‘মাইকেল’–এ জাফর জ্যাকসন। আইএমডিবি
‘মাইকেল’–এ জাফর জ্যাকসন। আইএমডিবি

সংগীতের পিটার প্যান চিরতরুণ মাইকেলের দ্রোহী আখ্যান

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যের গ্যারি শহরের তুষার পড়া দিনগুলোর কথা। এই শহরের ছোট্ট একটা বাসায় অপেক্ষায় থাকা এক শিশু, পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য। অল্প অল্প বরফ লেগে থাকা জানালার কাচের ভেতর দিয়ে তাকানো ঘন কোঁকড়া চুলের মাইকেলের চোখের কৃষ্ণকালো তারায় ঝিকমিক করছে কৌতূহল, সারল্য আর শিশুতোষ নানা স্বপ্ন। শহরের স্টিল মিলের এক শ্রমিক বাবা, যিনি কিনা পরিবারের জবরদস্ত কর্তা আবার একই সঙ্গে পারিবারিক সংগীত চর্চায় মাইকেল ও তার অন্য ভাই–বোনদেরও কঠোর শিক্ষক। একরাতে ডিনারের টেবিলে বলে ওঠেন একটিই কথা। ‘এ জীবন জয় অথবা শ্রেফ পরাজয়ের! বলো, জীবনে তোমরা লড়তে প্রস্তুত কি না।’ সমস্বরে হ্যাঁ বলে চেঁচিয়ে ওঠে ছোট্ট মাইকেলসহ সবাই। এভাবেই শুরু হয় পপসম্রাট মাইকেল জোসেফ জ্যাকসন বা সর্বনন্দিত এম.জের ওপর করা ২০২৬–এর হলিউডি বায়োপিক ‘মাইকেল’। গত ২৪ এপ্রিল বিশ্বের ৮০টি দেশে মুক্তি পেয়েছে প্রযোজনা সংস্থা লায়নসগেইটের নির্মিত ‘মাইকেল’, যার প্রতীক্ষায় ছিল সারা বিশ্বের শিল্পপিপাসুরা।

বেদনা ও উষ্ণতায় ছোটবেলার গল্প
আফ্রো-আমেরিকান সংগীতে পপ, রিদম অ্যান্ড ব্লুজ, সোউল, ডিসকোর মতো যত ধরন আছে সেগুলোর ইমপ্রোভাইজেশনে ছোট্ট মাইকেলের দক্ষতা ও সম্ভাবনা গভীরভাবে দেখছিলেন বাবা জোসেফ ওয়াল্টার জ্যাকসন। স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন এ ছেলে শুধু দারুণ শিল্পী ও পারফর্মারই নয়, বরং পরিবারের জন্য হতে চলেছে তাদের সবার ভাগ্য পরিবর্তনের আস্ত জ্যাকপট। সকালে স্কুল থাকলেও রাত জেগে জেগে ভাইদের সঙ্গে ব্যান্ড জ্যাকসন ফাইভের স্টেজ পারফরম্যান্সের অনুশীলন করতে হয়েছে বাবার তীব্র উচ্চাকঙ্ক্ষায়, তার দেওয়া নির্দয় প্রতিজ্ঞাবদ্ধতায়। অনুশীলনে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বা ভুল হলে প্রায় রাতে খেতে হচ্ছিল বাবার বেল্টের মার। জ্যাকসন ফাইভের অন্য ভাইয়েরা ভয় পেত বাবাকে। বাড়িতে শুধু একজন ছিল যে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শুধু চোখের জল মুছত এসব দেখে। সে মাইকেলের মা ক্যাথরিন জ্যাকসন। মায়ের নৈতিক সমর্থন, স্বীকৃতি, আর ভালোবাসার উত্তাপ ছিল প্রতিদিন নতুন করে মাইকেলের শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর মূল ভিত্তি। মা-ছেলের একসঙ্গে পপকর্ন আর আইসক্রিম উপভোগের বন্ধুত্বে কখনো অনন্য মাত্রা যুক্ত করত চার্লি চ্যাপলিনের ছবি, কার্টুন মিকি মাউস, আর সিরিজ ‘দ্য থ্রি স্টুজেস’এর মতো বিনোদন। জীবনের বেদনা আর অল্প একটু আনন্দের এ অদ্ভুত মিশ্রণে দিন যাচ্ছিল মাইকেলের। সারা দিন চুপচাপ থেকে লাজুক দৃষ্টি দিয়ে জীবন আর চারপাশকে দেখা কিন্তু মানুষের সামনে স্টেজে উঠলেই এক অলৌকিক শক্তি যেন ভর করত তার ওপর। মাইকেল বেড়ে উঠতে থাকে কঠোর পরিশ্রমে, নিজের আবিষ্কৃত সৃজনীশৈলীর চর্চায়, স্বপ্নবাজ হৃদয়, আর ভেতর জমা হওয়া পরাধীনতার একটা লুকানো ক্ষোভের মেঘ নিয়ে।

