অর্থকষ্টে বাসা থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কায় ছিলেন, তিনি ৪৩০ কোটি টাকার মালিক

কৈশরের ছবিতে নাওমি ওয়াটস
ছবি: ইনস্টাগ্রাম

হলিউডে সাফল্য তাঁর জন্য সহজে আসেনি। একের পর এক অডিশন, ব্যর্থতা, অর্থকষ্ট—এমনকি বাড়িভাড়া দিতে না পেরে উচ্ছেদের আশঙ্কার তাঁর দিন কেটেছে। অথচ সেই অভিনেত্রীই পরে ‘মুলহল্যান্ড ড্রাইভ’, ‘দ্য রিং’, ‘২১ গ্রামস’, ‘কিং কং’ ও ‘দ্য ইমপসিবল’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি ব্রিটিশ-অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী নাওমি ওয়াটস। আজ ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর ৫৮তম জন্মদিন।

শৈশবেই জীবনে বড় ধাক্কা
নাওমি ওয়াটসের জন্ম ১৯৬৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডের কেন্টের শোরহ্যামে। তাঁর বাবা পিটার ওয়াটস ছিলেন বিখ্যাত ব্যান্ড পিংক ফ্লয়েডের রোড ম্যানেজার ও সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার। মা–বাবার বিচ্ছেদ হয় যখন নাওমির বয়স মাত্র চার বছর। মাত্র সাত বছর বয়সে বাবাকেও হারান তিনি। নাওমির বাবা ১৯৭৬ সালে মারা যান; তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে হেরোইন ওভারডোজের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরের সময়টা ছিল তাঁর জন্য সংগ্রামের। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বিভিন্ন জায়গায় বেড়ে ওঠার পর ১৪ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান নাওমি। বারবার নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিনয়জীবনেও প্রভাব ফেলেছে বলে তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।

নাওমি ওয়াটস

মডেলিং থেকে অভিনয়ে
কিশোর বয়সে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলেও একসময় জাপানে মডেল হিসেবে কাজের সুযোগ পান। পরে অস্ট্রেলিয়ার একটি ম্যাগাজিনে ফ্যাশন এডিটর হিসেবেও কাজ করেছিলেন। কিন্তু সেই জীবন নাওমি ওয়াটসকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। একটি অভিনয়ের কর্মশালায় অংশ নেওয়ার পর সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। কর্মশালা থেকে ফিরে চাকরি ছেড়ে দেন এবং অভিনয়ের জন্য অডিশন দেওয়া শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে ‘ফর লাভ অ্যালোন’ সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। এরপর অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করতে গিয়ে পরিচয় হয় আরেক উঠতি অভিনেত্রী নিকোল কিডম্যানের সঙ্গে। তাঁদের বন্ধুত্ব পরবর্তী জীবনেও টিকে আছে। পরে চলে আসেন হলিউডে।

হলিউডে এসে এক দশকের লড়াই
ভেবেছিলেন পথটা সহজ হবে। কেন হলিউডে গিয়েছিলেন এ নিয়ে নাওমি ওয়াটস ভ্যারাইটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘একধরনের সরল বিশ্বাসই আমাকে হলিউডে নিয়ে গিয়েছিল।’ কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে তিনি হলিউডে পা রাখেন। কিন্তু সেখানে সাফল্য পেতে তাঁকে প্রায় এক দশক অপেক্ষা করতে হয়। একের পর এক অডিশন দিয়েও কাজ পাচ্ছিলেন না। ‘ট্যাংক গার্ল’-এর মতো সিনেমায় কাজ করলেও ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আসেনি। ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারি তাঁর ওই সময়টিকে  ‘ব্যর্থ অডিশন’ ও ক্যারিয়ারের নানা ব্যর্থতায় ভরা সময় হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে নাওমি ২০২৬ সালের এক মাস্টারক্লাসে আরও খোলামেলা কথা বলেছেন। তিনি বলেন,‘দীর্ঘ সময় হলিউডে কাজ না পাওয়ায় আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছিল। এমনকি ভাড়া বকেয়া থাকায় উচ্ছেদের আশঙ্কাতেও ছিলাম।’ তাঁর এজেন্ট তাঁকে একসময় বলেছিলেন, তিনি নাকি অতিরিক্ত ‘ইনটেন্স’ এবং মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলেন।

