সোহেল মন্ডল
সোহেল মন্ডল

মহীন চরিত্রটি রহস্যময়

বনলতা সেন–এ জীবনানন্দ দাশের ‘মহীন’কে জীবন্ত করে তুলেছেন সোহেল মন্ডল। এই সিনেমা ও নানা প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন নাজমুল হক

প্রশ্ন

‘মহীন’ হয়ে ওঠার জার্নিটা কবে থেকে শুরু হয়েছিল?

সোহেল মন্ডল: ২০২২ সালের অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ অডিশন পর্ব শেষে প্রায় তিন মাস টানা মহড়া করি। ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে শুটিং শুরু হয়; বছরজুড়েই আমরা তিনটি আলাদা লটে শুটিং করি। আসলে সরকারি অনুদানের সিনেমা হওয়ায় এবং বিশেষ প্রস্তুতির প্রয়োজনে শুটিং শেষ করতে আমাদের পুরো বছর লেগেছিল। সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৩২ দিন শুটিং হয়েছে।

প্রশ্ন

দর্শক হিসেবে অনেকের মনেই প্রশ্ন—মহীন আসলে কে? সে কি শুধুই জীবনানন্দের একজন ভক্ত?

সোহেল মন্ডল: মহীনকে শুধু জীবনানন্দের ভক্ত বললে ভুল হবে। মহীন আসলে জীবনানন্দ দাশের মগজের কোনো অংশ অথবা তাঁর দ্বিতীয় সত্তা। আমাদের প্রত্যেকের মনের ভেতরেই যে অন্বেষণ চলে, মহীন হয়তো সেই অন্বেষণেরই একটা অবয়ব। কখনো মহীন জীবনানন্দ হয়ে যান, আবার কখনো জীবনানন্দ মহীন হয়ে যান। কবি যেমন বাস্তব আর পরাবাস্তবতার মাঝখানে বাস করতেন, মহীন চরিত্রটিও তেমনি ধোঁয়াশাপূর্ণ আর রহস্যময়।

সোহেল মন্ডল
প্রশ্ন

এমন একটি চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তুতি কীভাবে নিলেন?

সোহেল মন্ডল: মহীন চরিত্রটির তো বাস্তবে কোনো নির্দিষ্ট অবয়ব নেই, যা দেখে প্রস্তুতি নিতে পারতাম। তাই আমাকে পরিচালকের দর্শন আর কল্পনার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কবিতার খুব বড় ভক্ত না হলেও মহীনকে খুঁজে পাওয়ার জন্য প্রচুর জীবনানন্দ পড়তে হয়েছে। চিত্রনাট্য বারবার পড়েছি, জীবনানন্দের দর্শনের ফিলোসফিক্যাল জার্নিটা মাথার মধ্যে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। মহীন কীভাবে হাঁটবে বা কথা বলবে, তা খোঁজার জন্য রিসার্চটা অনেকটাই পরিচালক-নির্ভর ছিল। জীবনানন্দের কবিতার যে পরাবাস্তবতা, তা বুঝতে পরিচালক আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। ব্যক্তি সোহেল হিসেবে অনেক সময় মহীনের কিছু আচরণের সঙ্গে আমার মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হতো, কারণ অনেক কিছুই স্বাভাবিক মানুষের মতো মেলে না। তবে সেই দর্শনগত জার্নিটাকে বিশ্বাস করার মাধ্যমেই আমি সেই দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।
শুটিংয়ের পর কি ব্যক্তিজীবনে মহীনের কোনো প্রভাব ছিল?
মহীনের বোহেমিয়ান বা খ্যাপাটে স্বভাবের সঙ্গে আমার ব্যক্তিজীবনের কিছুটা মিল আছে। আমি নিজেও একটু উড়নচণ্ডী স্বভাব, তাই সেই প্রভাবটা হয়তো রয়ে গেছে। তবে এমনিতে চরিত্রের আবেশ আমার মধ্যে খুব বেশি দিন স্থায়ী হয় না।

প্রশ্ন

শুটিংয়ের পর কি ব্যক্তিজীবনে মহীনের কোনো প্রভাব ছিল?

সোহেল মন্ডল: মহীনের বোহেমিয়ান বা খ্যাপাটে স্বভাবের সঙ্গে আমার ব্যক্তিজীবনের কিছুটা মিল আছে। আমি নিজেও একটু উড়নচণ্ডী স্বভাব, তাই সেই প্রভাবটা হয়তো রয়ে গেছে। তবে এমনিতে চরিত্রের আবেশ আমার মধ্যে খুব বেশি দিন স্থায়ী হয় না।

প্রশ্ন

অনেকে মহীন চরিত্রটিকে আপনার সেরা কাজ বলছে‍ন...

সোহেল মন্ডল: শ্যামাকাব্যতেও এমন একটি জটিল চরিত্রে আমি অভিনয় করেছি। তবে বনলতা সেন আলাদা, কারণ এটি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে সিনেমার ক্ষেত্রে প্রথম বড় কাজ এবং উজ্জ্বল ভাই খুব নির্দিষ্ট ঘরানার সিনেমা বানান। মহীন চরিত্রটি ধারণ করতে অনেক দৈহিক ও মানসিক পরিশ্রম হয়েছে। এটি অবশ্যই আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হয়ে থাকবে এবং এর আবেশ অনেক দিন রয়ে যাবে।

সোহেল মন্ডল
প্রশ্ন

জীবনানন্দ দাশের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে কি নিজের কোনো মিল খুঁজে পেয়েছেন?

সোহেল মন্ডল: হ্যাঁ, আমার বা সমসাময়িক শিল্পীদের এর সঙ্গে অনেক মিল আছে। জীবনানন্দ তাঁর সময়ে ব্যক্তিগত জীবনে এবং সমাজে শিল্পী বা কবি হিসেবে যে ধরনের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেছেন, বর্তমান সময়ের শিল্পীরাও সৃজনশীল কাজ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক কাঠামোতে প্রায় একই ধরনের বাধার সম্মুখীন হন। আমাদের পেশা হয়তো আলাদা, কিন্তু সৃজনশীল মানুষদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বা সামর্থ্যের অভাবটা এখনো অনেকটা আগের মতোই রয়ে গেছে।