একজন বক্সার। জীবনের শেষ সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এক সাধারণ মানুষ। সামনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন; জেতার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তবু তিনি লড়তে চান। কারণ, তাঁর কাছে জয় মানে শুধু প্রতিপক্ষকে হারানো নয়, নিজেকেও প্রমাণ করা।
১৯৭৬ সালে পর্দায় এসেছিল ‘রকি’। সেই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র রকি বালবোয়া যেন তখনকার অখ্যাত, সংগ্রামী অভিনেতা-লেখক সিলভেস্টার স্ট্যালোনেরই আরেক রূপ। ৫০ বছর পর সেই ছবির নায়ক স্ট্যালোনের বয়স ৮০। পেছনে তাকালে দেখা যায়, রকি শুধু তাঁর ক্যারিয়ার বদলে দেয়নি, বরং তাঁর নিজের জীবনকে বুঝে নেওয়ার একধরনের আয়নাও হয়ে উঠেছে।
শৈশবের প্রত্যাখ্যান থেকে দারিদ্র্য, অডিশনের পর অডিশন, নিজের লেখা গল্প বিক্রি না করে নিজেই নায়ক হওয়ার জেদ, ‘রকি’র অস্কারজয়, ‘র্যাম্বো’র জনপ্রিয়তা, শরীরের ওপর চরম পরীক্ষা, পারিবারিক সংকট, সন্তানের মৃত্যু, আবার উঠে দাঁড়ানো—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন নিজেই যেন একটি দীর্ঘ স্পোর্টস ড্রামা।
‘রকি’র ৫০ বছর পূর্তি আর স্ট্যালোনের ৮০তম জন্মবর্ষে প্রকাশিত স্মৃতিকথা ‘দ্য স্টেপস’ সেই আয়নাটাকেই আরও কাছে টেনে এনেছে। বইটি লিখতে গিয়ে তিনি ফিরে গেছেন দারিদ্র্য, প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক ক্ষত, সন্তানের মৃত্যু, তারকা হওয়ার চাপ, শরীরের ওপর নির্যাতন—সবকিছুর কাছে। আর বারবার ফিরে এসেছেন সেই একটি চরিত্রের কাছে, যে তাঁকে পৃথিবীর কাছে পরিচিত করেছিল।
স্ট্যালোনের ভাষায়, ‘রকি’ তাঁর জীবনের এক ‘সুনামির মতো সৌভাগ্য’ এনে দিয়েছে। তিনি বলেন, এত বছর পরও তরুণেরা যখন ছবিটি দেখেন, তাঁরা ৮০ বছরের স্ট্যালোনকে নন, রকি বালবোয়ার সঙ্গে নিজেদের মিল খোঁজেন। তাঁর মতে, চরিত্রটি এমন কিছু স্পর্শ করেছিল, যার পুরো কৃতিত্ব তিনি নিজে নিতে পারেন না।
২৯ বছরের সেই মরিয়া মানুষটি
আজকের স্ট্যালোনকে দেখলে ১৯৭০-এর দশকের সেই মানুষের কথা কল্পনা করা কঠিন। তখন তিনি হলিউডের তারকা নন, প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা তো বটেই না। নিউইয়র্কে কাজের আশায় ঘুরছেন, অডিশন দিচ্ছেন, স্ক্রিপ্ট লিখছেন। কখনো ডেলিতে, কখনো সিনেমা হলে কাজ করেছেন। টাকার অভাবে জানালার ধারে কটেজ চিজ রেখে খেতেন; কারণ, তাঁর ফ্রিজ কেনার সামর্থ্য ছিল না। এমনকি একসময় প্রিয় কুকুর বাটকাসকেও বিক্রি করে দিতে হয়েছিল।
‘দ্য স্টেপস’-এ স্ট্যালোন লিখেছেন, সুযোগ না থাকলেও তিনি ‘প্ল্যান বি’ ভাবেননি। কারণ, তাঁর সামনে অন্য কোনো পথ ছিল না।
