তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ই-টিকিটিং ও বক্স অফিস নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ই-টিকিটিং ও বক্স অফিস নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে

ই-টিকিটিং ও বক্স অফিস চালু করছে সরকার

ঢাকাই চলচ্চিত্রের উন্নয়নে সব সিনেমা হলকে কেন্দ্রীয় সার্ভারের আওতায় এনে ই–টিকিটিং ও বক্স অফিস চালু করতে চায় সরকার। বিষয়টি নিয়ে ৫০ কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। খোঁজ নিলেন মকফুল হোসেন

সরকারের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়ে ই-টিকিটিং ও বক্স অফিস বিষয়ে একটি ডিপিপি প্রণয়ন করছে এফডিসি। এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুমা তানি গত বুধবার প্রথম আলোকে জানান, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন ও প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়েছেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য ও সম্প্রচারের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ই-টিকিটিং ও বক্স অফিস নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। সেটার আলোকেই পরে এফডিসিকে ডিপিপি পাঠাতে বলা হয়। দিন বিশেক ধরে ডিপিপির কাজ করছে এফডিসি।

মাসুমা তানি জানান, ঈদের আগেই প্রস্তাবটি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অনুবিভাগে জমা দেওয়া হবে।

মাসুমা তানি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর (ইয়াসের খান চৌধুরী) সঙ্গে বৈঠক করেছি। উনি বলেছেন, কাজটা যেন ন্যূনতম অর্থ ব্যয়ে হয়। আমরাও সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকব।’

ডিপিপি প্রণয়নের আগে সিনেমা হল মালিক সমিতি, পরিচালক সমিতি, প্রযোজক সমিতি, স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিসহ চলচ্চিত্রের অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এফডিসি। ই–টিকিটিং ও বক্স অফিসের প্রশ্নে সবাই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।

ঈদের আগেই প্রস্তাবটি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অনুবিভাগে জমা দেওয়া হবে

ডিপিপিতে কী থাকছে

‘সেন্ট্রাল সার্ভার, ই-টিকিটিং এবং বক্স অফিস স্থাপন’ শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) কী থাকছে? জানতে চাইলে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) কামাল মোহাম্মদ রাশেদ জানান, দেশের সব সিনেমা হলকে একটি কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবে প্রধানত চারটি বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে।

১. এফডিসিতে একটি কেন্দ্রীয় সার্ভার স্থাপন। দেশের কোন সিনেমা হলে কত টিকিট বিক্রি হচ্ছে, কোন শো হাউসফুল, কত টাকা আয় হচ্ছে—এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে। প্রযোজকেরাও অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের ছবির আয় দেখতে পারবেন।

২. ধাপে ধাপে সব সিনেমা হলে ই–টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা হবে। বর্তমানে অনেক হলে হাতে হাতে টিকিটিং চালু থাকায় আয়–ব্যয়ের হিসাব নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় টিকিট বিক্রির টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ধারিত হিসাবে ভাগ হয়ে যাবে। প্রযোজক, হলমালিক ও সরকারের অংশ সফটওয়্যারের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

৩. পাইরেসি ঠেকাতে বিশেষ ডিভাইস বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কোনো সিনেমা অবৈধভাবে ধারণ বা সম্প্রচার করার চেষ্টা হলে শনাক্ত করা যাবে।

৪. বক্স অফিস চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কোন সিনেমা কত আয় করছে, কোন ছবি শীর্ষে আছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের মতো এই র‍্যাঙ্কিং ব্যবস্থা চলচ্চিত্রের বিপণনে স্বচ্ছতা নিয়ে আসবে। একটি ওয়েবসাইটে সিনেমার আয়, টিকিটি বিক্রির তথ্য প্রকাশিত হবে।

সিনেমার কপি, শো সংখ্যা—সবই এফডিসিতে থাকা কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে

সার্ভার কীভাবে কাজ করবে

সিনেমার কপি, শো সংখ্যা—সবই এফডিসিতে থাকা কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। প্রথমে সিনেমা নির্দিষ্ট ডিজিটাল ফরম্যাটে প্রস্তুত করে এফডিসির মূল সার্ভারে আপলোড করা হবে। প্রতিটি সিনেমা হলে আলাদা সার্ভার বা ডিজিটাল প্লেয়ার থাকবে, যা প্রজেক্টরের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

মূল সার্ভার থেকে নির্দিষ্ট হলের সার্ভারে সিনেমা পাঠানো হবে। প্রতিটি হলের জন্য আলাদা ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড থাকবে। সেগুলো ব্যবহার করে হল কর্তৃপক্ষ সিনেমা ডাউনলোড ও প্রদর্শন করতে পারবে। এ জন্য প্রতিটি হলে ইন্টারনেট সংযোগ প্রয়োজন হবে।

এ ব্যবস্থায় প্রযোজকেরা সার্ভারে লগইন করে দেখতে পারবেন কোন হলে সিনেমা চলছে, কতটি শো হচ্ছে। এতে বক্স অফিস ও প্রদর্শন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে। দেশের একক সিনেমা হলে ইতিমধ্যে জাজ মাল্টিমিডিয়ার সার্ভার চালু আছে। তবে সেখানে এখনো ই-টিকিটিং ও বক্স অফিস ব্যবস্থা নেই।

একক সিনেমা হলে এখনও হাতে হাতে টিকিট বিক্রি হয়

বক্স অফিস ও ই-টিকিটিং কী

বক্স অফিস মানে সিনেমা হলের টিকিটঘর। কোনো চলচ্চিত্রের লাভ কিংবা লোকসান—সবটাই টিকিট বিক্রির ওপর নির্ভর করে। টিকিট বিক্রির ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত সিনেমার আয়ের হিসাব-নিকাশ ‘বক্স অফিস’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। হলিউড, বলিউডে বক্স অফিস কার্যকর রয়েছে। তবে দেশে এখনো বক্স অফিস চালু হয়নি।

দেশের গুটিকয় মাল্টিপ্লেক্সে অনলাইনে টিকিট কাটা যায়, যেটি ই-টিকিট নামে পরিচিত। একক সিনেমা হলগুলোয় এখনো হাতে হাতে টিকিট বিক্রি হয়। ফলে কোন শোতে কত টিকিট বিক্রি হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করে জানার কোনো সুযোগ নেই।

ই–টিকিটিং ও বক্স অফিস চালুর উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেন চলচ্চিত্র প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল। তিনি প্রথম আলোকে বলছেন, ‘চলচ্চিত্রের জন্য এর চেয়ে ভালো খবর আর হতে পারে না।’

তবে ই–টিকিটিং কার্যকর করার জন্য একক সিনেমা হলগুলোর উন্নয়ন দরকার বলে মনে করেন শাহরিয়ার শাকিল, ‘অনেক সিনেমা হলে ফিক্সড সিট নেই। চেয়ার কিংবা টুলে বসে সিনেমা দেখে। সেখানে ই–টিকিটিং কার্যকর করা সম্ভব নয়। ফলে সিনেমা হলে ফিক্সড সিটের ব্যবস্থা দরকার।’

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ই–টিকিটিং ও বক্স অফিস চালু করলে প্রযোজক ও হলমালিক—উভয় পক্ষের জন্য ভালো হবে। আমরা চাই, সরকার এটি দ্রুত কার্যকর করুক।’

চালু কবে

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ডিপিপি পাওয়ার পর সেটি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মিটিংয়ে তোলা হবে। প্রকল্পটি গ্রহণের পর সেটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হবে। সেটি পরিকল্পনা কমিশন অনুমোদন দেবে। প্রকল্প পাস হওয়ার পর এফডিসি কাজ শুরু করবে।