
‘উড়াল’-এ অভিনয় করে মেরিল-প্রথম আলো সমালোচক পুরস্কারে যৌথভাবে সেরা অভিনেতা হয়েছেন মাহাফুজ মুন্না ও শান্ত চন্দ্র সূত্রধর। একজন থিয়েটারের নেপথ্যে থেকে শিখেছেন অভিনয়; অন্যজন মফস্সল থেকে উঠে এসে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রপ্ত করেছেন অভিনয়ের ব্যাকরণ। ভিন্ন ভিন্ন পথে যাত্রা শুরু করে উড়াল-এ এসে মিলেছে তাঁদের গন্তব্য। দুই অভিনেতার অভিনয়–যাত্রার গল্প শুনেছেন নাজমুল হক
চাঁদপুর থেকে কলকাতা
চাঁদপুরে কেটেছে শান্ত চন্দ্র সূত্রধরের শৈশব। বাবা লক্ষ্মণ চন্দ্র সূত্রধর পেশায় সাংবাদিক। সেই সূত্রে ছোটবেলা থেকেই বাসায় নিয়মিত পত্রিকা আসত। পত্রিকার পাতায় প্রায়ই চোখে পড়ত—চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নাটক মঞ্চস্থ করতে যাচ্ছে বিভিন্ন নাট্যদল। বিষয়টি শান্তর ছোট্ট মনটাকে নাড়িয়ে দিত। মনে হতো, অভিনয় করতে করতে কী সুন্দর সারা দেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা! একদিন বাবাকে প্রশ্ন, ‘ওরা কীভাবে যায়, ফ্রিতে নিয়ে যায়?’ বাবার সহজ উত্তর, ‘তুমি যদি দলে যোগ দাও, অভিনয় করো, তাহলে তোমাকেও নিয়ে যাবে।’ ‘তাহলে আমিও অভিনয় করব,’ ভাবলেন শান্ত। বাবার সহকর্মী শরীফ চৌধুরীর হাত ধরে এভাবেই বর্ণচোরা নাট্যগোষ্ঠীতে হাতেখড়ি। ২০০৮ সালে ‘জমিদার–দর্পণ’ নাটকে মাত্র একটি সংলাপ ‘হুজুর, আমি কিছু জানি না হুজুর’ দিয়ে শুরু হয়েছিল তাঁর মঞ্চযাত্রা। পঞ্চম শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত অভিনয় করেন ‘লালননামা’, ‘বিচ্ছু’, ‘গিট্টু’, ‘ছিঃ’, ‘আমরা ৩ জন’, ‘প্রিয়দর্শন’, ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’সহ আরও অনেক নাটকে—কোনোটায় ছোট কোনো চরিত্রে, কোনোটায় আবার কেন্দ্রীয় ভূমিকায়।
এরপর ভারত সরকারের আইসিসিআর বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে অভিনয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করে কলকাতার নাট্যদল ‘সংসৃতি’তে নির্দেশক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের অধীনে প্রশিক্ষণ নেন।
নাটকের মানুষ মুন্না
টাঙ্গাইলের সখীপুরের বিএএফ শাহীন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় কৌতুক পরিবেশন করে সাড়া পান মাহাফুজ মুন্না, যা তাঁকে অভিনয়ে আকৃষ্ট করে। পরে ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজে স্নাতকে পড়ার সময় এক বন্ধুর সঙ্গে মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামে কলকাতা থেকে আসা একটি নাট্যদলের ‘তাসের দেশ’ দেখতে গিয়ে মঞ্চের পেছনের কর্মীদের কাজ তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। ২০১২ সালে আরণ্যক নাট্যদলে নেপথ্য কর্মী হিসেবে যোগ দেন। শতাধিক নাটক দেখা আর পর্দার আড়ালে কাজ করতে করতেই তাঁর ভেতরে তীব্র হয় অভিনয়ের ইচ্ছা।
আরণ্যক নাট্যদলে ‘কবর’, ‘ভঙ্গবঙ্গ’, ‘রাঢ়াঙ’, ‘জুবিলী হোটেল’, ‘পুতুল কথন’, ‘কহে ফেসবুক’, ‘নানকার পালা’ মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন মুন্না। তাঁর অভিনীত পথনাটকের মধ্যে রয়েছে ‘মূর্খ লোকের মূর্খ কথা’, ‘মাটির মহাজন’, ‘জল ও জননীর গল্প’। বর্তমানে অভিনয় করছেন রেপার্টরি থিয়েটার ‘থেসপিয়ান্স দ্য ঢাকা’য়, দলটির প্রথম প্রযোজনা ‘দ্য সি অব সাইলেন্স’ নাটকে।
২০১৩ সালে আরণ্যকের প্রয়াত নাট্যকার মান্নান হীরার চলচ্চিত্র একাত্তরের ‘ক্ষুদিরাম’–এ নবম শ্রেণির এক বালকের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর বড় পর্দায় অভিষেক। তাঁর অভিনীত ওয়েব সিরিজের মধ্যে রয়েছে ‘তাকদীর’, ‘টেক্কা’, ‘আমাদের বাড়ি’, ‘মেসমেট’, ‘আইজ্যাক লিটন’, ‘কাইজার’ ও ‘ভাইরাস’। ‘ছক’, ‘দুই দিনের দুনিয়া’ ওয়েব ফিল্মেও অভিনয় করেছেন মুন্না।
