গত তিন মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার মধ্যে ব্ল্যাক ওয়ার, বীরকন্যা প্রীতিলতা, মায়ার জঞ্জাল ও ওরা ৭ জন প্রশংসিত হয়েছে দর্শকমহলে
গত তিন মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার মধ্যে ব্ল্যাক ওয়ার, বীরকন্যা প্রীতিলতা, মায়ার জঞ্জাল ও ওরা ৭ জন প্রশংসিত হয়েছে দর্শকমহলে

‘দর্শকের অভাবে অনেক শো বন্ধও রাখতে হয়েছে’

গত মার্চে মুক্তিপ্রাপ্ত সরকারি অনুদানের একটি সিনেমা সপ্তাহজুড়ে কয়েকটা শো মিলিয়ে মাত্র ১২ জন দর্শক দেখেছেন, দর্শকের অভাবে অনেক শো বন্ধও রাখতে হয়েছে—গত তিন মাসে ঢাকার লায়ন সিনেমাসের দর্শকের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন প্রেক্ষাগৃহটির কর্ণধার মির্জা আবদুল খালেক; সংগত কারণেই সিনেমাটির নাম বলতে চাইলেন না তিনি।
দশকের পর দশক ধরে ধুঁকছে ঢাকাই চলচ্চিত্র, সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন দর্শকেরা। এর মধ্যেই গত বছর ‘হাওয়া’ ও ‘পরাণ’ ছবি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ঢল নেমেছিল; আশায় বুক বেঁধেছিলেন প্রযোজক, পরিচালক ও হলমালিকেরা। তবে ছয় মাসের ব্যবধানে দর্শকের ঢল আবারও তলানিতে নেমেছে।

গত তিন মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত ১২ সিনেমার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দর্শক টেনেছে ‘ব্ল্যাক ওয়ার’

হলমালিকেরা বলছেন, তিন মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত ১২ সিনেমার মধ্যে ‘ব্ল্যাক ওয়ার’ বাদে কোনো সিনেমা সেভাবে দর্শক টানতে পারেনি।

১৩ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছে বছরের প্রথম সিনেমা ব্ল্যাক ওয়ার, তারকা শিল্পী নির্বাচন থেকে নির্মাণ ব্যয়—সব মানদণ্ডেই এগিয়ে থাকা সিনেমাটি দর্শক টানবে বলে আশা করেছিলেন হলমালিকেরা। হলমালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ প্রদর্শক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, আশানুরূপ না হলেও ‘ব্ল্যাক ওয়ার’ অল্প কিছু দর্শক টানতে পেরেছে।
‘ব্ল্যাক ওয়ার’ সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কপ ক্রিয়েশনের ব্যানারে যৌথভাবে সিনেমাটি নির্মাণ করেন ফয়সাল আহমেদ ও সানী সানোয়ার। ফয়সাল আহমেদ জানান, সিনেমার আয়–ব্যয়ের হিসাব এখনো টানা হয়নি। সিনেমাটি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও অস্ট্রেলিয়ায় মুক্তি পাবে; পরে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মেও মুক্তি দেওয়া হবে। ফায়সালের ভাষ্যে, ‘এখনো ব্যবসার জায়গাটা আছে। সিনেমাটি সুপারহিট নয়, তবে ব্যবসাবিফলও নয়। দেশের বাইরে মুক্তি ও ওটিটিতে রিলিজের হিসাব করলে নির্মাণব্যয়ের কাছাকাছি উঠে আসবে।’

এর বাইরে গত তিন মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার মধ্য রয়েছে—‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’, ‘সাঁতাও’, ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’, ‘ভাগ্য’, ‘কথা দিলাম’, ‘মন দিয়েছি তারে’, ‘বুবুজান’, ‘মায়ার জঞ্জাল’, ‘ওরা ৭ জন’, ‘জেকে ১৯৭১’ ও ‘রেডিও’।

