লাল গালিচায় আসিফ ইসলাম। ছবি: পরিচালকের সৌজন্যে
লাল গালিচায় আসিফ ইসলাম। ছবি: পরিচালকের সৌজন্যে

রুশ অনেক দর্শক যাত্রার নাচের দৃশ্য দেখে শিস দিচ্ছিলেন

মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে হয়ে গেল ‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’–এর ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। উৎসবের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রথম আলোর মুখোমুখি ছবিটির পরিচালক আসিফ ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুরুল আলম

প্রশ্ন

প্রথম সিনেমার পর দ্বিতীয় সিনেমার ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার মস্কোতে হলো।

আসিফ ইসলাম: পরপর আমার দুই সিনেমা মস্কোকে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হলো। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি। মস্কোতে সিনেমা জমা দেওয়ার পর থেকেই নানা অভিজ্ঞতা হয়েছে। উৎসবের কাছাকাছি সময়ে এসেও জানতে পারিনি, আমাদের সিনেমা সিলেক্ট (নির্বাচিত) হয়েছে কি না। উৎসব শুরুর অল্প কদিন আগে জেনেছি, আমাদের সিনেমা সিলেক্ট হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে হয়েছে।

প্রশ্ন

ছবিটিতে প্রযোজক হিসেবে কারা যুক্ত রয়েছেন?

আসিফ ইসলাম: প্রধান নির্বাহী প্রযোজক জান্নাতুল বাকের খানের সঙ্গে এই ফিল্মের পথচলা শুরু হলেও পরে পর্যায়ক্রমে টিমের সঙ্গে আরও যুক্ত হন প্রযোজক সাকিব ইফতেখার এবং সহকারী প্রযোজক হিসেবে জাকির হোসেন রাজু। তাঁদের সবার কাছে কৃতজ্ঞতা।

পরিচালক আসিফ ইসলাম। ছবি: পরিচালকের সৌজন্যে
প্রশ্ন

কেন দেরি হয়েছিল?

আসিফ ইসলাম: আগে মস্কোতে সিনেমা জমা দিলে সেটার জন্য সেন্সরের দরকার পড়ত না। এবার থেকে রাশিয়ার সরকার আইন করেছে, সিনেমা সেন্সর করেই প্রদর্শনী করতে হবে। যে কারণে কালক্ষেপণ।

প্রশ্ন

শুনলাম, প্রিমিয়ারের পর চলে আসতে চেয়েছিলেন?

আসিফ ইসলাম: হ্যাঁ। কারণ, জার্নি করে আমার শরীর ভালো ছিল না। প্রচণ্ড জ্বর ছিল। গত ১৮ ও ২২ এপ্রিল আমাদের সিনেমার প্রিমিয়ার ছিল। অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে প্রযোজককে বলেছিলাম, ২৩ তারিখে দেশে ফিরে যাব। পরে অবশ্য সুস্থ হয়ে উৎসব শেষেই ফিরেছি।

প্রশ্ন

রাশিয়ার দর্শক সিনেমাটিকে কীভাবে নিলেন?

আসিফ ইসলাম: এক দেশের কালচার অন্য দেশের দর্শকদের বোঝানো কঠিন। এ কারণে চিন্তিত ছিলাম, রুশ দর্শক আমাদের যাত্রার গল্পকে কীভাবে নেন। পরে দেখলাম, তাঁরা সিনেমাটি উপভোগ করছেন। এমনকি রুশ অনেক দর্শক যাত্রার নাচের দৃশ্য দেখে শিস দিচ্ছিলেন। অন্য একটি দেশের ভাষা, সাবটাইটেল দিয়ে দেখে দর্শক এতটা উপভোগ করবেন, এটা অবাক করার মতো।

সিনেমার যাত্রার একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন

দর্শকদের সঙ্গে কথা হয়েছিল?

আসিফ ইসলাম: অনেক দর্শকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা আগ্রহসহকারে বাংলাদেশের যাত্রা নিয়ে জানতে চেয়েছেন। এর মধ্যে একজন রুশ দর্শক পেয়েছিলাম, যিনি বাংলা বোঝেন। তিনি বাংলা ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করছেন। তিনি আগে থেকেই যাত্রা সম্পর্কে জানতেন। সিনেমার অনেক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে সমালোচনা করলেন। এটা বেশ দারুণ লেগেছিল।

প্রশ্ন

বাংলাদেশের দর্শকদের মন্তব্য কী?

