মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্র—চার দশকের বেশি সময় অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রিনা রহমান
মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্র—চার দশকের বেশি সময় অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রিনা রহমান

আগেই বলে দেয়, আপা পয়সা কম! কত আক্ষেপ নিয়ে চলে গেলেন অভিনেত্রী রিনা রহমান

মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্র—চার দশকের বেশি সময় অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রিনা রহমান। নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের কাছে পরিচিতি পেয়েছিলেন তিনি। তবে অভিনয়ের দীর্ঘ পথচলার আড়ালে ছিল নানা সংগ্রাম, অভাব আর না–বলা কষ্টের গল্প।


গতকাল সোমবার (৩ আগস্ট) রাত ৯টার দিকে মারা যান অভিনেত্রী রিনা রহমান। তাঁর মৃত্যুর খবর প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন অভিনয়শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ অপু। দীর্ঘদিন ধরে স্ট্রোকসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
মৃত্যুর পর আলোচনায় এসেছে রিনা রহমানের একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার। একটি ইউটিউব চ্যানেলকে দেওয়া এ সাক্ষাৎকারে জীবনের নানা অজানা অধ্যায় তুলে ধরেছিলেন অভিনেত্রী। সেখানে তিনি কথা বলেন অভিনয়জীবনের শুরু, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, স্বামী হারানোর পর সন্তানদের মানুষ করার সংগ্রাম, শিল্পীদের বর্তমান অবস্থা এবং শেষ জীবনের চাওয়ার কথা।

রিনা রহমান

‘মরার আগপর্যন্ত যেন কাজটা করতে পারি’
অসুস্থতার মধ্যেও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা কম ছিল না রিনা রহমানের। পাঁচ বছর আগের সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শরীর আগের মতো সায় না দিলেও কাজ করতে চান। ‘আমি এখনো চাই যে মরার আগপর্যন্ত আমি যেন কাজটা করতে পারি। এটুকুই আমার চিন্তা’—বলেছিলেন রিনা রহমান।

তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল না। হাঁটুর সমস্যা, চোখে ছানি পড়াসহ নানা জটিলতার কথা জানিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি ছিল কাজের সংকট। সব সংকট নিয়ে বলেছিলেন, ‘শরীরটা খুব অসুস্থ হয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এখনকার সময়ে আমাদের কোনো কাজ নাই। কাজের খুব অভাব হয়ে গেছে।’

অভিনয়ই ছিল তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন। তাই কাজ না থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ত। সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘যদি কেউ ডেকে একটা কাজ দেয়, তো ডাল-ভাত খাই, এই অবস্থায় আছি।’

খুলনার মঞ্চ থেকে ঢাকার পথচলা
অভিনয়ে রিনা রহমানের হাতেখড়ি খুলনায়। খুলনা নাট্যনিকেতনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয় শেখেন তিনি। শুরুতে ছিলেন নাচের শিক্ষার্থী, পরে গান শেখেন। এরপর ধীরে ধীরে যুক্ত হন অভিনয়ের সঙ্গে।

খুলনার মঞ্চে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। পরে ঢাকায় এসে মঞ্চনাটকে নিয়মিত অভিনয় করেন। বিভিন্ন নাট্যদলের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর।

পুরোনো দিনের মঞ্চচর্চার কথা বলতে গিয়ে রিনা রহমান জানিয়েছিলেন, তখন শিল্পীরা দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত থেকে অভিনয় শিখতেন। সন্ধ্যা হলেই নাট্যদলে যাওয়া, অনুশীলন করা—এসব ছিল শিল্পী হওয়ার পথের অংশ।

রিনা রহমান বলেছিলেন, এখনকার সময়ে সেই চর্চা অনেকটাই কমে গেছে। তাঁর মতে, অভিনয় শেখার আগ্রহ ও অগ্রজদের প্রতি সম্মানের জায়গাতেও পরিবর্তন এসেছে।

রিনা রহমান

স্বামী হারানোর পর সন্তানদের বড় করার লড়াই
অভিনয়জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিজীবনেও নানা কঠিন সময় পার করেছেন রিনা রহমান। অল্প বয়সেই হারিয়েছেন স্বামীকে। তখন তাঁর সন্তানেরা ছিলেন ছোট ছোট। একদিকে অভিনয়ের ব্যস্ততা, অন্যদিকে সংসারের দায়িত্ব—সবকিছু একাই সামলাতে হয়েছে তাঁকে।

সেই সাক্ষাৎকারে রিনা রহমান জানিয়েছিলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের মানুষ করাই হয়ে উঠেছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

চার সন্তানকে বড় করেছেন তিনি। তাঁদের পড়াশোনা করিয়েছেন, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত করেছেন। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই জীবনের অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও লড়াই চালিয়ে গেছেন এই অভিনেত্রী।

বয়স বাড়ার পরও সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন রিনা রহমান। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের কাছে যেতে পারতেন না বলে জানিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘মেয়ে দিয়েছি, বিয়ে দিয়েছি। শ্বশুরবাড়ি গেলে তো একটা খরচ লাগে। তাই মন চাইলেও সব সময় যেতে পারি না।’

