গত বছরের মতো এ বছরও ঈদের সিনেমা দেখতে গিয়ে আনন্দময় অভিজ্ঞতা হলো। ঢাকায় হলভর্তি দর্শক সিনেমা দেখছেন, টিকিটের সংকট হয়েছে। গত ঈদে ‘উৎসব’ সিনেমার সুখস্মৃতি মনে রেখে প্রথমেই দেখলাম তানিম নূরের ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। দর্শক হিসেবে ১০–এর মধ্যে এই সিনেমাকে দেব অন্তত ৯।
‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসের কাহিনি নিয়ে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বানিয়েছেন তানিম নূর, এটা জেনে আশঙ্কা হয়েছিল। হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাসে নাটকীয় উপাদান তৈরিতে, হাস্যরস আর উদ্ভটরসের ব্যবহারে গ্র্যান্ডমাস্টার। কিন্তু ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাসে কাহিনির নানা সুস্বাদু উপাদান যেন একসঙ্গে জমাট বাঁধেনি। তানিম নূর কাহিনির এই দুর্বলতাকে কীভাবে অতিক্রম করবেন?
কিন্তু সিনেমা হলে বসে সন্দেহের অবসান হলো। আয়মান আসিব, সামিউল ভুঁইয়া আর সুষ্ময় সরকারকে সঙ্গে নিয়ে চিত্রনাট্যে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনেছেন তানিম। গল্পের মূল সুরটিকে অক্ষুণ্ন রেখে প্রয়োজনীয় রদবদল ও গতিসঞ্চারের চেষ্টা করেছেন। সব চেষ্টাতেই সফল হয়েছেন, এমনটা বলব না; তবে অনেকাংশে গল্পকে আরও উপভোগ্য, সর্বজনগ্রাহ্য করে তুলতে পেরেছেন। তাঁদের অভিবাদন।
সংলাপের জন্য আয়মান আসিব আর তানিম নূর আরেকটি অভিবাদন পাবেন। পুরো সিনেমায় বেশ কটি বুদ্ধিদীপ্ত, চোখা, হাস্যরসে টইটম্বুর সংলাপ আছে। দর্শক সংলাপগুলো উপভোগ করেছেন—কখনো গলা ফাটিয়ে হেসে, কখনো নীরবে সংলাপের ভার মেপে।
তানিম নূরের পরিচালনা আরও পরিপক্ব হয়েছে। একটি ট্রেনের ভেতর যেখানে প্রায় সব দৃশ্য, সেখানে গল্প নানা কারণে ঝুলে যেতে পারত। তানিমের নানা কসরতে গল্পের গায়ে মেদ জমতে পারেনি। বনলতা এক্সপ্রেস যখন থেমেও ছিল, গল্প তখনো দৌড়েছে। সিনেমার পরিণতি নির্ধারণে তানিম হয়তো আরও কিছুটা স্বাধীনতা নিতে পারতেন। তানিম সেই অল্প কিছু পরিচালকের একজন, যাঁরা লেখক না হয়েও গল্পের অন্তরাত্মাকে স্পর্শ করতে পারেন।
পরিচালনার বাইরেও পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য দাবিদার হলেন কাস্টিং পরিচালক তানিয়া রহমান। অধ্যাপক আবদুর রশিদের চরিত্রে মোশাররফ করিম, শিক্ষামন্ত্রী আবুল খায়ের চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী, সুরমা চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধন, চিত্রার বড় চাচার চরিত্রে ইন্তেখাব দিনার খাপেখাপে মিলে গিয়েছেন। কিন্তু ডাক্তার আসহাবের চরিত্রে শরীফুল রাজ এমন দারুণভাবে মানিয়ে নেবেন, এটা তানিয়া কীভাবে বুঝলেন?
