‘রকস্টার’–এর বিভিন্ন লুকে শাকিব খান। কোলাজ
‘রকস্টার’–এর বিভিন্ন লুকে শাকিব খান। কোলাজ

মেশিনগান নয়, গিটার হাতে ‘রকস্টার’ শাকিব কি বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন

শাকিব খান নিজের সিনেমার প্রচারে অংশ নেন না। সে তো শাহরুখ খান, অজিত, বিজয় থেকে ফাহাদ ফাসিল—অনেক বলিউডি আর দক্ষিণি তারকাই নেন না। কিন্তু কয়েক বছর ধরে শাকিব খান যা করেন, সেটা হলো মুক্তির কয়েক সপ্তাহ পরে সিনেমার বিশেষ প্রদর্শনীতে হাজির হন। বিশেষ প্রদর্শনী শেষে সবাই সিনেমার প্রশংসা করবে, বড় তারকার স্তুতি গাইবে এটাই যেন অলিখিত নিয়ম। সে জন্যই এবার কৌতূহলটা বেশি ছিল। কারণ, গত ঈদুল ফিতরে মুক্তি পাওয়া আবু হায়াত মাহমুদ পরিচালিত ও শাকিব খান অভিনীত সিনেমা ‘প্রিন্স: ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’ ঠিক পাতে দেওয়ার মতো নয়। মুক্তির আগে তো বটেই, মুক্তির পরেও সিনেমাটি নিয়ে চলছিল এন্তার বিতর্ক। এমন সিনেমার বিশেষ প্রদর্শনী কি হবে? হলেও কি শাকিব খান সেখানে যাবেন? এখানেই বড় চমকটা নিজের আস্তিনের তলায় লুকিয়ে রেখেছিলেন শাকিব। তিনি গেলেন এবং প্রদর্শনী শেষে ছবির ব্যর্থতার সব দায় নিজের কাঁধে তুলে নিলেন! সিনেমার ব্যর্থতার বড় দায় পরিচালক ও প্রযোজকের। কিন্তু শাকিব যেভাবে বড় তারকাসুলভ মনোভাব দেখিয়ে সবাইকে আড়াল করেছেন, সেটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তবে চমকের এখানেই শেষ হয়, এর দিন কয়েকর মধ্যেই আসে পবিত্র ঈদুল আজহার সিনেমা ‘রকস্টার’–এর পোস্টার। যা দেখে চমকে যাওয়ার জোগাড়। তবে কে জানত, সেটা কেবল শুরু মাত্র, শাকিবের ‘রকস্টার–চমক’–এর তখনো বাকি আছে।

অচেনা শাকিব
‘তুফান’, ‘বরবাদ’ থেকে ‘প্রিন্স’—গত কয়েক বছরে মুক্তি পাওয়া সিনেমাগুলো শাকিব খানকে দেখা গেছে গ্যাংস্টার নয়তো সহিংস অ্যাকশনের চেহারায়। যেখান থেকে আপনি যদি ‘রকস্টার’–এর পোস্টারে পনিটেল চুল, সারা শরীরে ট্যাটু, ছিপছিপে শরীরের শাকিবকে দেখেন; চমকে না গিয়ে উপায় কী। এরপর আসে অ্যানিমেশন টিজার। বাংলাদেশের সিনেমায় অ্যানিমেশন টিজার!

‘রকস্টার’–এর শাকিব খান। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

তা–ও শাকিব খানের মতো বাণিজ্যিক সিনেমার বড় তারকার ছবিতে; চমকে দিতে এই কি যথেষ্ট নয়। এবার যে শাকিব আর সেই আগের শাকিব নেই, সেটা এই টিজারের পর আরও প্রমাণ হয় পরের ভিডিও টিজারে। কোনো সংলাপ নেই, কেবল শব্দ আর ভিজ্যুয়াল–নির্ভর টিজারটিও প্রশংসা পাওয়ার মতোই। এই টিজারে দেখা যায়, ছবিতে শাকিব খানের বিভিন্ন লুক। সবচেয়ে চমক–জাগানিয়া ছিল, উঠতি রকস্টারের লুক। যেখানে তরুণ বয়সের গায়কের চরিত্রে শাকিব, অনেকটা ওজন ঝরিয়ে যেভাবে নিজেকে বদলেছেন; এখানের তাঁর নিবেদন স্পষ্ট।

গত কয়েক বছরে শাকিবের সিনেমাগুলোর বেশির ভাগই ছিল অ্যাকশন–নির্ভর। সেখানে অভিনয়ের খুব বেশি জয়াগা ছিল না। কিন্তু ‘রকস্টার’–এ তো তাঁর হাতে সেই বহুল চর্চিত মেশিনগান নেই, আছে গিটার। আর কে জানা জানে মিউজিক্যাল সিনেমায় এক্সপ্রেশন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। টিজার আর গান দেখে যা বোঝা গেছে, অভিনয় দিয়ে চমকে দিতে চলেছেন শাকিব।

