আজিজুল হাকিম
আজিজুল হাকিম

এই সময়ের ছেলেমেয়েদের স্ট্রাগলটা আরও অনেক বেশি: আজিজুল হাকিম

নব্বইয়ের দশকের সেই পরিচিত মুখ আজিজুল হাকিম এখনো অভিনয়ে নিয়মিত। ঈদে রায়হান রাফীর ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমায় তাঁকে দেখা গেছে। ছোট পর্দায় বেশ কিছু নতুন কাজ নিয়ে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। সাম্প্রতিক ব্যস্ততা ও নানা প্রসঙ্গে অভিনেতার সঙ্গে কথা বলেছেন রেজওয়ান সিদ্দিকী

প্রশ্ন

রায়হান রাফীর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

আজিজুল হাকিম : রায়হান রাফীর সঙ্গে এটা আমার প্রথম কাজ। তাঁর কাজগুলো এর আগে দেখেছি। তিনি ভিন্ন ভিন্ন গল্প নিয়ে ব্যতিক্রমী কাজ করার চেষ্টা করেছেন। এ সিনেমার চিত্রনাট্য পড়ার পর ভালো লেগেছে। গল্পটাকে যেভাবে বলতে চেয়েছেন, সেটা আমাকে অনেক বেশি আকৃষ্ট করেছে। আমার জন্য যে চরিত্র নির্বাচন করেছেন, সেটা খুব পছন্দ হয়েছে। তাঁর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মনে হয়েছে, রাফী প্রতিটি চরিত্রকে গল্পের সঙ্গে এমনভাবে অ্যাডজাস্ট করেছেন, যেটা একদম শেষ পর্যন্ত গল্পটাকে টেনে নিয়ে যায়। তাঁর অন্য যে গল্পগুলো আমরা দেখেছি, এই ‘প্রেশার কুকার’-এর গল্পটা একেবারেই ভিন্ন।

প্রশ্ন

আর কী কী কাজ করেছেন?

আজিজুল হাকিম : চরকিতে আমার অভিনীত ‘মিউ’ স্ট্রিমড হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ইউটিউব ও টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য কিছু ঈদের নাটক ও টেলিফিল্ম ছিল ঈদে।

আজিজুল হাকিম
প্রশ্ন

মঞ্চ থেকে শুরু করেছিলেন। ডিজিটাল যুগের তুলনায় সেই সময়কার অভিনয়ের সংগ্রাম বা আনন্দটা কেমন ছিল?

আজিজুল হাকিম : তখন এখনকার মতো এত চ্যানেল ছিল না, শুধু ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন। একাগ্রতাই ছিল নিজেকে অভিনয়শিল্পী হিসেবে তৈরি করা। মঞ্চ ছাড়া অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাকআপ ছিল না। অভিনয় বা মিডিয়া-সংক্রান্ত যে কাজগুলো আছে, সেগুলো নিয়ে পড়াশোনা বা নিজেকে অভিজ্ঞ করার সুযোগ ছিল না। মঞ্চেই নিজেকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছি। এখন অবশ্য এই সুযোগ অনেক বেশি। মঞ্চের পাশাপাশি আমাদের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া ডিপার্টমেন্ট আছে, নাট্যতত্ত্ব বিভাগ আছে। সেখানে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করছে। আমার স্ট্রাগলটা ছিল, মঞ্চনাটকের মাধ্যমে নিজেকে কীভাবে শিল্পী হিসেবে তৈরি করব! এখনকার ছেলেমেয়েরা কিন্তু মঞ্চনাটকে সম্পৃক্ত না হয়েও নিজেদের সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছে। যেহেতু ইন্টারনেটের মাধ্যমে সারা পৃথিবী আমাদের হাতের মুঠোয়, আমরা একমুহূর্তেই সারা পৃথিবীর কাজগুলো দেখার সুযোগ পাচ্ছি। এ যুগের ছেলেমেয়েরা সেই জায়গা থেকেও নিজেদের সমৃদ্ধ করছে। সুতরাং সে সময় আমাদের যে স্ট্রাগল ছিল, এ সময়ের ছেলেমেয়েদের কাছে স্ট্রাগলটা আরও অনেক বেশি। কারণ, সারা পৃথিবীর সঙ্গেই প্রতিযোগিতা করে তাদের কাজগুলো দর্শকের সামনে উপস্থাপন করতে হয়।

প্রশ্ন

কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এই চরিত্রগুলোর ভিড়ে আপনার নিজস্ব সত্তা কি কখনো সংকটে পড়েছে?