‘উড়াল’–এ বন্ধুত্ব
এই দুই তরুণকে এক সুতায় গেঁথে দেয় জোবাইদুর রহমানের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘উড়াল’। পরিচালকের সঙ্গে শান্তর প্রথম পরিচয় কলকাতায়। চার বছর পর এক মাঝরাতে ফোন করে শান্তকে এ ছবির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘বাচ্চু’তে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন নির্মাতা। এভাবেই শুরু।আর মুন্নার সঙ্গে পরিচালকের বন্ধুত্ব পুরোনো। তবে সেভাবে সুযোগ চাননি এই তরুণ অভিনেতা। তাই ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে সেখানে আবেদন করেন। এরপর অডিশনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে ছবিটির ‘মতি’ চরিত্রের জন্য চূড়ান্ত হন।
উত্তরবঙ্গের সৈয়দপুর ও পার্বতীপুরে ছবিটির শুটিং হয় টানা ১৬ দিন। তার আগে দুজনই সেখানের আঞ্চলিক ভাষা রপ্ত করেন। ভাষা শিখতে মুন্না উত্তরের সুর সিনেমা দেখেন, সে অঞ্চলের সহশিল্পীদেরও সহায়তা নেন।
সিনেমাটির কিছু দৃশ্যধারণ ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একটি দৃশ্যে দুই অভিনেতাকে বিশাল একটা পানির ট্যাংকের ওপর উঠতে হয়েছিল। মুন্নার উচ্চতা ভীতি আছে, কিন্তু চরিত্রের খাতিরে সেই ভয় জয় করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যান। তার পেছনে আসা শান্তর অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়। লোহার ব্যারিকেড আঁকড়ে ধরে কাঁপতে কাঁপতে উঠছিলেন তিনি। মুন্না তাঁকে সাহস দিয়ে ওপরে তোলেন। দৃশ্যটির কাজ শেষ করে নিচে নামার পরও কাঁপছিল তাঁদের শরীর।
আরেকটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ছিল চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাইকেল চালানোর দৃশ্য। ট্রেনের তীব্র বাতাসের টানে সাইকেলটি ট্রেনের দিকে চলে যাচ্ছিল, ঘটতে পারত দুর্ঘটনাও। শুটিংয়ের এই কঠিন সময়ে তাঁদের মধ্যকার বন্ধুত্বের বন্ধনটি সুদৃঢ় হয়, যা পর্দার ‘মতি’ ও ‘বাচ্চু’ চরিত্রের রসায়নেও প্রতিফলিত হয়েছে, মনে করেন তাঁরা।
প্রেরণা থেকে অর্জন
মুন্নার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা তাঁর মা। মুন্নার অভিনেতা হওয়ার সিদ্ধান্তে মায়ের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। কিন্তু উড়াল সিনেমার ডাবিং শুরুর মাত্র পাঁচ দিন আগে ২০২৪ সালের ২১ এপ্রিল তাঁকে হারান মুন্না। সেই শোক নিয়েই তাঁকে ডাবিংয়ে দাঁড়াতে হয়েছিল। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত থাকায় তাঁর নিজের কাছেই ডাবিং মনমতো হচ্ছিল না। পরে আবার ডাবিং করেন।
শান্তর ক্ষেত্রেও তাঁর পরিবার, বিশেষ করে বাবা ও বোন নীলা ছিলেন বড় শক্তি। রবীন্দ্রভারতীর শিক্ষা আর দেশের মফস্সল থেকে উঠে আসার জেদ তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার অর্জনের পর তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তাঁর মা–বাবাসহ পুরো ‘উড়াল’ টিমের প্রতি।
‘তাকদীর’ সিরিজে অভিনয় করে পরিচিতি পেলেও ‘উড়াল’ মুন্নাকে দিয়েছে পুরস্কার। মুক্তির অপেক্ষায় আছে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র ‘হাঙর’। মুন্নার লক্ষ্য খুব সাধারণ, অভিনেতা হিসেবে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা।
শান্তর কাছেও এই পুরস্কার তাঁর শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রাখার প্রেরণা। তিনি মনে করেন, এই স্বীকৃতি তাঁকে সামনে আরও সাহসী করে তুলবে।