প্রচারে চমক আর গানের ঝলক ঢাকাই ছবির প্রচার নিয়ে বরাবরই লেজেগবরে অবস্থা চলে। বাদ যায়নি শাকিব খানের সিনেমাও। কখনো টিজার, কখন গান আর কখনই–বা ট্রেলার আসে মালুম হয় না। শাকিব অভিনীত ‘অন্তরাত্মা’র কথা মনে আছে? ঈদের দিন কয়েক আগে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই একের পর এক যেভাবে গান আর টিজার আসছিল, যা দেখে এক সহকর্মী বলেছিলেন, ‘ঈদের আগে রাতে না পুরো সিনেমাটাই দিয়ে দেয়!’
‘রকস্টার’–এ সেটা হয়নি। শাকিবের জন্মদিনে আসে পোস্টার। এরপর বিরতি দিয়ে একে একে এসেছে দুই টিজার আর দুই গান; সঙ্গে কয়েকটি নতুন পোস্টার।

‘রকস্টার’–এ শাকিব। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

‘রকস্টার’ সংগীতনির্ভর সিনেমা; গান যে এখানে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অ্যানিমেশন টিজারে ‘আমাকে উড়িয়ে দাও’ গানটির অংশবিশেষ শুনেই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। তবে এখানেও নির্মাতারা চমকে দিয়েছেন, প্রথমে এটি হয় প্রকাশ করার হয় ‘পিরিতি’। ‘পিরিতি’ গানটিতে শাকিব খানকে দেখা গেছে জেলে, বিধ্বস্ত অবস্থায়। তবে তিনি কেনই–বা জেলে গেলেন, সেটা অবশ্য প্রকাশ করা হয়নি। গানটি লিখেছেন হাসান রোবায়েত, আর সুর করেছেন আহমেদ হাসান সানি এবং সংগীত পরিচালনা করেছেন জাহিদ নিরব। গানটি গাওয়ার সঙ্গে পর্দায়ও দেখা গেছে পান্থ কানাইকে।
এরপর দিন কয়েক আগেই এসেছে দ্বিতীয় গান ‘আমাকে উড়িয়ে দাও’। এতে পর্দায় দেখা গেছে শাকিব খান ও সাবিলা নূরকে। গানটিতে সিনেমার গল্প সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেছে। শুরুতে শাকিব খান অভিনীত ‘আগুন’ চরিত্রটিকে দেখা যায় সংগ্রামী গায়ক হিসেবে।

গান লিখছেন, রেকর্ড করছেন; প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসছে নানা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া। ধীরে ধীরে জনপ্রিয় রকস্টার হয়ে ওঠেন শাকিব খান। শহরের বড় বিলবোর্ডে তাঁর ছবি দেখা যায়, বাইরে বের হলেও ভক্তরা অটোগ্রাফের জন্য মুখিয়ে থাকেন। তাঁর এই পুরো যাত্রায় সঙ্গী থাকতে দেখা যায় সাবিলা নূরকে। কিন্তু শাকিব জনপ্রিয় হওয়ার পর সাবিলাকে আর দেখা যায় না! যে গায়কের সংগ্রামের দিনগুলোয় তিনি ছিলেন, জনপ্রিয় হওয়ার পর কেন হারিয়ে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে সিনেমাটি মুক্তির পরেই।
গানটি নিয়ে শাকিব–ভক্তরা তো বটেই, দেশি–বিদেশি ইউটিউবারও উচ্ছ্বসিত।

‘রকস্টার’–এ শাকিব। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

নতুন পরিচালক, নতুন লেখক
গত কয়েক বছরে নিজেকে খোলনলচে বদলে ফেলার চেষ্টা করেছেন শাকিব। হিমেল আশরাফ, মেহেদী হাসান, আবু হায়াত মাহমুদ থেকে এবার আজমান রুশো—একের পর এক নতুন নির্মাতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। সিনেমা দুনিয়ার খুব কম বড় তারকাই এভাবে নতুন নির্মাতাদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন। এমনকি মেহেদী হাসানের ‘বরবাদ’ হিট হলেও পরের ঈদে তাঁর সঙ্গে আর ছবি না করে নতুন নির্মাতাকে বেছে নিয়েছেন।
সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন নুসরাত মাটি, যিনি গত বছর মুক্তি পাওয়া পিপলু আর খানের ‘জয়া আর শারমিন’–এর অন্যতম চিত্রনাট্যকার ছিলেন। ‘জয়া আর শারমিন’ আপনি যদি দেখে থাকেন, তাহলে বোঝার কথা ‘রকস্টার’ একেবারেই ভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক সিনেমা। আবার ‘উৎসব’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দিয়ে পরিচিতি পাওয়া দুই লেখক আয়মান আসিব ও সামিউল ভূঁইয়া ‘রকস্টার’–এর সংলাপ লিখেছেন। নুসরাত মাটি, আয়মান আসিব ও সামিউল ভূঁইয়া শাকিবের খানের সিনেমার চিত্রনাট্য আর সংলাপ লিখবেন—এটাও–বা কে ভেবেছিল।