তখন বয়স মাত্র ২৯। ক্যারিয়ার প্রায় থমকে গেছে। এমন সময় একটি বক্সিং ম্যাচ তাঁর ভেতরে গল্পের বীজ বুনে দেয়। ১৯৭৫ সালে মোহাম্মদ আলী ও চাক ওয়েপনারের লড়াই তাঁকে নাড়া দিয়েছিল। তবে নিজের স্মৃতিকথায় স্ট্যালোন রকির চরিত্রের অনুপ্রেরণা হিসেবে রকি মার্সিয়ানোসহ নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন।
স্ট্যালোন লিখলেন এক সাধারণ বক্সারের গল্প—যাঁর বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াই করার সুযোগটুকু পান।
চিত্রনাট্য লেখা শেষ হওয়ার পর হলিউড সেটি পছন্দ করল। কিন্তু একটি শর্তে স্ট্যালোনকে ছবিতে অভিনয় করতে দেওয়া হবে না।
তখনকার হিসাবে তাঁর জন্য প্রস্তাবিত অর্থ ছিল বিপুল। কিন্তু তিনি রাজি হননি। কারণ, তাঁর বিশ্বাস ছিল, রকি বালবোয়া শুধু তাঁর লেখা চরিত্র নয়; চরিত্রটির ভেতরে তাঁর নিজের জীবনও আছে। শেষ পর্যন্ত নিজের শর্তে তিনি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দেয় সবকিছু।
রকি জিতেছিল, কিন্তু স্ট্যালোনের জয় ছিল অন্য জায়গায়
১৯৭৬ সালে মুক্তির পর ‘রকি’ হয়ে ওঠে বছরের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাগুলোর একটি। অস্কারে ১০টি মনোনয়ন পায়; সেরা ছবি, সেরা পরিচালক ও সেরা সম্পাদনা—তিনটি পুরস্কার জেতে। একই বছর সেরা ছবির দৌড়ে এর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’, ‘অল দ্য প্রেসিডেন্টস মেন’-এর মতো সিনেমা।
স্ট্যালোনের কাছে অবশ্য অস্কারজয়ী গল্পের সবচেয়ে বড় অংশ নয়। বড় ব্যাপার হলো একজন মানুষ, যাঁকে কেউ গুরুত্ব দিতে চাইছিলেন না, নিজের গল্প লিখে সেই গল্পের নায়ক হওয়ার অধিকারটুকু আদায় করে নিয়েছিলেন।
এখানেই রকি আর স্ট্যালোনের গল্প এক হয়ে যায়। রকি ছিলেন এমন একজন, যে জীবনে খুব বেশি কিছু পাননি। স্ট্যালোনও পাননি। রকি নিজের শরীর দিয়ে লড়াই করেছিল। স্ট্যালোন লড়েছিলেন প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে। রকি চেয়েছিল অন্তত শেষ ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে। স্ট্যালোন চেয়েছিলেন অন্তত একবার নিজের মতো করে পর্দায় দাঁড়াতে।
পার্থক্য শুধু এটুকু—রকি ছিল কল্পিত। স্ট্যালোনের লড়াই ছিল বাস্তব। চরিত্রটি পাঁচ দশক পরও যে বেঁচে আছে, সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বড় কারণ।
‘আমি আর আন্ডারডগ নই’
স্ট্যালোন এখন ৮০। ‘রকি, ‘র্যাম্বো’ ও ‘দ্য এক্সপেন্ডেবলস’-এর মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি তাঁকে হলিউডের অন্যতম সফল তারকায় পরিণত করেছে। তাই আজও নিজেকে ‘আন্ডারডগ’ বলা নিয়ে তাঁর আপত্তি আছে।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে মজা করে তিনি বলেছেন, বিলাসবহুল হোটেলের ওপরের তলায় বসে নিজেকে আন্ডারডগ বলা ভণ্ডামি হবে। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি এখন ‘লাকি ডগ’-ভাগ্যবান মানুষ।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এত সাফল্যের পরও তাঁর ভেতরের অনিরাপত্তা পুরোপুরি যায়নি।