আজিজুল হাকিম : অভিনয়ের সময় ভিন্ন চরিত্রে রূপান্তরিত হওয়ার চেষ্টা করি। এ পর্যন্ত যত চরিত্রে অভিনয় করেছি, সব কটিতে সেই চরিত্রই হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছি। তাই প্রতিটি চরিত্রই আমার কাছে আলাদা।

প্রশ্ন

আপনার শান্ত-মার্জিত ইমেজের আড়ালে এমন কোনো বিদ্রোহী বা অস্থির আজিজুল হাকিম কি লুকিয়ে আছে, যাকে দর্শক বা নির্মাতারা কখনো আবিষ্কারের সুযোগ পাননি?

আজিজুল হাকিম : আমি ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। অস্থিরতা কখনো আমার ভেতর কাজ করে না। কারণ, অস্থিরতা মানুষকে অনেক বেশি বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। চেষ্টা করি, যা ঘটে চোখের সামনে, সেটাকে স্বাভাবিক মেনে নিয়ে চলা। ফলে আমার মধ্যে ওই বিদ্রোহী হয়ে ওঠা হয় না। কোনো অপূর্ণতা নেই, যার জন্য আমাকে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে হবে। তবে হ্যাঁ, অভিনয়ের মাধ্যমে আমার যে ইমেজ তৈরি হয়েছে, দর্শকের মধ্যে সেই ইমেজের বাইরে গিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ইমেজে কিছু চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে হয়তো দর্শক আমাকে ভিন্নরূপে দেখতে পাচ্ছেন।

আজিজুল হাকিম। সংগৃহীত
প্রশ্ন

কখনো কি মনে হয়েছে যে অভিনয় আর টানছে না বা সব তো করা শেষ?

আজিজুল হাকিম : কখনো মনে হয়নি যে সব চরিত্র করা হয়ে গেছে। একজন সৃজনশীল শিল্পীর কাজই হলো ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে আবেগগুলোকে ফুটিয়ে তোলা। যখনই কোনো চরিত্রে অভিনয় করি, সেটিকে একটি নতুন রূপ বা ভিন্ন মাত্রা দেওয়ার চেষ্টা করি। এই রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় আমার কোনো অপূর্ণতা বা অতৃপ্তি নেই।

প্রশ্ন

নব্বইয়ের দশকের নাটক আর বর্তমান সময়ের ওটিটি বা ইউটিউবকেন্দ্রিক নাটকের মধ্যে মৌলিক কী পার্থক্য দেখেন?

আজিজুল হাকিম : মূল পার্থক্য হলো সামাজিক বাস্তবতা। নব্বইয়ের দশকের সামাজিক প্রেক্ষাপট আর আজকের ২০২৬ সালের বাস্তবতা এক নয়। আগে নাটক ছিল পরিবারকেন্দ্রিক, এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা বিষয়ভিত্তিক গল্প নিয়ে কাজ হচ্ছে। কনটেন্টের ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে।

প্রশ্ন

ইদানীং অনেকেই বলেন, নাটকে ভিউকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আজিজুল হাকিম : এ সময় যাঁরা কনটেন্ট ক্রিয়েট করছেন, তাঁরা চান যত বেশি দর্শক কনটেন্ট দেখবেন, তাঁদের কাজের প্রসার বাড়বে। এতে কিন্তু আমি দোষের কিছু দেখি না। কারণ, আমাদের সময়ে যখন একটা টেলিভিশন চ্যানেল ছিল, তখন সারা দেশের মানুষ টেলিভিশনের মাধ্যমে নাটক দেখেছেন। কিন্তু এখন তো প্রত্যেকের হাতেই ডিভাইস আছে। অনেক চ্যানেল আছে। অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েট হচ্ছে। সুতরাং ভিন্ন রকম কনটেন্ট দেখার সুযোগ এখন বেশি। এখনো দর্শক আগের দিনের নাটকের প্রতি ভালো লাগার কথা বলেন। এখন যেসব কনটেন্ট তৈরি হচ্ছে, সেগুলো এখনকার দর্শকের কাছে ভালো লাগছে। জনপ্রিয়তার বিচারটা দর্শক করবেন। তাঁরা খুবই বিচক্ষণ। তাঁদের কখনোই নির্বোধ ভাবার কোনো কারণ নেই। দর্শকেরা নিজেদের ভালো লাগার জায়গাটা খুঁজে নেবেন। ভালো না লাগলে তাঁরা কনটেন্ট দেখবেন না।