মাইকেল বা পিটার প্যানের সঙ্গে ক্যাপটেন হুক বা জোসেফ জ্যাকসনের দ্বান্দ্বিক মনস্তত্ত্ব
মজার ব্যাপার হলো মাইকেল ছবির লেখক জন লোগ্যান আর পরিচালক আতোঁয়ান ফুকুয়া একটা চমৎকার অ্যালিগরি দেখিয়েছেন রূপকথার চিরকিশোর নায়ক পিটার প্যান আর মাইকেলের মধ্যে এক বিশেষ মুনশিয়ানায়। বিংশ শতকের একেবারে শুরুর দিকে স্কটিশ ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার জেএম ব্যারির কল্পনাপ্রসূত নায়ক পিটার প্যান ছিল চির স্বাধীন, দুষ্টুমিতে ভরপুর এক চরিত্র যে কিনা সমাজে উপেক্ষিত শিশুদের দলের প্রধান এক দুর্দান্ত সাহসী সত্তা, যার কৈশোর চিরকালের চিরন্তন। পিটার প্যানের অন্যান্য সঙ্গীরা ছিল টিংকার বেলের মতো পরী, জলদস্যু, মৎস্যকন্যা, আর আদিবাসী আমেরিকানরা। ছবির ধারাবাহিকতায় মাইকেলও তার বাস্তব জীবনে সদস্য হিসেবে যুক্ত করেছে বাবলসের মতো দত্তক নেওয়া শিম্পাঞ্জি, অজগর, ময়ূর বা জিরাফের মতো সঙ্গীদের। কিশোর মাইকেল বারবার চেয়েছে পিটার প্যানের মতো হতে যে তার অস্তিত্বে স্বাধীন, চিরসবুজ ও অজর। যে প্রকৃতির কাছাকাছি; প্রকৃতির অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে যার সম্পর্ক সহজ, মানবিক, অবদমনমুক্ত। সে যেখানেই গেছে সমাজের অসুস্থ, ভুগতে থাকা শিশুদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত অনুভব করেছে একটা গভীর টান, সহমর্মিতা, সমজাতীয়তা।

‘মাইকেল’ সিনেমার পোস্টার। আইএমডিবি

জীবনে যে কারোর মার খাওয়া বাস্তবতা দেখলেই বুঝি মনে হয়েছে তার নিজের কথা। ছবিতে মাইকেলের প্রথম অস্ত্রোপচারটাও তার নাক নিয়েই, যেখানে সে চায় তার স্বপ্নের চরিত্র পিটার প্যানের মতো তারও একটা খাড়া, টিকালো নাক থাকুক। এদিকে রূপকথায় পিটার প্যানের চিরশত্রু ছিল ক্যাপটেন হুক, যে তার কুমিরে খেয়ে যাওয়া হাতটায় লাগিয়ে নিয়েছিল একটা লোহার হুক, যেটা দিয়ে সে সবকিছু আটকে ধরত। এই চরিত্রের সঙ্গেই সম্ভবত তুলনা করা হয়েছে মাইকেলের বাবা জোসেফ জ্যাকসনকে, যার ব্যবসানির্ভর শাসন থেকে পরিত্রাণ পাওয়াই ছিল মাইকেলের সত্যিকারের ‘ব্রেকিং-ফ্রি’ প্রসেস; অথবা রূপকের ভাষায় পিটার প্যানের শত্রু দস্যু হুককে রুখে দেওয়া। সেটা মাইকেলের স্বরাজ, সিদ্ধান্তের স্বায়ত্তশাসনেরই আকাঙ্ক্ষা। কারণ, শেষ পর্যন্ত, প্রকৃত শিল্পীর আত্মা না মানে কোনো বাধা, না মানে জগতের কোনো নিষ্ঠুর নিয়ন্ত্রণ। শিল্পের পটভূমিতে শিল্পী নিজেই তো ঈশ্বর!

