
‘যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্যি রাজা পুণ্যি দেশ’, ‘আলো হাওয়া বেঁধো না, রোগে ভুগে মোরো না’—দাদি–নানির মুখে শোনা এমন বচনগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে আছে বাংলার লোকজ জ্ঞানভান্ডার, যা খনার বচন হিসেবেই প্রচলিত যুগের পর যুগ। সিংহলের রাজকন্যা খনা, যার আরেক নাম লীলাবতী—জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এক বিদুষী নারী। ভারতবর্ষের ইতিহাসে খনা ও তাঁর বচন বহন করে সুগভীর জ্ঞানচর্চা ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর; যেখানে কৃষি, পরিবেশ, বাস্তুবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্রের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং মানুষের মঙ্গলের কথা উঠে আসে। সেই খনার বচন ও উপকথাকে নাট্যরূপ দিয়ে নির্মিত ‘খনা’র শততম মঞ্চায়ন ঘিরে গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুরু হয়েছে দুই দিনের ব্যতিক্রম এক উৎসব।
আজ শনিবার দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে উৎসব চলবে, সন্ধ্যায় শুরু হবে ঢাকার মঞ্চে আলোচিত এ নাটকের ১০০তম প্রদর্শনী।
নাট্যদল বটতলার প্রযোজনা ‘খনা’ রচনা করেছেন সামিনা লুৎফা নিত্রা, নির্দেশনা দিয়েছেন মোহাম্মদ আলী হায়দার। ২০১০ সালের মার্চে প্রথম মঞ্চায়নের পর থেকে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত মঞ্চস্থ হয়ে আসছে নাটকটি। ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে ৯৯টি প্রদর্শনী। আয়োজকেরা জানান, আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শততম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ২০১০ সালের ৯ মার্চ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারেই সহস্র দর্শকের সামনে নাটকটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেই স্মৃতিবাহী স্থানেই ফিরে এসে শততম মঞ্চায়নের আয়োজন—যেখানে অতীতের ধারাবাহিকতা আর বর্তমানের শিল্পচর্চা একসূত্রে মিলেছে। শুক্রবার দারুণ সাড়াও মিলেছে।
খনা পরিচিত তাঁর বচনের জন্য। কৃষি, আবহাওয়া, গৃহনির্মাণ থেকে শুরু করে চিকিৎসা—বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর নামে প্রচলিত বচন কেবল বাংলাতেই নয়, ছড়িয়ে আছে বিহার, আসাম থেকে ওডিশা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে। লোককথা অনুযায়ী, লীলাবতী বা খনা ছিলেন জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী এক নারী; তাঁর স্বামী মিহির ও শ্বশুর বরাহ মিহির—উভয়ই জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত। পুত্রবধূর জ্ঞান ও খ্যাতিতে শ্বশুরের ঈর্ষা এবং তারই পরিণতিতে জিব কর্তনের নির্মম ঘটনা—এই আখ্যানই নাটকের মূল উপজীব্য।
তবে ‘খনা’ শুধু অতীতের গল্প নয়; এটি নারী ও শ্রেণিপ্রশ্নকে সামনে এনে সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে এক গভীর সংলাপ তৈরি করে। নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দারের ভাষ্য, ‘খনা’ এমন এক নাটক, যা নারী ও শ্রেণির প্রশ্নকে সামনে আনে। গল্পটি প্রায় ১ হাজার ৫০০ বছর আগের হলেও আজও সমান প্রাসঙ্গিক। ঘরের বাইরে পা ফেলা নারীর প্রথম বাধা যে ঘরের ভেতর থেকেই আসে—এই নাট্যকাহিনি তারই এক নির্মম প্রতিফলন। প্রজন্মান্তরে বহমান কৃষিজ্ঞান ও প্রজ্ঞার উৎস খোঁজার পাশাপাশি খনা তাঁর জীবনের নানা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে দর্শকদের এক ভিন্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করান।
