
‘দাগি’ সিনেমায় কাজ করে মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে সেরা চলচ্চিত্র অভিনেতা হয়েছেন আফরান নিশো। পরপর দুবার এ আয়োজনের উপস্থাপনাও করেছেন এই অভিনেতা। বর্তমান ব্যস্ততা, চলচ্চিত্র ভাবনা ও জীবনদর্শন নিয়ে অভিনেতার সঙ্গে কথা বলেছেন নাজমুল হক
‘সুড়ঙ্গ’, ‘দাগি’ বা ‘দম’—সব সিনেমাতেই আপনার চরিত্রগুলো সাধারণ মানুষ। বাণিজ্যিক সিনেমার ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ চরিত্রের বদলে কেন সাধারণ মানুষের চরিত্র বেছে নেন?
আফরান নিশো: অসাধারণ নায়কোচিত চরিত্র যে আমার ভালো লাগে না, তা নয়। কিন্তু ফিল্ম নিয়ে আমার যে আন্ডারস্ট্যান্ডিং বা আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের শ্রম ও গণমানুষের যে গল্প—সেখান থেকেই আমার এ দায়বদ্ধতা। আমার মনে হয়, সাধারণ মানুষের সাধারণ চরিত্রগুলোকে বড় পর্দায় পোর্ট্রে করা একটা গুড প্র্যাকটিস। সেই জায়গা থেকে আমাকে প্রথমে স্ট্রাইক করে রায়হান রাফীর ‘সুড়ঙ্গ’। রাফী ও তাঁর পুরো টিম; বন্ধু প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিল এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির সঙ্গে আলোচনা করে মনে হচ্ছিল, ওই সময়ের এই সিনেমা দিয়ে শুরু করা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। এরপর এক বছরের বিরতি নিয়ে শিহাব শাহীনের ‘দাগি’ করলাম এবং সবশেষ রেদওয়ান রনির ‘দম’। প্রতিটি সিনেমাতে চরিত্রগুলো হয়তো আলাদা, কিন্তু একটা জায়গায় এদের মিল—এরা সবাই সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের গল্পটাই বলতে চেয়েছিলাম।
‘দম’ সিনেমায় প্রতিকূল আবহাওয়া থেকে শুরু করে অনেক ঝুঁকিই নিতে হয়েছে।
আফরান নিশো: ‘দম’ সিনেমার শুটিংই ছিল এককথায় মিরাকল! আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে অসুস্থ হয়েছিলাম। প্রচণ্ড ঠান্ডায় কাজ করতে হয়েছে। টিমের সবাই চার-পাঁচ লেয়ারের পোশাক পরে থাকত, কিন্তু আমার এক লেয়ারের বেশি পরার সুযোগ ছিল না। অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছি। তবে সবকিছু জয় করেই ফিরেছি। এটা টিমওয়ার্ক ও ভালোবাসার কারণেই সম্ভব হয়েছে।
ছবি মুক্তির আগে প্রচার ছাড়া আপনাকে পাওয়া যায় না, সোশ্যাল মিডিয়ায়ও সক্রিয় নন।
আফরান নিশো: যখন ছোট পর্দায় অভিনয় করতাম, তখনো খুব একটা সাক্ষাৎকার দিতে পছন্দ করতাম না বা কোনো আয়োজনে যেতাম না। মনে হয়, সাক্ষাৎকার বা বিভিন্ন আয়োজনে অনেক সময় খুব উপদেশমূলক কথা বলতে হয়। আমি যেমন মানুষ, ঠিক তেমনভাবে সেখানে কথা বলতে পারি না। অনেক কিছু আরোপিত হয়ে যায়। আমাকে একটা উপদেশমূলক জায়গায় গিয়ে কথা বলতে হয়, যা নিজের কাছে আংশিক মিথ্যে মনে হয়। আবার অনেক সময় দেখা যায় যা বলছি, তা এমনভাবে লেখা হয়েছে, দেখে খারাপ লাগে। অনেক কথা বলার পর এটা যখন ছোট প্যারাগ্রাফের সাক্ষাৎকার হয়ে উঠে, সে কথাগুলো গুছিয়ে না লিখে বা না বুঝে লিখলে একধরনের বিড়ম্বনা তৈরি হয়। সিনেমার টিমের রিকোয়েস্টে বা চুক্তির অংশ হিসেবে সাক্ষাৎকার দিতে হচ্ছে। তবে এর মাঝে একটা জিনিস আমার ভালো লাগতে শুরু করেছে—ছবি মুক্তির পর হলে হলে যাওয়া। মেইনলি হলে যাই দর্শকদের অনুভূতি সংগ্রহ করতে। দর্শকেরা হাসির সিচুয়েশনে হাসছে, নাকি চুপ করে দেখছে—এই অনুভূতিগুলো শোনা আমার কাছে হিপনোটাইজিং।
টানা দুবার মেরিল–প্রথম আলো পুরস্কার অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করলেন। বড় তারকারা তো নিয়মিতই শো করেন। এ ধরনের প্রস্তাব পেলে রাজি হবেন?