আজমান রুশো বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা, বড় পর্দায় ‘রকস্টার’–এ তাঁর প্রথম সিনেমা। আরেকজন নতুন পরিচালকের সঙ্গে শাকিবের ‘রকস্টার–যাত্রা’ কেমন হলো, সেটা সিনেমা মুক্তির পরেই বোঝা যাবে।

‘রকস্টার’–এ শাকিব। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

একটাই শঙ্কা ‘রকস্টার’–এর টিজার, গান যা প্রকাশিত হয়েছে, সবই আশাজাগানিয়া। নিজেকে অ্যাকশনের মেজাজ থেকে বের করে সেভাবে একেবারে নতুন চরিত্রের চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, সেটাও তারিফ করার মতোই। কিন্তু মুশকিল একটাই, ‘রকস্টার’ হয়তো সিনেমা হিসেবে ভালো হলো কিন্তু প্রত্যাশামতো ব্যবসা করবে কি? শাকিব খান দীর্ঘ ২৭ বছরের ক্যারিয়ারে আড়াই শর বেশি সিনেমা করেছেন, তাঁকে দেখা গেছে নানা ধরনের চরিত্রে। কিন্তু মোটা দাগে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি ছিলেন ঢাকাই বাণিজ্যিক সিনেমার প্রধান তারকা, তাঁর সিনেমা ছিল মূলত একক প্রেক্ষাগৃহ–নির্ভর; সারা দেশের সাধারণ মানুষেরা অপেক্ষা করতেন তাঁর সিনেমার জন্য। অপেক্ষা করতেন একক হলের মালিকেরাও। সাধারণ মানুষ, শাকিবের অনেক পাঁড় ভক্ত তাঁকে পর্দায় ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ চরিত্রে দেখতে চান, নায়কোচিত ব্যাপার–স্যাপার দেখতে চান। ‘তুফান’ বা ‘বরবাদ’–এর মতো সিনেমায় এসব আছে; সিনেমা দুটিও হিট হয়েছিল। কিন্তু শিল্পমান বিচারে ‘তাণ্ডব’ এই দুই সিনেমার চেয়ে এগিয়ে। নিজেকে বদলে শাকিব যখন ‘তাণ্ডব’ করলেন, দর্শকেরা কি তাঁকে আগের মতো গ্রহণ করেছিল? ‘রকস্টার’–এর ক্ষেত্রেও এই আশঙ্কা কি অমূলক? শাকিব খান নিজেকে বদলেছেন, তাঁর পাঁড় ভক্তরাও বদলাবেন কি?

আজমান রুশো জানান, নির্মাণে আসার আগে তিনি নিজেও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিজের জীবন ও বাস্তব জীবনের রকস্টারদের নানা অভিজ্ঞতার মিশেলে তিনি এই গল্পটি তৈরি করেছেন।
‘রকস্টার’–এ শাকিব। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সৌজন্যে

‘রকস্টার’ সম্পর্কে
সিনেমায় শাকিব খানকে দেখা যাবে এক সংগীতশিল্পীর চরিত্রে। আজমান রুশোর গল্পে নির্মিত ছবিতে একজন সংগীতশিল্পীর জীবনসংগ্রাম, উত্থান–পতন এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার নানা দিক তুলে ধরা হবে। আজমান রুশো জানান, নির্মাণে আসার আগে তিনি নিজেও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিজের জীবন ও বাস্তব জীবনের রকস্টারদের নানা অভিজ্ঞতার মিশেলে তিনি এই গল্পটি তৈরি করেছেন। সিনেমাটিতে শাকিবের তিন নায়িকা সাবিলা নূর, তানজিয়া মিথিলা ও সুনিধি নায়েক।
সিনেমাটির বেশির ভাগ গানের কথা লিখেছেন ও সুর করেছেন আহমেদ হাসান সানি। গানগুলোতে কণ্ঠও দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আছে রাজীব হাসান, হাসান রোবায়েত ও অংকনের লেখা গান। সংগীত পরিচালনায় আছেন জাহিদ নিরব। অঞ্জন চৌধুরী নিবেদিত সান মোশন পিকচার্স লিমিটেড প্রযোজিত সিনেমাটির চিত্রনাট্য লিখেছেন নুসরাত মাটি। সংলাপ লিখেছেন আয়মান আসিব ও সামিউল ভূঁইয়া। সিনেমাটির এক্সক্লুসিভ স্ট্রিমিং পার্টনার চরকি।