অভিনয়ের পাশাপাশি করেছেন চাকরিও
সংসারের দায়িত্ব সামলাতে অভিনয়ের পাশাপাশি অন্য কাজও করতে হয়েছে তাঁকে। শুধু শিল্পী পরিচয় ধরে রাখাই নয়, সন্তানদের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতি তৈরি করাও ছিল তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ।

অভিনয়ের পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরিও করেছিলেন তিনি। সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে হতো তাঁকে। বলেছিলেন, ‘অনেক সময় রাস্তা ভুলে যেতাম। আমার ভাই নিচে দাঁড়িয়ে আপা বলে ডাক দিত, তখন তার সঙ্গে চলে আসতাম।’ অভিনয়ের পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব সামলাতে এভাবেই চলেছে তাঁর জীবন।


‘সম্মানটা এখন কোথাও নাই’
দীর্ঘদিন অভিনয় করেও শেষ জীবনে শিল্পীদের সম্মানের জায়গাটি নিয়ে আক্ষেপ ছিল রিনা রহমানের। তিনি বলেন, আগে সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল। মেকআপ রুমে ঢুকলে সবাই একে অপরকে সালাম দিতেন, খোঁজ নিতেন। বর্তমান সময় নিয়ে বলেন, ‘সম্মানটা তো এখন কোথাও নাই।’ সঙ্গে তাঁর অভিযোগ ছিল, নতুন প্রজন্মের অনেকেই সিনিয়র শিল্পীদের সংগ্রাম ও অবদান সম্পর্কে জানেন না।

সম্মানী কমেছে, বেড়েছে সংকট
প্রায় ৪০ বছরের অভিনয়জীবনে পারিশ্রমিকের বিষয়েও নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়েছিলেন রিনা রহমান। দীর্ঘ এই পথচলায় অভিনয় ছিল তাঁর পরিচয়ের পাশাপাশি জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও শেষ জীবনে এসে পারিশ্রমিক ও আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে আক্ষেপ ছিল তাঁর।
সেই সাক্ষাৎকারে রিনা রহমান জানিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম। কিন্তু শিল্পীদের পারিশ্রমিক সেই অনুপাতে বাড়েনি।

রিনা বলেছিলেন, আগের সময়ে যে পারিশ্রমিক পেতেন, তখন সেটার মূল্য ছিল। কারণ, তখন বাজারদরও তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু এখন সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় একই বা কাছাকাছি পারিশ্রমিক দিয়ে জীবন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে কাজের প্রতি ভালোবাসা থেকেই অনেক সময় কম পারিশ্রমিকেও কাজ করেছেন তিনি।

রিনা রহমানের কথায়, ‘আগেই বলে দেয়, “আপা পয়সা কম। আমরা টাকা পাই নাই, অল্প পয়সায় করে দেন।” তখন মনে হয়, কাজ তো করছি। অন্তত ভাত খাওয়ার মতো পয়সাটা তো পাওয়া উচিত।’

অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসার কারণেই কম পারিশ্রমিকের বিষয়টি মেনে নিয়েছেন বলেও জানিয়েছিলেন এই অভিনেত্রী। তাঁর কাছে অভিনয় শুধু পেশা ছিল না, ছিল দীর্ঘদিনের ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের অংশ।

তবে শেষ জীবনে সবচেয়ে বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল দৈনন্দিন খরচ। বিশেষ করে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে জানিয়েছিলেন তিনি। এ অভিনেত্রী সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এখন অনেক কষ্টে আছি, পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে—ঘরভাড়া থেকে সব খরচ বেড়ে গেছে।’

দীর্ঘদিন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থেকেও একজন অভিনয়শিল্পীর আর্থিক নিরাপত্তার সংকটের কথা তাঁর কথায় উঠে এসেছিল। কাজের সুযোগ, সম্মানী ও সম্মানের জায়গাগুলো নিয়ে তাঁর এই আক্ষেপ শুধু ব্যক্তিগত কষ্টের গল্প নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে শিল্পীদের একটি বড় বাস্তবতার দিকও তুলে ধরে।

শেষ চাওয়া ছিল খুব সাধারণ
জীবনের শেষ সময়ে রিনা রহমানের বড় কোনো চাওয়া ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন একটু স্বস্তি, মাথা গোঁজার জায়গা ও সম্মান।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘যেন এক মুঠো ডাল-ভাত ঘরে বসে খাইয়ে একটু আল্লাহ-বিল্লাহ করে মরতে পারি। এইটুকুই চাই, আর কিছু না।’

পাশাপাশি শিল্পীদের জন্য চেয়েছিলেন সম্মান। বলেছিলেন, ‘আমাদের শিল্পীদের চাওয়া খুবই অল্প—শুধু সম্মান, শুধু সম্মান আর ভালোবাসা।’

মৃত্যুর আগে সর্বশেষ দীপ্ত টেলিভিশনের ধারাবাহিক নাটক ‘পরম্পরা’য় ‘ময়নার মা’ চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। কিন্তু শারীরিক জটিলতার কারণে ফেব্রুয়ারির পর আর শুটিং করতে পারেননি তিনি।

তাঁর অভিনীত জনপ্রিয় কাজের মধ্যে রয়েছে নাটক ‘সংশপ্তক’, চলচ্চিত্র ‘ঘানি’, ‘ঠিকানা’। ধারাবাহিকের মধ্যে ‘মান অভিমান’, ‘জবা’ উল্লেখযোগ্য।