তানিয়া একই রকম দুর্দান্ত বাছাই করেছেন আফিয়া চরিত্রে জাকিয়া বারী মমকে, আজিজ চরিত্রে শ্যামল মাওলাকে, সুধীর চন্দ্র দাসের চরিত্রে এ কে আজাদ সেতুকে, নীতু চরিত্রে ত্রিধা পাল মানকে (২ষ ওয়েব সিরিজেও এই খুদে শিল্পী দারুণ অভিনয় করেছিলেন)। আরেক মাস্টারস্ট্রোক ছিল আসহাবের মায়ের চরিত্রে শামীমা নাজনীন। হুমায়ূন আহমেদের পাগলাটে চরিত্রগুলোকে ইনি যেমনভাবে ধারণ করতে পেরেছেন (ভৌতিক নাটকের বনু চরিত্র স্মর্তব্য), তেমনভাবে অনেক তাবড় তাবড় অভিনেতাও পারেননি।
সংলাপের জন্য আয়মান আসিব আর তানিম নূর আরেকটি অভিবাদন পাবেন। পুরো সিনেমায় বেশ কটি বুদ্ধিদীপ্ত, চোখা, হাস্যরসে টইটম্বুর সংলাপ আছে। দর্শক সংলাপগুলো উপভোগ করেছেন—কখনো গলা ফাটিয়ে হেসে, কখনো নীরবে সংলাপের ভার মেপে।
কাস্টিং বিষয়ে একটাই অনুযোগ—চিত্রা চরিত্রে সাবিলা নূর দারুণ অভিনয় করেছেন, কিন্তু চরিত্রের তুলনায় তাঁকে একটু বেশি অভিজ্ঞ, পোড়খাওয়া মনে হয়েছে। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পার হওয়া চিত্রার চাঞ্চল্য ফুটিয়ে তুলতে সাবিলা নূরকে বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। উৎসবে সাদিয়া আয়মান এটা বেশ অনায়াসে পেরেছিলেন।
সম্পাদনার ক্ষেত্রে সালেহ সোবহান ক্রমেই আলাদা একটা ক্লাস হয়ে উঠছেন। বহু চরিত্র ও ঘটনার একটি জটিল গল্পকে বড় মুনশিয়ানার সঙ্গে মসৃণভাবে বইয়ে নিয়েছেন।
বরকত হোসেনের সিনেমাটোগ্রাফি খুব ভালো। অল্প জায়গায় দারুণ সব অ্যাঙ্গেল ব্যবহার করে শট নিয়েছেন। শিল্প নির্দেশক হিসেবে রাজিম আহমেদও উঁচু মানের কাজ করেছেন। ট্রেনের ভেতর, স্টেশনে—সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়েছে। সেলুন কোচের দৃশ্যগুলো বহুদিন মনে থাকবে। ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের বিশেষজ্ঞ না হয়েও বলতে পারি, তানভির ইসলাম নিজের কাজ ভালো জানেন।
কম্পোজার জাহিদ নীরব স্মৃতিমেদুর বাংলা ব্যান্ডগান দারুণভাবে ব্যবহার করেছেন। আর সাউন্ড মিক্সিংয়ে সাইবা রহমান দারুণ কাজ করেছেন। সংলাপ স্পষ্ট, ট্রেনের কামরার ভেতর আর স্টেশনে শব্দের ছোট ছোট কাজ কাহিনিকে খুব জীবন্ত করে তুলেছে।
এই সিনেমায় মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, শামীমা নাজনীন, শরীফুল রাজ যে রকম দাপটে অভিনয় করেছেন, তাতে অন্যরা ঢাকা পড়ে যেতে পারতেন। কিন্তু সাবিলা নূর, শ্যামল মাওলা, জাকিয়া বারী মম, এ কে আজাদ সেতু, ত্রিধা পাল মান নিজেদের অন-স্ক্রিন সময়টুকু দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ইন্তেখাব দিনার আর গায়িকা মাশা ইসলাম এক-দুই দৃশ্যেই তাঁদের উপস্থিতি জানান দিতে পেরেছেন।
যমুনা চরিত্রে সাবরিন আজাদ আর রুবি চরিত্রে লাবণ্য চৌধুরীর অভিনয়ও ভালো। তামিম করীমের চেহারা দ্বিধান্বিত প্রেমিক জাফরের সঙ্গে মানিয়েছিল, তবে মুড-বদলের জায়গাগুলোতে তাঁকে একটু আড়ষ্ট লেগেছে। জাফরের বন্ধু শাকিলের চরিত্রে সিফাত রহমান তুলনামূলকভাবে বেশি সাবলীল অভিনয় করেছেন। যমুনার বরের চরিত্রে আরেফিন জিলানীও ভালো অভিনয় করেছেন। এঁরা ভবিষ্যতে আরও উল্লেখযোগ্য চরিত্রে অভিনয় করবেন, এই প্রত্যাশা রইল।
স্ক্রিনে মুখ না দেখিয়েও বাচিক অভিনয়ের ঝলক দেখিয়ে নুহাশ হুমায়ূন এক মৃত তরুণের আত্মার ভূমিকায় দর্শককে দারুণ আনন্দ দিয়েছেন। এই অদৃশ্য চরিত্রটি সিনেমায় আরও জায়গা পেতে পারত, সমাপ্তি বক্তব্যটুকু আরও জমাটি হতে পারত।
হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে আজিজ ছিলেন মাওলানা। তানিম নূরের সিনেমায় আজিজ মাওলানা নয়, নিরাপত্তাহীনতা ও সন্দেহবাতিকে ভোগা এক সাধারণ মানুষ, যে আসন্নপ্রসবা স্ত্রীকেও একজন পুরুষ ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে দিতে নারাজ। এই পরিবর্তনটি খুব গুরুত্ববহ। যুক্তিহীন একগুঁয়েমি কোনো একটি নির্দিষ্ট পেশা বা বিশ্বাসের একচেটিয়া সম্পত্তি যে নয়, তা তো বাংলাদেশে নানা ঘটনায় প্রমাণিত হয়েই চলেছে!
