
নায়ক হতে এসে কেউ খলনায়ক, কেউ আবার খলনায়ক থেকে নায়কও হয়েছিলেন। আবার কেউ নাটক–চলচ্চিত্রে লম্বা সময় ধরে ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে একটা সময় খল চরিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। খল চরিত্রে অভিনয় তাঁদের কাছে তাই ভীষণ উপভোগ্যও। দর্শকের কাছে তাঁরা পরিচিত ‘ভিলেন’ হিসেবেই। দেশের চলচ্চিত্রে একটা সময় রাজু আহমেদ, গোলাম মুস্তাফা, খলিল, জাম্বু, রাজীব, হুমায়ুন ফরীদি, এ টি এম শামসুজ্জামান, মিজু আহমেদরাও খলচরিত্রে নিজেদের উজ্জ্বল উপস্থিতির স্বাক্ষর রেখেছেন। তিন দশক ধরে মিশা সওদাগর, ডনসহ আরও কয়েকজনকে খল চরিত্রে অভিনয়ে দেখা গেলেও ইদানীং নতুন কয়েকজন খল চরিত্রে ভালো করছেন। বৈচিত্র্যময় অভিনয়ের কারণে পরিচালক-প্রযোজকেরাও তাঁদের মধ্যে নির্ভরতা খুঁজছেন। দর্শকও তাঁদের পছন্দও করছেন।
ঢালিউডে কয়েক বছরের মধ্যে আলোচিত খল চরিত্রের অভিনেতার কথা বললে, চোখ বন্ধ করে দর্শকেরা তাসকিন রহমানের নাম বলবেন। ২০১৭ সালে ‘ঢাকা অ্যাটাক’–এ প্রথমবার খল চরিত্রেই বাজিমাত করেন তিনি। অনেকে এমনো বলেন, এই ছবিতে নায়কের চেয়ে খলনায়ক ছিলেন বেশি আলোচিত। তাঁর অভিনয় দর্শকমনে নাড়া দেয়। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ে যুক্ত তাসকিন। শিশুশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের কয়েকটি নাটকে অভিনয় করলেও চলচ্চিত্রে প্রথম করেন ১৯৯৫ সালে, ‘হৃদয় আমার’—এ ছবিতে আমিন খানের ছোটবেলার চরিত্রে। এরপর ২০০২ সালে লেখাপড়া করতে অস্ট্রেলিয়া চলে যান। ঠিক দুই বছর অভিনয় করেন আদি ছবিতে। এরপর করেন ‘মৃত্যুপুরী’ (২০১৫), ‘অপারেশন অগ্নিপথ’ ও ‘ঢাকা অ্যাটাক’ (২০১৭) ছবিতে। মজার ব্যাপার, তাঁর করা চার নম্বর ছবিটি মুক্তি পায় প্রথমে। সেটিই তাঁকে পরিচিতি এনে দেয়। দেশের বাইরে ভারতেও অভিনয় করেন তাসকিন। ‘সুলতান: দ্য সেভিয়ার’ ছবিতে বাংলাদেশি এই অভিনয়শিল্পীর অভিনয় প্রশংসিত হয়। তাসকিন আরও বেশ কটি ছবিতে খল চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে ‘অপারেশন সুন্দরবন’, ‘ক্যাসিনো’ ও ‘মিশন এক্সট্রিম’ সিরিজের দ্বিতীয় কিস্তিসহ আরও কয়েকটি ছবি।
সিনেমায় নতুন খল অভিনেতা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন রাশেদ অপু। ‘নবাব এলএলবি’তে প্রথম তাঁকে খল চরিত্রে দেখা গেছে। এর পর ‘জানোয়ার’, ‘দামাল’, ‘কসাই’, ‘অমানুষ’ ছবিতে তিনি খল চরিত্রে নজর কাড়েন। তাঁর অভিনীত আরও আট থেকে দশটি সিনেমা মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এখন নেতিবাচক চরিত্রে নির্মাতাদের ভরসার নাম তিনি। অভিনয়ের প্রথম দিকে আঞ্চলিক ভাষায় কমেডি চরিত্রে দর্শকদের হাসির খোরাক জুগিয়েছেন। এখন পর্দায় ‘খারাপ মানুষ’ হয়ে প্রশংসা কুড়াচ্ছেন। খল চরিত্রে অভিনয় বেশ উপভোগ করেন বলেই জানালেন তিনি। এ ধরনের চরিত্রে বৈচিত্র্য বেশি, দর্শকের প্রতিক্রিয়াও ভালো। তাই তিনিও বেশ আশাবাদী। ভিলেনদের দর্শকেরা যে জায়গা থেকে দেখে এসেছেন, সেখানে নতুন কিছু করে তাঁদের মনে জায়গা করে নেওয়া কঠিন বলেও মনে করছেন অপু। তিনি বলেন, ‘নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছি। দীর্ঘদিন নাটকে পার্শ্ব অভিনেতার চরিত্র করেছি। যখন “নবাব এলএলবি” সিনেমায় প্রধান খল চরিত্রে সুযোগ পেলাম, অভিনয় করলাম, মনে হলো, এটাই আমার জায়গা।’
