অন্তরঙ্গ দৃশ্য ধারণের আগে ভয় কাটাতে যা করছিলেন রবি

মার্গো রবি
ছবি: এএফপি

হলিউডে এমন কিছু অভিনেত্রী আছেন, যাঁরা শুধু অভিনয়ের মাধ্যমে নয়, চরিত্রের জন্য নিজেকে বদলে ফেলার সাহসের কারণেও আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন। অস্ট্রেলীয় অভিনেত্রী মার্গো রবি তাঁদেরই একজন। ‘দ্য উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট’, ‘আই, টোনিয়া’, ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন হলিউড’, ‘বার্বি’ কিংবা ‘সুইসাইড স্কোয়াড’ প্রতিটি ছবিতেই তিনি প্রমাণ করেছেন, জনপ্রিয়তার চেয়ে চরিত্রই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আজ এই তিনবার অস্কার মনোনীত অভিনেত্রীর জন্মদিন।

১৯৯০ সালের ২ জুলাই অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডের ডালবিতে মার্গো রবির জন্ম। ছোটবেলা কেটেছে গোল্ড কোস্টে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মা-ই চার সন্তানকে বড় করেন। সংসারে অভাব ছিল। তাই কৈশোরেই রেস্তোরাঁয় কাজ করেছেন, বাড়িঘর পরিষ্কার করেছেন, এমনকি সাবওয়ে রেস্তোরাঁয় স্যান্ডউইচও বানিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে একাধিক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘ছোটবেলার সেই সংগ্রামই তাঁকে অর্থের মূল্য শিখিয়েছে। এখান থেকে বুঝেছি, জীবনে পরিশ্রম করলে সফল হওয়া যায়।’

অভিনেত্রী মার্গো রবি

অস্ট্রেলিয়ায় কিছু কাজ করলেও একসময় রবি হলিউডে পা রাখেন। অভিনয়ে তাঁর ক্যারিয়ার শুরু হয় ২০০৮ সালে সিটি হোমিসাইড সিরিজ দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে কিছু কাজের সুযোগ পেলেও তাঁর নিজেরও বিশ্বাস ছিল না যে হলিউডে টিকে থাকতে পারবেন।
কিন্তু একটু একটু করে অভিনয়ে নিজেকে তুলে ধরেন রবি। তিনি ২০১৩ সালে ‘দ্য উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট’-এ লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর বিপরীতে অভিনয় করেন।

খোলামেলা চরিত্রটি তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ছবির অন্তরঙ্গ দৃশ্য ধারণের আগে ভয় কাটাতে তিনি মদ্যপান করেছিলেন—এক সাক্ষাৎকারে নিজেই সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেন। মার্গো বলেন, ‘এই সিনেমা থেকে পাওয়া প্রথম বড় পারিশ্রমিকের একটি অংশ দিয়ে আমি মায়ের বাড়ির বন্ধকী ঋণ পরিশোধ করি। এটি ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি।’

ডিক্যাপ্রিওর সঙ্গে অভিনয় করার পরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘সুইসাইড স্কোয়াড’-এ হার্লে কুইন চরিত্রে অভিনয় করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তা পান। চরিত্রটির জন্য শুটিংয়ের ছয় মাস আগে থেকেই শুরু করেন কঠোর প্রশিক্ষণ। জিমন্যাস্টিকস, বক্সিং, অস্ত্র চালানো, দীর্ঘ সময় পানির নিচে শ্বাস ধরে রাখার অনুশীলন করেছিলেন। ছবির বেশির ভাগ স্টান্টও নিজেই করেছেন। পরিচালক ডেভিড আয়ার পরে মজা করে বলেছিলেন, ‘মার্গো নিজেই এত স্টান্ট করেছেন যে তাঁর স্টান্ট ডাবলকে বেশির ভাগ সময় ট্রেলারে বসেই কাটাতে হয়েছে।’

সিনেমার প্রিমিয়ারে মার্গো রবি। এএফপি

শুধু শারীরিক প্রস্তুতিই নয়, চরিত্রের জন্য কখনো কখনো নতুন দক্ষতাও রপ্ত করেন রবি। ‘ফোকাস’ সিনেমায় পকেটমার চরিত্রের বাস্তবতা আনতে বিশ্বের অন্যতম খ্যাতিমান ‘জেন্টলম্যান থিফ’ অ্যাপোলো রবিনস-এর কাছে প্রশিক্ষণ নেন। এতটাই দক্ষ হয়ে ওঠেন যে শুটিং ইউনিট তাঁকে ধীরে কাজ করতে বলেছিল। কারণ, ক্যামেরা তাঁর হাতের গতি ধরতে পারছিল না।

২০১৭ সালে ‘আই, টোনিয়া’ সিনেমায় কিংবদন্তি ফিগার স্কেটার টোনিয়া হার্ডিং-এর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিন মাস স্কেটিং শিখেছিলেন। যদিও ট্রিপল অ্যাক্সেল জাম্পের মতো কঠিন দৃশ্য কম্পিউটার গ্রাফিকসের সাহায্যে তৈরি করা হয়। সেই ছবির জন্য তিনি প্রথমবারের মতো অস্কারের সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন পান।

২০২৩ সালে ‘বার্বি’ দিয়ে আবারও ইতিহাস গড়েন মার্গো রবি। অভিনেত্রী হওয়ার পাশাপাশি ছবিটির প্রযোজক হিসেবেও তিনি ছিলেন। বিশ্বজুড়ে আলোচিত সিনেমাটি মার্গোকে নতুন অনুভূতি দেয়। বিলিয়ন ডলার আয় করা সিনেমাটি দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রও বাণিজ্যিকভাবে বিশাল সফল হতে পারে। সিনেমাটির জন্য পারিশ্রমিক ও সিনেমার আয়ের বোনাস থেকে পাঁচ কোটি ডলার পান।

‘বার্বি’ ছবিতে মার্গো রবি। আইএমডিবি

ব্যক্তিজীবনে মার্গো রবি বরাবরই ব্যতিক্রমী। প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের মালিক। কোটি ডলার আয়ের পরও শুরুর দিকে দীর্ঘদিন রুমমেটদের সঙ্গে থাকতেন খরচ বাঁচানোর জন্য। তিনি বিশ্বাস করেন, অভাবের অভিজ্ঞতা মানুষকে বিনয়ী থাকতে শেখায়। বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের তিনি এখনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাতে লেখা চিঠি ও পোস্টকার্ড পাঠান। তাঁর মতে, ‘এখন মানুষ এমন চিঠি খুব কমই পায়, যেগুলো কোনো বিল নয়।’

শরীর নিয়ে হলিউডের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন তিনি। ‘দ্য লিজেন্ড অব টারজান’-এ অভিনয়ের সময় ওজন কমানোর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘চিকন হওয়ার চেয়ে সুস্থ থাকাটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
আজ ৩৬ বছরে পা রাখা মার্গো রবি শুধু একজন তারকা নন; তিনি এমন এক অভিনেত্রী, যিনি প্রতিটি চরিত্রের জন্য নিজেকে নতুন করে তৈরি করেন। সংগ্রাম, শৃঙ্খলা, সাহস এবং অভিনয়ের প্রতি নিবেদন—এই চার গুণই তাঁকে সমসাময়িক হলিউডের সবচেয়ে প্রভাবশালী অভিনেত্রীদের একজন করে তুলেছে।
তথ্য: আইএমডিবি, লাইফস্টাইলএশিয়াডটকম

মার্গো রবি