নির্মাণ, চরিত্র রূপায়ণ, মাইকেলের সমাজভাবনা ও শৈল্পিক প্রতিরোধ
মাইকেল ছবির নির্মাণযাত্রায় সামলাতে হয়েছে বিবিধ আইনি সমস্যা, বিপুল ব্যয় বিড়ম্বনা, দৃশ্য পুনর্নির্মাণের চাপ, কনসার্টের দৃশ্যগুলোতে ব্যক্তিসমাগমের জটিলতার মতো অজস্র চ্যালেঞ্জ। কিন্তু প্রতিকূলতা থাকলেও কিছু কাজ থাকে, যা করাটাও একটা বোধের দায়িত্বে বর্তায়, যেটি পরিচালক আতোঁয়ান ফুকুয়ার কথায় ‘এক আধ্যাত্মিক যাত্রা এবং এমন এক ব্যক্তিকে ঘিরে, যে নিজেই মহাকাব্য’। এ ছবিতে চরিত্র রূপায়ণে যে সব থেকে অনবদ্য সে মাইকেল জ্যাকসনের চরিত্রে অভিনয় করা তারই নিজের ভাইপো জাফর জ্যাকসন। এম.জের মুখের অভিব্যক্তি, গলার স্বর, হাঁটা, নাচকে একদম অবিকল ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি জাফরের যে বিষয়টি হৃদয় কেড়ে নিয়েছে তা হলো মাইকেলের সুদূরপ্রসারী স্বপ্নালু চোখের ভাষাকে অনুকরণ, যা সত্যি তুলনাহীন।

‘মাইকেল’ সিনেমার দৃশ্য। আইএমডিবি

পরিশ্রম সাফল্যের মূল হলেও কিছু প্রতিভার ছাপ সম্ভবত নিজেও দৌড়ায়, এ কথা বলাই বাহুল্য। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করা কুশলীরাও যার যার মতো করেই সমর্থ ও শক্তিশালী। এত বড় ক্যানভাসে মাইকেল জ্যাকসনের বায়োপিকের মতো মহাযজ্ঞের আয়োজন করাও মোটে সহজ কাজ নয়, সেখানে জীবনের নানা টুকরো গল্পের ধারাবাহিকতার ভেতরকার সম্পর্ক স্থাপন ছিল মোটামুটিভাবে সাবলীলই। সত্তর বা আশির দশকের প্রতিনিধিত্ব করা কিছুটা সোনালি সানবিমড ম্যাট টোনের প্রতীতি দর্শককে নিয়েও গেছে ওই সময়েই। বরং স্টেজ সিনগুলোর আলোক পরিবেশন তুলনামূলকভাবে আধুনিক মনে হতে পারে কিছুটা। শেষ দিকে অল্প কিছু জায়গায় ছবির বদলে ডকুমেন্টারি তৈরিও মনে হয়েছে যেন। তারপরও একটা সন্তোষজনক সফল নির্মাণ বলাই যায় মাইকেলকে।