‘নবাব এলএলবি’তে পরিচালক সুমন আনোয়ারকেও খল চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গেছে। এই ছবিতে অভিনয় করে তিনিও দর্শকমনে জায়গা করে নিয়েছেন। যদিও টিভি নাটক নির্মাণ করে পরিচিতি পাওয়া সুমনের শুরুটা হয় মঞ্চ অভিনেতা হিসেবে। পরে কয়েকটি টিভি নাটকেও অভিনয় করেন। নির্মাতা হিসেবে ব্যস্ত হওয়ায় অভিনয়ে আর পাওয়া যায়নি তাঁকে। ইদানীং আবারও সরব হয়েছেন অভিনয়ে। ‘নবাব এলএলবি’র পর ওয়েব ফিল্ম ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ ও ‘সাত নাম্বার ফ্লোর’–এ নেতিবাচক চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক পছন্দ করেছেন। ওয়েব সিরিজ ‘কাইজার’ ও ‘হাওয়া’ সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আছেন তিনি।
ঈদে মুক্তি পাওয়া দুই ছবি ‘পরাণ’ ও ‘সাইকো’তে তাঁর রোজী সিদ্দিকীর অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। চলচ্চিত্রের খল চরিত্রে পুরুষদের পাশাপাশি একটা সময় খল চরিত্রে নারী শিল্পীদেরও আধিপত্য ছিল। রওশন জামিল, মায়া হাজারিকা, সুমিতা দেবী, রিনা খান কিংবা শবনম পারভীন একসময় চলচ্চিত্রের পর্দায় ছিলেন ‘মূর্তিমান আতঙ্ক’। এখন বাংলা সিনেমায় খল চরিত্রে নারী শিল্পীরা অনেকটাই নিষ্প্রভ। সেই সময়টায় রোজী সিদ্দিকী খল চরিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় এসেছেন। এ প্রসঙ্গে রোজী সিদ্দিকী বলেন, ‘টেলিভিশনে খল চরিত্রে কাজ করেছি। তবে চলচ্চিত্রে এবারই প্রথম। খল চরিত্রে আরও অনেক বেশি কাজ করতে চাই। ৩২ বছর ধরে অভিনয় করছি। আমার মনে হয়, খল ও কমেডি চরিত্রের মতো কঠিন অভিনয় তো আর হয় না। আমার তো যথেষ্ট বয়সও হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ এখন নিতে চাই।’
‘নবাব এলএলবি’র খল চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন এল আর খান সীমান্ত। ছিলেন মডেল। কিন্তু টার্গেট ছিল সিনেমা, চেয়েছিলেন ভিলেন হতে। ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। অনন্য মামুনের ‘সাইকো’তেও তাঁকে খল চরিত্রে দেখা গেছে। তাঁকে খল চরিত্রে দারুণ মানায় বলে মনে করছেন তাঁর সঙ্গে কাজ পরিচালকেরা। সীমান্ত সময়ের ব্যস্ততম খল অভিনেতাদের একজন। মুক্তির অপেক্ষায় আছে তাঁর ছবি ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘ক্যাসিনো’, ‘লিডার: আমিই বাংলাদেশ’, ‘রিভেঞ্জ’, ‘মাসুদ রানা’ ইত্যাদি। সীমান্ত বললেন, ‘সব কটি ছবিতে নেগেটিভ চরিত্রে কাজ করেছি। শুরু থেকেই ভিলেন চরিত্র টানত। অনেক আগে একটা নাটকে কাজ করেছি। সেখানেও নেগেটিভ চরিত্র ছিল। ছোটবেলা থেকে সিনেমা দেখলে নেগেটিভ চরিত্রগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হতো। তাই খল চরিত্রে অভিনয় করে আনন্দ পাচ্ছি।’
এঁদের বাইরেও শতাব্দী ওয়াদুদ, ফারহান খান, শাহেদ আলী, নাসির উদ্দিন খান, জাহিদ ইসলামসহ আরও কয়েকজন খল চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হচ্ছেন।