‘দ্য স্টেপস’ লিখতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, জীবনের বড় একটা সময় তিনি নিজের কষ্টগুলো চাপা দিয়ে রেখেছিলেন। নিজের অতীত খুঁড়ে দেখার অভিজ্ঞতাকে তিনি তুলনা করেছেন হারিয়ে যাওয়া কোনো শহরের প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের সঙ্গে। তিনি যেন নিজেরই স্মৃতির ‘আধ্যাত্মিক প্রত্নতাত্ত্বিক’ হয়ে উঠেছিলেন।
স্ট্যালোনের উপলব্ধি-‘এই অনিরাপত্তাই হয়তো তাঁকে এত দূর নিয়ে এসেছে।’ আজও সংলাপ মুখস্থ করার জন্য শুটিং শুরুর এক মাস আগে ভোর পাঁচটায় উঠে পড়েন তিনি। এত সাফল্যের পরও কেন? তাঁর ধারণা, এর পেছনেও সেই অনিরাপত্তা কাজ করে।
শৈশবের ক্ষত, যা পরে রকির শক্তি হলো
স্ট্যালোনের শৈশব ছিল কঠিন। জন্মের সময় মুখের একটি স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁর ঠোঁটের একপাশ বেঁকে যায় এবং কথায় তৈরি হয় বিশেষ ধরনের জড়তা। ছোটবেলায় একের পর এক স্কুল বদলেছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সের মধ্যে ১২টি স্কুলে পড়েছেন। কৈশোরে তাঁকে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছিল, যেখানে তিনি ভয়াবহ নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
এই স্মৃতিগুলোই ‘দ্য স্টেপস’ লেখার সময় আবার সামনে আসে। তিনি বলেছেন, মানুষ বেঁচে থাকার জন্য অনেক স্মৃতি চাপা দিয়ে রাখে। পরে সেগুলো যেন ক্ষত হয়ে শুকিয়ে যায়; কিন্তু একসময় ধুলো সরালে বোঝা যায়, ক্ষতটা আসলে সেখানেই ছিল।
সবচেয়ে বেশি কষ্টের জায়গাটি তাঁর মা–বাবাকে ঘিরে। মা জ্যাকি স্ট্যালোন ছিলেন অদ্ভুত ও বহুমুখী চরিত্রের মানুষ-জ্যোতিষী, পামিস্ট, এমনকি নানা ধরনের অভিনব পেশার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ছেলে হিসেবে স্ট্যালোনের মনে হয়েছে, মা তাঁকে প্রয়োজনীয় ভালোবাসা দেননি। তাঁর ভাষায়, কিছু মানুষ হয়তো সন্তান নেওয়ার জন্য তৈরি থাকেন না।
২০২০ সালে ৯৮ বছর বয়সে জ্যাকি মারা যান। খবরটি পাওয়ার সময় স্ট্যালোন গলফ খেলছিলেন। তিনি মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও যাননি।
ঘটনাটি যতটা চমকপ্রদ, তার পেছনের সম্পর্কটি ছিল ততটাই জটিল। তবু স্ট্যালোন মনে করেন, তাঁর জীবনের এই অভাবগুলোই হয়তো সৃষ্টিশীল হওয়ার তাগিদ বাড়িয়েছে। তাঁর উপলব্ধি—যাদের জীবনে অনেক অমীমাংসিত ক্ষত থাকে, তাঁদের কেউ কেউ সেই কষ্টকে সৃষ্টির শক্তিতে পরিণত করেন।
ছেলের মৃত্যু, জমে থাকা শোক
স্ট্যালোনের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত আঘাতগুলোর একটি আসে ২০১২ সালে। তাঁর বড় ছেলে সেজ স্ট্যালোন মাত্র ৩৬ বছর বয়সে হৃদ্রোগে মারা যান।
খবরটি পাওয়ার মুহূর্তটিও তাঁর মনে গেঁথে আছে। তিনি তখন নিজের অফিসে চিত্রনাট্য লিখছিলেন। ফোনে তাঁকে জানানো হয়, সেজ আর নেই।