আসিফ ইসলাম: দর্শকদের একটাই কথা, বাংলা সিনেমা দেখতে চান; কিন্তু রাশিয়ায় সরাসরি এভাবে বাংলা সিনেমা দেখার সুযোগ কম। আমার প্রথম সিনেমা নির্বাণ–এর সময়ে এত দেশি দর্শক পাইনি। এবার অনেক পেয়েছি। অনেকে দ্বিতীয়বারও দল ধরে সিনেমা দেখেছেন। তাঁদের মন্তব্য, যাত্রার গল্পটি ভালো লেগেছে।

লাল গালিচায় আসিফ ইসলাম। ছবি: পরিচালকের সৌজন্যে
প্রশ্ন

বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে আয়োজকদের ধারণা কী?

আসিফ ইসলাম: আমাদের সিনেমা যে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে, সেটা তাঁরা জানেন। যে কারণে তাঁরা কথার শুরুতেই বলছিলেন, বাংলাদেশের সিনেমার নিউ ওয়েব শুরু হয়েছে। এই নতুন জোয়ার নিয়ে তাঁরা আশাবাদী। তাঁদের প্রত্যাশা, দেশ থেকে আরও বেশি সিনেমা মস্কোয় যাক। কারণ, আমাদের গল্পগুলো একদমই আলাদা, পটভূমি ভিন্ন। এটা তাঁরা পছন্দ করেন।

প্রশ্ন

আপনার প্রথম সিনেমা ছিল সাদা–কালো ও নির্বাক; এবার সবাক ও রঙিন।

আসিফ ইসলাম: গল্পের প্রয়োজনে এটা হয়েছে। আমার প্রথম সিনেমার গল্পে ডিমান্ড করেছিল নির্বাক ও সাদা–কালো। এবারের গল্প, পটভূমি একদমই আলাদা। আমি নিজে পরিচালক, ক্যামেরাম্যান। যে কারণে আমাকে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমি একেকটা সিনেমা একেকভাবে ডিল করতে চাই। সিনেমা–স্টাইল–জনরা—সবকিছু ঠিক করে দেয় গল্প।

প্রশ্ন

আগের বার জুরি পুরস্কার পেয়েছিলেন...

আসিফ ইসলাম: প্রথমবার ভেবেছিলাম, কোনো পুরস্কার পাব না। সেবার পেলাম। এবার সিনেমাটি নিয়ে জুরিদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা হয়েছে। তাঁরা ভীষণ পছন্দ করেছেন কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস। সিনেমার ডিটেইলস পর্যন্ত জানেন। এগুলো নিয়ে দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। অনেক প্রশংসা পেয়েছিলাম। ধরেই নিয়েছিলাম, এবার নেটপ্যাক পুরস্কার পাব; কিন্তু পাইনি। উৎসবে সিনেমার পুরস্কার নিয়ে আগে থেকেই কোনো ধারণা করা কঠিন।

‘কিং ইন দ্য ল্যান্ড অব দ্য প্রিন্সেস’–এর পোস্টার। নির্মাতার ফেসবুক থেকে
প্রশ্ন

প্রথম সিনেমা কবে মুক্তি দিতে চান?

আসিফ ইসলাম: আপাতত নির্বাণ রিলিজ করতে চাই না। সিনেমায় বাণিজ্যিক উপাদান নেই। এটা নিরীক্ষাধর্মী। এ ধরনের সিনেমার দর্শক কম। ইচ্ছা আছে দ্বিতীয় সিনেমা আগে রিলিজ করা। প্রিন্সেস সবার আগে যাত্রাশিল্পীদের দেখাতে চাই, যাঁরা সিনেমায় অভিনয় করেছেন। যে কারণে শিগগিরই সিনেমাটির প্রিমিয়ার করব গোপালগঞ্জের গোবিন্দপুর গ্রামে।

প্রশ্ন

মস্কোতে বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা হলো?

আসিফ ইসলাম: আমরা বাঙালিরা আসলে খুবই আন্তরিক, অতিথিপরায়ণ। রাশিয়ায় গিয়ে আমার ভীষণ জ্বর। এ কথা শুনে রাশিয়ায় থাকা বাঙালি দর্শক গরুর মাংস আর করলা ভাজি নিয়ে এসেছিলেন। অনেকেই খবর নিতে এসেছিলেন; সঙ্গে এনেছিলেন নানা খাবার। এগুলো বেশ মুগ্ধ করেছে।