‘মুলহল্যান্ড ড্রাইভ’ পোস্টারে নাওমি ওয়াটস

ডেভিড লিঞ্চ বদলে দিলেন সবকিছু
২০০১ সালে আসে সেই সিনেমা, যা নাওমি ওয়াটসের ক্যারিয়ারকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়—‘মুলহল্যান্ড ড্রাইভ’। পরিচালক ডেভিড লিঞ্চ এর এই সিনেমায় তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা পায়। নাওমির নিজের ভাষায়, এই সিনেমার আগে ও পরে তাঁর অভিনয়জীবনকে দুই ভাগে দেখা যায়। জুরিখ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়ে ক্যারিয়ারের ঘটনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘লিঞ্চ আমার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। লিঞ্চ আমার তৈরি করা নানা “অতিরিক্ত” আবরণ সরিয়ে আমার আসল অভিনয়সত্তাকে দেখতে পেরেছিলেন।’

‘দ্য রিং’ থেকে তারকা
‘মুলহল্যান্ড ড্রাইভ’-এর পর ২০০২ সালে আসে হরর সিনেমা ‘দ্য রিং’–এ অভিনয়ের সুযোগ। প্রথমে সিনেমাটি করতে নাওমির কিছুটা দ্বিধা ছিল। কিন্তু সিনেমাটি বড় ব্যবসায়িক সাফল্য পায় এবং তাঁকে মূলধারার হলিউডের পরিচিত মুখে পরিণত করে। এরপর ‘টুয়েন্টিওয়ান গ্রামস’-এ অভিনয়ের জন্য ২০০৪ সালে একাডেমি অ্যাওয়ার্ডে সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন পান। একই চরিত্রের জন্য গোল্ডেন গ্লোব ও বাফটা মনোনয়নও পান। ‘দ্য ইমপসিবল’-এর জন্য ২০১৩ সালে দ্বিতীয়বার অস্কার মনোনয়ন পান।

বেশ আগের ছবিতে নাওমি ওয়াটস

কত টাকার মালিক নাওমি ওয়াটস
নাওমি ওয়াটসের সঠিক সম্পদের পরিমাণ প্রকাশ্যে নিশ্চিত নয়। তবে সেলিব্রিটি নেট ওয়ার্থ তাঁর সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৪৩০ কোটি টাকার সমান। তাঁর সিনেমার পারিশ্রমিকের কিছু তথ্যও আইএমডিবিতে প্রকাশ পেয়েছে। আইএমডিবিতে বলা হয়েছে ‘কিং কং’ সিনেমার জন্য তাঁর পারিশ্রমিক ৫০ লাখ ডলার ছিল।

আবেদনময়ী নাওমি
অভিনয়ের পাশাপাশি ক্যারিয়ারের শুরুর দিক থেকেই নাওমির সৌন্দর্য ও আবেদন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ২০০৪ সালে ম্যাক্সিম -এর ‘হট ১০০’ তালিকায় তিনি ৫৩তম এবং ২০০৬ সালে ৫১তম অবস্থানে ছিলেন। ২০০৫ সালে একটি বিনোদনবিষয়ক তালিকায় তাঁকে বছরের ১০ আবেদনময়ী অভিনেত্রীর মধ্যে অষ্টম রাখা হয়েছিল। সেখানে ‘কিং কং’ ও ‘উই ডোন্ট লিভ হিয়ার এনিমোর’-এর অভিনয় এবং পর্দায় তাঁর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়। তবে নাওমির সৌন্দর্যের চেয়েও তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় গল্প সম্ভবত দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।

নাওমি ওয়াটস