বাবা-ছেলের সম্পর্কও সব সময় সহজ ছিল না। ১৯৯০ সালের ‘রকি ৫’-এ সেজ তাঁর বাবার ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। সিনেমার একটি দৃশ্যে বাবার বিরুদ্ধে জমে থাকা অভিযোগ উচ্চারণ করতে হয়েছিল তাঁকে। পরে সেজ জানিয়েছিলেন, সেই দৃশ্যের সংলাপের অনেকটাই তাঁর নিজের বাস্তব অনুভূতির সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। অভিনয়ের সময় বাবা-ছেলের দুজনেরই কান্না এসেছিল। সেই কাজের পর তাঁদের সম্পর্ক বদলে যায়।
কিন্তু ২০১২-এর মৃত্যু সেই সম্পর্ককে আবার শোকের জায়গায় নিয়ে যায়। স্ট্যালোন এখন বলেন, বহু বছরের চাপা কষ্ট একসময় বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে আসে। এই জমে থাকা শোক তাঁর দাম্পত্য জীবনেও বড় সংকট তৈরি করেছিল।
২০২২ সালে স্ত্রী জেনিফার ফ্ল্যাভিন বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পর তাঁরা আবার একসঙ্গে হন। স্ট্যালোনের কাছে সেটি ছিল বড় সৌভাগ্য। ‘দ্য স্টেপস’ তিনি উৎসর্গ করেছেন ফ্ল্যাভিনকে।
পাঁচ দশকে রকি একটি চলচ্চিত্র থেকে অনেক বড় কিছু হয়ে উঠেছে। ফিলাডেলফিয়ার মিউজিয়াম অব আর্টের ৭২টি সিঁড়ি আজ রকির সঙ্গে এতটাই যুক্ত যে সেগুলো হয়ে উঠেছে এক ধরনের তীর্থস্থান। প্রতিবছর অসংখ্য দর্শক সেখানে গিয়ে রকির মতো হাত তুলে ছবি তোলেন, সিঁড়ি বেয়ে ওঠেন। রকির ব্রোঞ্জের মূর্তিও শহরের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালে ছবির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ফিলাডেলফিয়ায় আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ ‘রকি সিজন’। শহরজুড়ে সিনেমাটির সঙ্গে সম্পর্কিত নানা আয়োজন, প্রদর্শনী ও স্মরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করা হচ্ছে এই চরিত্রকে। এমনকি ‘রকি’ নিয়ে শিল্প, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়েও প্রদর্শনী হয়েছে ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অব আর্টে। ‘রাইজিং আপ: রকি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব মনুমেন্টস’ প্রদর্শনীতে রকির মূর্তি, বক্সিং, শহরের ইতিহাস এবং ‘আন্ডারডগ’ ধারণার সাংস্কৃতিক অর্থকে একসঙ্গে দেখা হয়েছে।
খ্যাতিরও দাম আছে
স্ট্যালোন তারকা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের শরীরের ওপরও তিনি ভয়াবহ চাপ দিয়েছেন। ‘রকি থ্রি’-তে চরিত্রটিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি পেশিবহুল, আত্মমগ্ন ও অহংকারী হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন তিনি। সেই শারীরিক রূপান্তরের জন্য শরীরের চর্বির হার নামিয়ে এনেছিলেন মাত্র ২ দশমিক ৬ শতাংশে। প্রচণ্ড কঠোর খাদ্যাভ্যাস, বিপুল পরিমাণ কফি এবং স্টেরয়েড ব্যবহারের কথাও তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন।