আফরান নিশো: আমি সব সময়ই প্রস্তাব পাই। উপস্থাপনা আমি আগে ভয় পেতাম, কিন্তু এখন উপভোগ করছি। মনে হয়, এটাও একটা দায়িত্ব; খুব দরদ দিয়ে যত্ন নিয়ে করার চেষ্টা করি। অভিনেতারা উপস্থাপনা করতে পারেন না—এমন একটা ধারণা আগে ছিল, কিন্তু এখন আর এটা কেউ বিশ্বাস করে না। নাটকের মানুষেরা সিনেমায় ওয়ার্ক করেন না—এমন একটা বিতর্ক বা ‘মিথ’ও ছিল। এই মিথটা চঞ্চল (চৌধুরী) ভাই বা মোশাররফ (করিম) ভাই বারবার ভেঙে দিয়েছেন। একজন অভিনেতা বা পরিচালকের আসলে কোনো নির্দিষ্ট মাধ্যম নেই। এই যে ‘ছোট পর্দা’ বা ‘বড় পর্দা’ বলে জাজ করা হয়, এটা আমার কাছে একধরনের মূর্খতা মনে হয়। আমরা সিনিয়রদের কাছ থেকে শিখেছি যে পর্দা বলে কিছু নেই। ওটিটি আসার পর এখন অডিয়েন্সের টেস্ট লেভেল অনেক পরিপক্ব হয়েছে। তারা এখন বোকা নন, অনেক বুদ্ধিমান। এই স্মার্ট দর্শকদের জন্যই আমাদের ভালো কাজ করে যেতে হবে।
সামনে কি বাণিজ্যিক ধারার কোনো সিনেমা করবেন, নাকি বর্তমান ধারাতেই থাকবেন?
আফরান নিশো: সব ধরনের সিনেমাই করতে চাই। তবে অহেতুক আইটেম সং বা অপ্রাসঙ্গিক গানের প্লেসমেন্ট আমার ভালো লাগে না। যদি লজিক্যালি কোনো আইটেম সং আসে, সেটা ভিন্ন কথা। বিশ্বব্যাপীই এখন প্রচলিত ধারা থেকে বের হয়ে সবাই জনরাভিত্তিক কাজ করছেন—যেমন অ্যাকশন, হরর বা ড্রামা। আমারও সব ধরনের কাজ করার ইচ্ছা আছে। তবে অ্যাকশনধর্মী কাজ করলে অনেক সময় গল্পনির্ভর কাজ করার সুযোগ কমে যায়। কারণ, সেখানে সুন্দর লাগা বা স্টাইলিস হওয়ার একটা প্রেশার থাকে। আমি যতটা পারি গল্পনির্ভর কাজ করে নিতে চাই। তবে কোনো কিছুরই বিরোধী নই।
কোনো পুরস্কার পেলে হুমায়ুন ফরীদিকে উৎসর্গ করেন। কেন?
আফরান নিশো: ফরীদি ভাই সম্পর্কে বলতে গেলে আসলে অনেক ইমোশনাল হয়ে যাই। আমি তাঁকে অনেক মিস করি। ফরীদি ভাইয়ের কাছ থেকে অনেক কিছু নিয়েছি বা নিই, সেটা হয়তোবা উনি নিজেও জানতেন। হয়তো তাঁর সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটাতে পারিনি, কিন্তু যতটুকু পেয়েছি, আমি তাঁকে শ্রদ্ধার চোখে গুরুর মর্যাদা দিই। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমি ব্যক্তি হুমায়ুন ফরীদির প্রেমে পড়েছিলাম আগে, তারপর পারফরমার হুমায়ুন ফরীদির। কাজের বাইরে তাঁর সঙ্গে যে আড্ডাটা আমার হতো, আমি মূলত সেই আড্ডার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। তাঁর যে জীবনবোধ, তাঁর যে অগাধ জানা—তিনি আসলে আমার কাছে একটা ‘উইকিপিডিয়া’ ছিলেন। যেকোনো সময়ে, যেকোনো বিষয়ে ওনার জ্ঞান ছিল অসাধারণ। আমার মনে হয়, তিনি এত বেশি জ্ঞানী ছিলেন দেখেই তাঁর পারফরম্যান্স বা অভিনয় এত বেশি রিয়েলিস্টিক করতে পারতেন। আরেকটা আক্ষেপের জায়গা হলো, এত বড় একজন অভিনেতা হয়েও হুমায়ুন ফরীদি সেভাবে পুরস্কৃত হননি। এটা আমার কাছে আক্ষেপের। তাই আমার প্রতিটা পুরস্কার আমি তাঁকে উৎসর্গ করি। এটা একধরনের প্রতিবাদ।