‘মায়ার জঞ্জাল’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন অপি করিম

হলমালিকেরা বলছেন, তালিকার কোনো সিনেমায় দর্শক টানতে পারেনি; পরীমনি, মাহিয়া মাহি, নিপুণ ও তিশার মতো আলোচিত তারকাও দর্শকের মধ্যে খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেনি। তবে বীরকন্যা প্রীতিলতা, মায়ার জঞ্জাল ও জেকে ১৯৭১ সমালোচকদের কাছে বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’ ঝড়ের পর দর্শক খরার মধ্যে গত মার্চের প্রথম সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘পাঠান’সহ বছরে ১০টি ভারতীয় সিনেমা আমদানির দাবি করেছে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি।

‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’ সিনেমায় নাম ভুমিকায় অভিনয় করেছেন তিশা

অন্যথায় সিনেমা হল বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হলমালিকেরা। ‘পাঠান’ আমদানির সিদ্ধান্ত এখনো ঝুলে রয়েছে।
নতুন সিনেমায় দর্শক না পাওয়ায় সিনেমা হলের বিদ্যুৎ বিল, কর্মীদের বেতন দিতেই হিমশিম খাচ্ছেন হলমালিকরা; দর্শক পাওয়ার আশায় এ বছরও কয়েকটি হলে ‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’ প্রদর্শনের খবর মিলেছে। গত মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে হাওয়া সিনেমা প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ১১ বছর পর বন্ধ থাকা রাজশাহীর সিনেমা হল ‘রাজ তিলক’ চালু হয়েছে।

‘ওরা ৭ জন’ সিনেমায় চিকিৎসক চরিত্রে অভিনয় করেছেন মম

আবারও দর্শকেরা মুখ ফেরাল কেন

দশকের পর দশক ধরে নিষ্প্রাণ সিনেমা হলে প্রাণ ফিরিয়েছিল ‘পরাণ’ ও ‘হাওয়া’। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকেরা ধারণা করছিলেন, বাংলা চলচ্চিত্রের মন্দার দিন হয়তো ফুরাতে চলেছে। তবে ফুরানোর বদলে ক্রমে মন্দার দিনেই ফিরছে ঢাকাই চলচ্চিত্র । কেন? চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির উপদেষ্টা সুদীপ্ত কুমার দাস বলেন, ‘পরাণ ও হাওয়া সিনেমা দুটি দর্শকের কথা বিবেচনা করে বানানো হয়েছে। এমনিতেই সিনেমার সংখ্যা কমে গেছে। মুক্তিপ্রাপ্ত বেশির ভাগ সিনেমা অনুদানের; সেগুলো দর্শকের জন্য নির্মাণ করা হয় না। অন্য উদ্দেশে্য নির্মাণ করা হয়।’

সিনেমার ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটেছে। দর্শক ওটিটিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে হাতের কাছেই সিনেমা দেখতে পারছেন। ফলে দর্শকেরা সিনেমা হলে কম যাচ্ছেন। হলের পরিবেশ ও শিল্পীদের গ্রহণযোগ্যতার কারণেও দর্শক কমেছে।
মতিন রহমান

চলচ্চিত্র বিশ্লেষক ও নির্মাতা মতিন রহমান আরও খানিকটা গভীরে আলো ফেললেন; তিনি বলেন, ‘সিনেমার ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটেছে। দর্শক ওটিটিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে হাতের কাছেই সিনেমা দেখতে পারছেন। ফলে দর্শকেরা সিনেমা হলে কম যাচ্ছেন। হলের পরিবেশ ও শিল্পীদের গ্রহণযোগ্যতার কারণেও দর্শক কমেছে।’
বাংলাদেশ চল‌চ্চিত্র প্রদর্শক স‌মি‌তির দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৯৮ সালে ১ হাজার ২৩৫‌টির মতো সিনেমা হল ছিল। দুই যুগের ব্যবধানে হলের সংখ্যা কমতে কমতে এখন ১২০টিতে নেমেছে। একক সিনেমা হলের সংখ্যা কমলেও দেশে গত দশক থেকে মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা বেড়েছে।