তাঁর যুক্তি ছিল, রকি তত দিনে দর্শকের কাছে পরিচিত। তাই চরিত্রটির নতুন দিক দেখাতে তাঁকে পুরোপুরি বদলে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে সেই অতিরিক্ত শরীর যেন চরিত্রটির পোশাকেরই আরেক অংশ।
তবে এই পথের মূল্যও দিতে হয়েছে। স্ট্যালোনের শরীরে একাধিক অস্ত্রোপচার হয়েছে। দীর্ঘদিনের কঠোর শরীরচর্চা ও অ্যাকশন অভিনয়ের প্রভাব তাঁর শরীরে পড়েছে।
একপর্যায়ে হৃদ্যন্ত্রের ভাল্ভ প্রতিস্থাপন করতে হয়। স্ত্রী জেনিফারই তাঁকে পরীক্ষা করানোর জন্য জোর করেছিলেন। স্ট্যালোন মনে করেন, সেই সিদ্ধান্ত তাঁর জীবন বাঁচিয়েছিল।
৮০ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তাই তাঁর উপলব্ধি—তারকা হওয়ার ঝলকানির আড়ালে শরীরের ওপর সেই চাপেরও একটি মূল্য আছে।
বিশ্বাস ফিরে এসেছিল এক রাতে
‘দ্য স্টেপস’ লিখতে গিয়ে স্ট্যালোন নিজের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ফিরে গেছেন।
২৯ বছর বয়সে যখন সবকিছু ব্যর্থ হচ্ছিল, তিনি এক রাতে গভীর আধ্যাত্মিক সংকটের মধ্যে পড়েছিলেন। নিজের ভাষায়, তিনি মাটিতে হাত দিয়ে আধ্যাত্মিক সাহায্য চেয়েছিলেন। দীর্ঘদিন নিজেকে অজ্ঞেয়বাদী ভাবলেও সেই রাতে তাঁর বিশ্বাস যেন ফিরে আসে।
এই অভিজ্ঞতার ছাপ পরে ঢুকে পড়ে ‘রকি’তে। ছবির শুরুতেই যে বক্সিং জিমের নাম-‘দ্য রেজারেকশন’—তার মধ্যেও স্ট্যালোন নিজের সেই আধ্যাত্মিক জাগরণের প্রতি একধরনের শ্রদ্ধা রেখেছিলেন।
তাঁর কাছে লড়াই শুধু শরীরের নয়। বিশ্বাসও লড়াইয়ের অংশ।
রকি শুধু সিনেমা নয়, একটি সংস্কৃতি
পাঁচ দশকে রকি একটি চলচ্চিত্র থেকে অনেক বড় কিছু হয়ে উঠেছে। ফিলাডেলফিয়ার মিউজিয়াম অব আর্টের ৭২টি সিঁড়ি আজ রকির সঙ্গে এতটাই যুক্ত যে সেগুলো হয়ে উঠেছে এক ধরনের তীর্থস্থান। প্রতিবছর অসংখ্য দর্শক সেখানে গিয়ে রকির মতো হাত তুলে ছবি তোলেন, সিঁড়ি বেয়ে ওঠেন। রকির ব্রোঞ্জের মূর্তিও শহরের অন্যতম পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে।
২০২৬ সালে ছবির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ফিলাডেলফিয়ায় আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ ‘রকি সিজন’। শহরজুড়ে সিনেমাটির সঙ্গে সম্পর্কিত নানা আয়োজন, প্রদর্শনী ও স্মরণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করা হচ্ছে এই চরিত্রকে।
এমনকি ‘রকি’ নিয়ে শিল্প, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়েও প্রদর্শনী হয়েছে ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অব আর্টে। ‘রাইজিং আপ: রকি অ্যান্ড দ্য মেকিং অব মনুমেন্টস’ প্রদর্শনীতে রকির মূর্তি, বক্সিং, শহরের ইতিহাস এবং ‘আন্ডারডগ’ ধারণার সাংস্কৃতিক অর্থকে একসঙ্গে দেখা হয়েছে।