শততম মঞ্চায়নকে কেন্দ্র করে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। শুধু নাটক মঞ্চায়নের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়, বরং শুক্রবার থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। নানা আঙ্গিকে লোকজ ঐতিহ্য ও সমকালীন শিল্পচর্চাকে একসঙ্গে হাজির করার প্রয়াস দেখা গেছে আয়োজনে। রয়েছে সংগীত, অঙ্কন, পাপেট শো, লাঠিখেলা, লোকগানসহ নানা সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা। দুই দিনই আছে ‘দেশীয় পণ্যের মেলা’; যেখানে কৃষিপণ্য, কারুপণ্য, পোশাক ও বইপত্রের পসরা সাজানো হয়েছে।
শুক্রবার সকালে শিল্পী ও অ্যাকটিভিস্ট অরূপ রাহীর পরিচালনায় ‘উদয়ভানু সঙ্গ’ অধিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসব শুরু হয়। দিনজুড়ে যন্ত্রসংগীত, গান, শিশুদের জন্য ব্রতচারী নৃত্য, আবৃত্তি এবং বিশেষ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। মৃৎশিল্পী খোকন কারিগরের ‘মাটির পাঠশালা’ এবং চিত্রশিল্পী মনজুর রশীদের ‘আঁকিবুঁকিতে বসন্ত’ শীর্ষক আর্ট ক্যাম্পে অংশ নেয় শিশুরা। কাকতাড়ুয়া পাপেট থিয়েটারের পরিবেশনাও দর্শকদের বাড়তি আনন্দ দেয়।
প্রথম দিনের দ্বিতীয় পর্বে টাঙ্গাইলের কুদরত আলী দলের লাঠিখেলা ও কুমারগাতার ওয়াসিম বয়াতি ও মাহমুদপুরের আজিজুল বয়াতির ধুয়াগান পরিবেশিত হয়। সন্ধ্যায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনার পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয় খনা নিয়ে আলোচনা। ‘খনার আলাপ’ শীর্ষক আলোচনা পর্বে খুশী কবিরের সভাপতিত্বে অংশ নেন তাহমিনা আহমেদ, শিরিন হক, তৌকীর আহমেদ, ফয়েজ জহির, তাসলিমা আকতার, আবু সাঈদ, সামিউন জাহান প্রমুখ। শেষে সৌম্য সরকার ও ব্রাত্য আমিন নির্মিত একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়।
নাটকের রচয়িতা সামিনা লুৎফা নিত্রা প্রথম আলোকে বলেন, ‘শততম প্রদর্শনী আমাদের জন্য বড় একটি মাইলফলক। শুরুতে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল—হল বুকিং, শো ডেট, পরীক্ষামূলক নকশা—সবকিছু অতিক্রম করেই আমরা এখানে পৌঁছেছি।’ তিনি জানান, লীলাবতীর প্রকৃতিজ জ্ঞানকে কেন্দ্র করেই উৎসবের সামগ্রিক আয়োজন সাজানো হয়েছে, যাতে লোকজ ঐতিহ্য ও সমকালীন শিল্পচর্চার একটি সংযোগ তৈরি হয়।
আজ শনিবার দিনভর মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন চলবে। সন্ধ্যা সাতটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মঞ্চে প্রদর্শিত হবে খনার শততম মঞ্চায়ন। শেষে রয়েছে শততম মঞ্চায়নের স্মারক উপহার প্রদান।
নাটক রচয়িতা সামিনা লুৎফা নিত্রা স্বয়ং লীলাবতী তথা ‘খনা’র চরিত্রে অভিনয় করবেন। আরও অভিনয় করবেন কাজী রোকসানা রুমা, ইভান রিয়াজ, ইমরান খান মুন্না, তৌফিক হাসান, শারমীন ইতি, শেউতি শাহগুফতা, কামারুজ্জামান সাঈদ, হাফিজা আক্তার ঝুমা, চন্দন পাল, আবদুল কাদের প্রমুখ।