রায়হান রাফিও একমত কাজী হায়াতের সঙ্গে, ‘অনেক দিন পর সিনেমা ভালো যাচ্ছে। ঠিক সেই সময় সিনেমার কিছু মানুষ যেভাবে একে–অপরের বিরুদ্ধে আপত্তিকর ভাষায় কথা বলছেন। আমরা হাসির পাত্র হয়ে যাচ্ছি। আমাদের সিনেমা কিন্তু এখনো অপারেশন থিয়েটারে। দুটি ছবি ভালো যাওয়া মানেই সব নয়। হাওয়া ও পরাণ দেখতে যেসব নতুন দর্শক আসছেন, তাঁরা সিনেমার মানুষের এমন ব্যবহার দেখলে তাঁদের ধারণা পাল্টে যাবে। তাঁরা মুখ ফিরিয়ে নেবেন।’

কাজী হায়াৎ

সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় সিনেমার ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে একমত খোদ মিশা সওদাগরও। তিনি বলেন, ‘বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্যের ফুটেজগুলো ফেসবুক, ইউটিউবে ভাসছে। মানুষ এসব দেখে শিল্পীদের কাছ থেকে কী শিখবেন? শিল্পীদের এ ধরনের আচরণে সিনেমা দেখতে দর্শকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে।’