রকির পর বদলে গেল খেলাধুলার সিনেমা
রকির সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি দেখা যায় স্পোর্টস সিনেমায়। এর আগে বক্সিং বা খেলাধুলার গল্প ছিল। কিন্তু রকি দেখাল, ম্যাচটি আসলে গল্পের শেষ নয়। একজন খেলোয়াড়ের ভেতরের ভয়, সম্পর্ক, আত্মসম্মান, ব্যর্থতা, প্রেম এবং নিজের সীমাকে অতিক্রম করার ইচ্ছাই হতে পারে সিনেমার মূল বিষয়।
এই কাঠামো পরে অসংখ্য ‘আন্ডারডগ’ গল্পে ফিরে এসেছে। প্রশিক্ষণের দৃশ্য, সংগীতের সঙ্গে শরীর গড়ে তোলা, নায়ককে একা দৌড়াতে দেখা, বারবার ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানো—এসব দৃশ্য শুধু রকির পরিচিত ভাষা হয়ে থাকেনি; স্পোর্টস সিনেমার একটি বহুল ব্যবহৃত চলচ্চিত্রভাষায় পরিণত হয়েছে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, রকি জিতবে কি না—তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে সে শেষ পর্যন্ত কতটা লড়ল।
এই কারণেই রকির প্রভাব শুধু সিনেমায় আটকে থাকেনি। বাস্তব বক্সারদের মধ্যেও চরিত্রটি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আজও ক্রীড়াবিদেরা রকির মতো প্রশিক্ষণ, দৌড় ও আত্মবিশ্বাসের দৃশ্যকে নিজেদের অনুশীলনের প্রতীকে ব্যবহার করেন।
‘ক্রিড’ প্রজন্মকে আবার রকির কাছে ফিরিয়েছে
স্ট্যালোন নিজেও জানতেন, একটি চরিত্রকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় হয়তো নতুন প্রজন্মকে তার গল্পের অংশ করে নেওয়া। সেই জায়গা থেকেই এসেছে ‘ক্রিড’।
মাইকেল বি জর্ডানের অ্যাডোনিস ‘ক্রিড’-এর গল্পে ‘রকি’ আবার ফিরে আসেন। এবার তিনি তরুণ বক্সার নন; প্রশিক্ষক। কিন্তু তাঁর পুরোনো দর্শন—নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার লড়াই—আবার নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
মূল ‘রকি’ থেকে ‘ক্রিড’ পর্যন্ত ফ্র্যাঞ্চাইজির বিস্তার দেখিয়েছে, একটি চরিত্র কীভাবে
সময় বদলালেও তার মূল আবেগ ধরে রাখতে পারে। ফিলাডেলফিয়ায় ‘রকি’ ও ‘ক্রিড’-এর সিনেমাগুলোর শুটিং লোকেশন ঘিরে আজও দর্শকদের আগ্রহ রয়েছে।
৫০ বছর পর আবার নিজের গল্পের নায়ক
স্ট্যালোনের নিজের জীবনের গল্প নিয়েও এবার সিনেমা হয়েছে—‘আই প্লে রকি’। পিটার ফ্যারেলির পরিচালনায় ছবিটি ২০২৬ সালের টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে। তরুণ স্ট্যালোনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন অ্যান্থনি ইপ্পোলিটো। ছবির গল্প মূলত কীভাবে এক অখ্যাত অভিনেতা নিজের লেখা চিত্রনাট্য নিয়ে হলিউডের দরজায় দরজায় ঘুরে শেষ পর্যন্ত রকি বানানোর সুযোগ আদায় করেছিলেন, সেটি নিয়ে।
স্ট্যালোন অবশ্য প্রথমে বিষয়টি নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে ছিলেন না। তাঁর প্রশ্ন ছিল—‘আমি তো এখনো মারা যাইনি, এত তাড়াতাড়ি আমার জীবনী কেন?’
