জাকিয়া বারী মম
জাকিয়া বারী মম

‘বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই প্রতারিত হয়েছে’

আজ থেকে এনটিভিতে শুরু হচ্ছে ‘চাওয়া পাওয়া’। রাকেশ বসু পরিচালিত ধারাবাহিকটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন জাকিয়া বারী মম। নাটক, ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানসহ নানা প্রসঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুর কাদের

প্রশ্ন

ফোন বন্ধ পাচ্ছিলাম, রাকেশ বসু নতুন নম্বর দিলেন।

জাকিয়া বারী মম : ১৫-১৬ বছর ধরে ওই নম্বর ব্যবহার করলাম। উবার-পাঠাওসহ নানা জায়গায় নম্বরটি ছড়িয়ে গেছে। প্রায়ই অনাকাঙ্ক্ষিত ফোনকল ও এসএমএস আসে। নম্বরটি ব্যবহার করা অনেক বেশি বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। তাই ভাবলাম, নতুন একটা নম্বর ব্যবহার করি। এখন অনেকটা স্বস্তিতে আছি। আমি মনে করি, যাঁদের সঙ্গে আমার কাজ, আমাকে যাঁদের প্রয়োজন, তাঁদের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই হবে।

প্রশ্ন

হোয়াটসঅ্যাপে প্রোফাইল ফটোতে দেখা যাচ্ছে আপনি ঘোড়ার পিঠে...

জাকিয়া বারী মম : অনেকে ভেবেছেন, এটা শুটিংয়ের। আসলে তা নয়। কিছুদিন ধরে এআই নিয়ে নিরীক্ষা করছি। নিজেকে ঘোড়ার পিঠে দেখার একটা ফ্যান্টাসি ছিল। এআই দিয়ে তাই করেছি। ঘোড়ার নাম রেখেছি ‘শামস’। মজার বিষয় হচ্ছে, ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখতাম, আমার দুইটা ঘোড়া আছে। একটার পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আরেকটা অন্য একজনকে দিয়ে দিয়েছি।

জাকিয়া বারী মম
প্রশ্ন

সত্যিই যদি দুটো ঘোড়া পেয়ে যান...

জাকিয়া বারী মম : অবশ্যই আমি ঘোড়া দুটো পেলে পুষে রাখব। মাঝেমধ্যে ঘোড়ার পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াব।

প্রশ্ন

কী অদ্ভুত সব কল্পনা, তাই না! আচ্ছা, জীবনটা আপনার কাছে কী?

জাকিয়া বারী মম : জীবনটা তো এমনই। জীবনটা সুন্দর। পরিবার, মা–বাবা, আমার সন্তান—সব ঠিক আছে। আমি ওদের সাথেও থাকি। আমার একা সময়ও থাকে। তবে আমি কখনো একা থাকিনি। আই অ্যাম অলওয়েজ ওয়াচড বাই অলমাইটি।

প্রশ্ন

জীবনে মানুষ তো সঙ্গীর কথাও ভাবে...

জাকিয়া বারী মম : আমিই আমার নিজের সেরা সঙ্গী। জীবন চলতে চলতে তো মানুষ শেখে। বই পড়েও শিখি, তবে সেটা আলাদা। আমি তো জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। জীবন আমাকে নানা সময় নানা শিক্ষা দিয়েছে।

জাকিয়া বারী মম
প্রশ্ন

সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা কী দিয়েছে?

জাকিয়া বারী মম : জীবন সিম্পল, জীবন সুন্দর—এটাকে কখনো জটিল করে তোলো না।

প্রশ্ন

জীবন জটিল হয় কিসে?

জাকিয়া বারী মম : আমাদের কারণেই জীবন জটিল হয়। আমাদের প্রত্যেকের মগজ তো একেকটা পৃথিবী। যার পৃথিবীতে ময়লা আবর্জনা থাকে, তার জীবন জটিল হবে। আর ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার থাকলে জীবন সুন্দর। শরীরে ডায়াবেটিস হবে, নাকি রক্তচাপ হবে—এগুলোর বেশির ভাগ নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাসের ওপর। মগজ চলে—মগজকে কী খেতে দিলাম, কী দেখলাম, কী পড়লাম, কী বুঝলাম তা থেকে। আমি সব সময় টক্সিসিটিকে দূরে রাখতে চাই। কারণ, মুহূর্তটা এই মুহূর্তেই সত্যি।

প্রশ্ন

তার মানে আপনি বর্তমানে বাঁচায় বিশ্বাসী?

জাকিয়া বারী মম : শুধু আমিই নই, মনীষীরাও বর্তমানে বাঁচার কথাই বলে গেছেন। বর্তমানে যদি বাঁচতে না পারি, পরমুহূর্তেই তা অতীত হয়ে যায়। আর ভবিষ্যৎ মানুষের জানার সাধ্যের বাইরে।

প্রশ্ন

মানুষ তো অতীতের কথা মনে করে আফসোস করে?

জাকিয়া বারী মম : কখনো অতীতের কথা মনে করে আফসোস করি না। অতীতের ভালো স্মৃতি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি মনে করি, পৃথিবীতে কোনো কিছুই আনপেইড নয়। কাজই একমাত্র সত্য। সেই জায়গা থেকে বলব, খারাপ সময়টাও দরকার ভালো সময়ে উন্নীত হওয়ার জন্য। তাই খারাপ সময়টাকেও ধন্যবাদ জানাই। কারণ, ওটা না থাকলে ভালো সময়টার জন্য তৈরি হতে পারতাম না। অন্ধকার থাকে বলেই তো আলোর প্রয়োজন হয়, গুরুত্ব পায়।

জাকিয়া বারী মম
প্রশ্ন

আজ তো ৫ আগস্ট, ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের দুই বছর...