মাইকেল ছবিতে তাঁর জীবনের যে সময়টাকে ধরা হয়েছে সে সময়ের গানগুলোর পটভূমি বোঝা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ‘বিট ইট’ বা ‘ব্যাড’ গানগুলোর কথা, যেটি ইনডিয়ানার গ্যারিতে মাইকেলের পরিবার থাকার সময়ে অভিজ্ঞতার জেরে পেয়েছিল। মার্কিনি ঘেটো সংস্কৃতি, বণবৈষম্য, ফুটপাথগুলোতে কাজ না পাওয়া বেকার যুবকদের নানা গ্যাংয়ের নিজেদের ভেতরকার মারামারি, বিরোধ আর পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক হতাশার গল্পই যেখানে ফুটে উঠেছে, সেখানে বিষণ্ন শিল্প এলাকার পরিত্যক্ত  ওয়্যারহাউস বা গোডাউনে জড়ো হওয়া ওই সময়ের চোখে ‘রাফ এ্যানড টাফ’ যুবাদের মাইকেল আহ্বান জানিয়েছে নিজেদের দ্বন্দ্বকে, প্রতিবাদকে শৈল্পিক ও প্রাকৃতিক ছন্দে ব্যক্ত করার জন্য।

প্রাসঙ্গিকভাবে বলা যায় থ্রিলারের মতো অস্তিত্বসংকটে ভোগা গানের পেছনে মাইকেলের মনস্তত্ত্বকেও যেখানে সে নিজেই স্বীকার করে বলছে প্রতি রাতে তার অদ্ভুত একাকিত্বের কথা, এত সফলতার পরও বিচিত্র নীল আঘাতের দুঃসময়তার গল্প। দিচ্ছে চেপে ধরা বিষণ্নতার বয়ান, যেখানে শেষতক নিজের ঘরেই ফিরে আসতে হয়েছে বন্ধুহীন, শব্দবিনিময়হীন। তার জীবনের এ ছবির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছেও দারুণভাবে থ্রিলারের মিউজিক ভিডিওতে, যেখানে মানব মনের অলিগলি, প্রান্তিক অবচেতন ভাবনা, কৃষ্ণ মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরা হয়েছিল আকর্ষণীয়ভাবে।

সমালোচনা ও বায়োপিকের সতর্কতা
মুক্তির আগে বিশ্বজুড়ে ‘মাইকেল’ ছবি নিয়ে বিপুল প্রত্যাশার চাপের কথাও উল্লেখযোগ্য। পপসম্রাটের জনপ্রিয়তার পরিধি এখনকার প্রায় সব প্রজন্মের কাছেই জানা। আর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তো কিছু বলাই অসম্ভব। কিন্তু ছবি তৈরি নিয়ে খুব সূক্ষ্ম সংশয়ও বোধ করি অনুভূত হয়েছে চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের মনে। কারণ, যেকোনো বায়োপিক সমালোচনার ঝুঁকি সঙ্গে নিয়েই আসে। এবং মুক্তি পাওয়ার পর সে সমালোচনা প্রত্যক্ষও করা গেছে। এম.জের এই ‘লার্জার অ্যানড গডলি লাইফে’ ঘটে যাওয়া শিশু নির্যাতনের ধারাবাহিক অভিযোগ ও বিতর্ক এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত অস্থিরতার গল্পও শেষ পর্যন্ত যেন উহ্যই রাখা হলো। বরং তার জীবনের মাইকেল হয়ে ওঠার নির্দিষ্ট একটা সময়ের গল্পই পরিচালক তার চূড়ান্ত সম্পাদনার ফলাফল হিসেবে রেখে দিলেন দর্শকদের জন্য। এতে করে দর্শক–হৃদয়ে পপসম্রাট মাইকেলের দ্যুতি ছড়ানো স্মৃতিও যেমন অম্লান থাকল, আবার নেতিবাচক বিতর্কও এড়ানো গেল। পরিচালক যেখানে বারবার নানা সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শিল্পীর শিল্পী হয়ে ওঠাটাই হয়ে উঠবে তার সব থেকে বড় পরিচয় দর্শকের কাছে।  

মোশরেকা অদিতি হক, শিক্ষক ও গবেষক