কিন্তু অ্যান্থনি ইপ্পোলিটোর একটি ভিডিও দেখার পর তাঁর মন বদলে যায়। তরুণ অভিনেতাকে দেখে প্রথম মুহূর্তে তাঁর নিজেরই মনে হয়েছিল, ‘এটা তো আমি।’
ইপ্পোলিটো শুধু স্ট্যালোনের কণ্ঠস্বর বা শরীরী ভাষা অনুকরণ করেননি; তাঁর তরুণ বয়সের অনিশ্চয়তা, জেদ ও আত্মবিশ্বাসও ধরার চেষ্টা করেছেন। টরন্টোর প্রদর্শনীতে ছবিটি দর্শকদের কাছ থেকে উষ্ণ প্রতিক্রিয়া পেয়েছে, যদিও সমালোচকেরা ছবিটির অতিরিক্ত নস্টালজিয়া ও পরিচিত গল্পের ওপর নির্ভরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
‘রকি ৫’ নিয়ে এখনো আক্ষেপ
স্ট্যালোনের নিজের কাছেও সবকিছু নিখুঁত নয়। বিশেষ করে ‘রকি ৫’ নিয়ে তাঁর আক্ষেপ রয়ে গেছে। ১৯৯০ সালের ছবিটিকে তিনি নিজের ক্যারিয়ারের একটি অসম্পূর্ণ অধ্যায় মনে করেন। তাঁর ইচ্ছা, সুযোগ পেলে ছবিটি নতুন করে সম্পাদনা করবেন।
স্ট্যালোনের নিজের ভাষায়, সিনেমাটি তাঁর পাশে লেগে থাকা ‘কাঁটা’। তাঁর মনে হয়, তখন তিনি নিজেই ছবিটি পরিচালনা করলে এবং দর্শককে খুশি করার চেষ্টা কম করলে ফল অন্য রকম হতে পারত।
‘আজ শুরু করলে পারতাম না’
৮০ বছর বয়সে স্ট্যালোনকে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেটি হলো আজ যদি আবার শূন্য থেকে শুরু করতেন, একইভাবে কি হলিউডে জায়গা করে নিতে পারতেন?
তাঁর উত্তর আশাবাদী নয়। তিনি মনে করেন, সময় বদলে গেছে। চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, তারকার চেহারা বদলেছে, অ্যাকশন সিনেমার ধরন বদলেছে। তাঁর সময়ের মতো সুযোগ হয়তো এখন আর নেই।
‘দ্য গডফাদার’ আজ নতুন করে বানাতে গেলে একইভাবে অভিনেতা বাছাই করা সম্ভব হবে কি না—এই প্রশ্নও তিনি তুলেছেন। তাঁর যুক্তি, প্রতিটি ক্ল্যাসিক সিনেমা তাঁর সময়ের সামাজিক পরিবেশ, চেহারা, সংস্কৃতি ও মানসিকতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সময় বদলে গেলে সেই সিনেমার পুনর্নির্মাণও আর আগের মতো থাকে না।
‘আমি কিছু প্রমাণ করতে চাই না’
৮০ বছর বয়সে এসে স্ট্যালোন এখনো অভিনয় করছেন। ‘টালসা কিং’-এ কাজ করছেন, নতুন সিনেমা নিয়ে ভাবছেন। কিন্তু তাঁর কথায় এখন সময়ের মূল্য সবচেয়ে বেশি।
সারা জীবন মানুষকে ভুল প্রমাণ করতে করতে কাটিয়েছেন। কিন্তু এখন তাঁর আর কাউকে কিছু প্রমাণ করার নেই।
স্ট্যালোন বলেছেন, তাঁর ঝুলিতে আর কোনো কৌশল নেই। দর্শক তাঁর সব কৌশল দেখে ফেলেছে।
শৈশবের প্রত্যাখ্যান থেকে দারিদ্র্য, অডিশনের পর অডিশন, নিজের লেখা গল্প বিক্রি না করে নিজেই নায়ক হওয়ার জেদ, ‘রকি’র অস্কারজয়, ‘র্যাম্বো’র জনপ্রিয়তা, শরীরের ওপর চরম পরীক্ষা, পারিবারিক সংকট, সন্তানের মৃত্যু, আবার উঠে দাঁড়ানো—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন নিজেই যেন একটি দীর্ঘ স্পোর্টস ড্রামা।
তাই পাঁচ দশক পরও যখন কোনো তরুণ রকির মতো হাত তুলে ফিলাডেলফিয়ার সিঁড়ির চূড়ায় দাঁড়ায়, সেটি শুধু একটি সিনেমার দৃশ্য পুনরাভিনয় নয়। সেটি আসলে সেই পুরোনো বিশ্বাসটির পুনরাবৃত্তি—হয়তো তুমি জিতবে না। কিন্তু তুমি কত দূর যেতে পারো, সেটা কেউ তোমার হয়ে ঠিক করে দিতে পারে না।
এ কারণেই ৫০ বছর পরও ‘রকি’র গল্প শেষ হয়নি, হয়তো হবেও না।
এপি, দ্য হলিউড রিপোর্টার ও ভ্যারাইটি অবলম্বনে