স্ক্রিনে মুখ না দেখিয়েও বাচিক অভিনয়ের ঝলক দেখিয়ে নুহাশ হুমায়ূন এক মৃত তরুণের আত্মার ভূমিকায় দর্শককে দারুণ আনন্দ দিয়েছেন। এই অদৃশ্য চরিত্রটি সিনেমায় আরও জায়গা পেতে পারত, সমাপ্তি বক্তব্যটুকু আরও জমাটি হতে পারত।
একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ আবুল খায়েরকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে না দেখিয়ে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দেখানো। এই জাতির সুশাসন প্রতিষ্ঠায় শিক্ষার গুরুত্ব কতখানি, সেটাই যেন অনুচ্চ স্বরে বললেন তানিম। উপন্যাসের তুলনায় সিনেমায় নারী ও শিশুদের অধিকারের ব্যাপারে স্পষ্টতর বক্তব্য আছে, কিন্তু কোথাও আরোপিত মনে হয়নি।
এই সিনেমায় বহু রাজনৈতিক সংলাপ আছে—কখনো হাস্যরস, কখনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা অনুভূতির ছদ্মবেশে। সচেতন দর্শকমাত্রেই সেগুলো চিহ্নিত করতে পারবেন এবং এই ভেবেও আনন্দ পাবেন যে এসব সংলাপের সরল অর্থ সবাই বুঝলেও গভীর অর্থগুলো শুধু তাঁরই জন্য পরিচালক ও সংলাপ লেখকেরা রেখে দিয়েছেন।
তবে গল্পে সবলতার পাশাপাশি দুর্বলতা কিছু রয়ে গেছে। মোশাররফ করিমের চরিত্রটি যে গভীর দুঃখের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তার আরেকটু পরিষ্কার রূপায়ণ দরকার ছিল। তিনি কেন ট্রেনে যাচ্ছেন—এর একটা গল্প থাকা দরকার ছিল। সিনেমায় কাহিনি যেভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে এই যোগসূত্রটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শিক্ষামন্ত্রীর মন্ত্রিত্ব নিয়ে টানাপোড়েনের গল্পটিও আরেকটু সবল হতে পারত। শিক্ষামন্ত্রীর স্ত্রীর চরিত্রটি গল্পের মধ্যে কিছুটা আলগাভাবে থেকে গিয়েছে, আরও বজ্র আঁটুনি দরকার ছিল।
হুমায়ূন আহমেদের অতিনাটকীয় শেষ দৃশ্য থেকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ পুরোপুরি বের হতে পারেনি, তবে অনেক দর্শক সেটিই উপভোগ করেছেন।
কিন্তু সমাপ্তি নয়, গন্তব্য নয়, ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ উপভোগ্য এবং স্মরণীয় তার একরাত্রির যাত্রাটির জন্য।
তানিম নূর ও তাঁর দল এবং বাংলা সিনেমার জয় কামনা করি। পাঠকদের সবাইকে সনির্বন্ধ অনুরোধ, ঈদের ছুটির অবশিষ্টাংশ ও সামনের লম্বা সপ্তাহান্তের ছুটি কাজে লাগিয়ে বনলতা এক্সপ্রেসে উঠে পড়ুন।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার জন্য হইচই ধন্যবাদ পাবে, সেই সঙ্গে পাবে সিনেমার অংশীদার ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকও। কোকাকোলা এবং গ্রামীণফোনও এই সিনেমার সঙ্গে আছে, সিনেমা শুরুর আগে একঝলক চোখে পড়ল। এ রকম উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্টতা আরও বাড়ুক।
তানিম নূর ও তাঁর দল এবং বাংলা সিনেমার জয় কামনা করি। পাঠকদের সবাইকে সনির্বন্ধ অনুরোধ, ঈদের ছুটির অবশিষ্টাংশ ও সামনের লম্বা সপ্তাহান্তের ছুটি কাজে লাগিয়ে বনলতা এক্সপ্রেসে উঠে পড়ুন। আপনাদের যাত্রা সুখময় হবে, নিজের যাত্রার অভিজ্ঞতা থেকে এই আশ্বাস দিচ্ছি।
খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার: লেখক ও গবেষক