জাকিয়া বারী মম : মনে হচ্ছে, এই তো সেদিন। অথচ দুই বছর হয়ে গেছে!

প্রশ্ন

২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার আন্দোলনে আপনি সোচ্চার ছিলেন...

জাকিয়া বারী মম : চোখের সামনে ছাত্র-জনতার মরে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আমি ক্ষুব্ধ হয়েছি। আমি মৃত্যুটা নিতে পারিনি। স্বাধীন দেশের আন্দোলনে আলোচনা হতে পারে, দফায় দফায় আলোচনা চলতে পারে, কিন্তু কেন এভাবে আমার দেশের মানুষ মরবে! যুদ্ধের মতো মৃত্যু কেন হবে! স্বাধীনতার সময় যে আন্দোলন, সেটা আর এটা তো এক নয়। এই ধরনের আন্দোলন তো আমরা পাশাপাশি সময়ে শ্রীলঙ্কা, নেপালেও দেখেছি—মানুষ মরেনি। ভারতেও সাম্প্রতিক সময়ে ককরোচ পার্টি করল—মানুষ তো মরেনি। ভারতে আবার গদিও নড়েনি। ওভাবে মানুষ মারাটা কি আমাদের দেশে দরকার ছিল? মানুষের মৃত্যু নিয়ে এই যে বিতর্ক, কাদা–ছোড়াছুড়ি, অনাস্থা, অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধা—এসব তো মোটেও উচিত ছিল না। আমরা যত যা–ই করি না—মুক্তিযুদ্ধের সাথে অন্য কোনো কিছুকেই তুলনা করা যায় না। কারণ, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে বলেই আমরা কথা বলতে পারছি। না হয় আমাদের জন্ম পরাধীন দেশে হতো।

আমরা সাধারণ মানুষ, রাজনীতি বুঝি না—ওখানে দাঁড়িয়েছি শুধু ছাত্রদের ওপর গুলি চলছে দেখে। এই গুলি তো অন্য দেশ থেকে এসে কেউ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারি এসে আমাদের দেশে গুলি চালিয়েছে—তারা আমাদের শত্রু, ঠিক আছে। কিন্তু আমারই স্বাধীন দেশে ছাত্র-জনতা আর সরকার কীভাবে একজন আরেকজনের শত্রু হয়! এটা কেন হবে? ওই জায়গায় আমি কথা বলেছি। ওই দিন আমাদের মতো হাজার হাজার সাধারণ মানুষ যে রাস্তায় নেমেছে—সবাই আশা করেছে, ভালো কিছু হবে।

জাকিয়া বারী মম
প্রশ্ন

সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?

জাকিয়া বারী মম : অনেক সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু আমরা সেই সম্ভাবনার নেগেটিভ ব্যবহার করেছি, যেটা আমরা বরাবরই করি। আমাদের একটা সহজাত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, নেগেটিভ বিষয়টা ফোকাস হয়ে যায়। সম্ভাবনাটাকে পজিটিভ ব্যবহার করতে পারি না। তাই বলব, যে চাওয়া থেকে আন্দোলনে দাঁড়িয়েছি, পাওয়ার হিসাব মেলেনি। সাধারণ মানুষের আবেগ যে প্রতারিত হলো, এটার প্রতি আমার খারাপ লাগা, দুঃখবোধ আছে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই প্রতারিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ তো রাজনীতি বোঝে না। তারা নিজের কাজটুকু করতে চায় নিষ্ঠার সাথে আর দেশের ভালো হোক, এটাই চায়। সাধারণ মানুষের তো এত টাকা নেই যে সে ভেগে কোথাও চলে যাবে। আবার এত টাকাও নেই যে প্রাসাদ বানিয়ে আরাম–আয়েশে দেশে থাকবে। সাধারণ মানুষকে দেশের মুমূর্ষু চিকিৎসাব্যবস্থাতেই চিকিৎসা নিতে হয়। দেশে ভেজাল খেয়ে বেঁচে থাকতে হয়। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ অনেক বেশি সাদামাটা। খামোখা আমরা এটাকে অনেক জটিল করছি। বাংলাদেশের যে জিওপলিটিক্যাল অবস্থা, বিশ্বরাজনীতির যে নিষ্ঠুরতা শুরু হয়েছে—কী আর বলব, বাংলাদেশের জন্য মায়া লাগে।

প্রশ্ন

আজ থেকে শুরু হচ্ছে নতুন ধারাবাহিক ‘চাওয়া পাওয়া’। আপনার কাছে এই নাটকের সবচেয়ে বড় ‘চাওয়া’ আর সবচেয়ে বড় ‘পাওয়া’ কী?

জাকিয়া বারী মম : সবচেয়ে বড় চাওয়া—মানুষ নাটকটা দেখবেন, পছন্দ করবেন। সবচেয়ে বড় পাওয়াটা তখন হবে, যখন মানুষ নাটকটি ভালোবেসে আমাদের আপন করে নেবেন।
সাক্ষাৎকার: মনজুর কাদের, ঢাকা