প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে
প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

৩০–এ নতুন শুরু, গুজব আর বিয়ে নিয়ে অকপট প্রিয়াঙ্কা

‘ক্রসওভার’—এই একটি শব্দ শুনলেই প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাসের মুখে হালকা কিন্তু স্পষ্ট এক অস্বস্তির ছাপ পড়ে। নিউইয়র্কের এক ঠান্ডা জানুয়ারির বিকেল। ম্যানহাটানের আপার ওয়েস্ট সাইডে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে বসে কথা বলছেন তিনি। বাইরে হাডসন নদীর দিক থেকে আসা কনকনে বাতাস, কিন্তু ভেতরে উষ্ণ, নরম আলো, মখমলের দেয়াল আর কোণে রাখা একটি পোকার টেবিল—যেন ভাগ্য পরীক্ষা করার জন্য সব প্রস্তুত। কোলে কালো উলের কোট জড়ানো, পাশে স্বামী নিক জোনাস ও চার বছরের মেয়ে মালতীর সংসার।

এই আরামদায়ক পরিবেশেও ‘ক্রসওভার’ শুনেই যেন কিছুটা বিরক্ত হলেন অভিনেত্রী। বললেন, ‘এই শব্দটার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুবই জটিল। কেন এত বিরক্ত লাগে, সেটাও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। শব্দটা এমন একটা ইঙ্গিত দেয় যেন আমি আগে যেখানে ছিলাম, সেটা যথেষ্ট ভালো ছিল না। অথচ আমার কাছে কখনোই তা মনে হয়নি।’

দুই দুনিয়ার তারকা
তবু বাস্তবতা হলো, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস এমন একজন তারকা, যিনি অর্থপূর্ণভাবে দুই বিশাল চলচ্চিত্রজগৎ হলিউড ও বলিউড—দুটিতেই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। শুধু অতিথি হিসেবে নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ তারকা হিসেবে নিজেকে তৈরি করেছেন।
সাবেক মিস ওয়ার্ল্ড প্রিয়াঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রে পরিচিতি পান এবিসির থ্রিলার সিরিজ ‘কোয়ান্টিকো’র মাধ্যমে। এরপর ‘দ্য ম্যাট্রিক্স রেজারেকশন’ এবং অস্কার মনোনীত ‘দ্য হোয়াইট টাগার’–এ অভিনয় ও প্রযোজনা—সব মিলিয়ে তিনি ধীরে ধীরে হলিউডের মূলধারায় জায়গা করে নেন।

এ উত্থান ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন বৈশ্বিক বিনোদন বাজারের চেহারা বদলাচ্ছে। ভারত এখন বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল স্ট্রিমিং মার্কেট। হলিউড এখনো এই বিশাল ট্যালেন্ট পুল ও দর্শক বাজার পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। প্রিয়াঙ্কা আর ব্যতিক্রম নন—তিনি যেন ভবিষ্যতের একটি প্রিভিউ।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘দ্য ব্লাফ’: শারীরিকভাবে কঠিন এক লড়াই
প্রিয়াঙ্কার সর্বশেষ ছবি ‘দ্য ব্লাফ’ পরিচালনা করেছেন ফ্র্যাঙ্ক ই ফ্লাওয়ার্স। ছবিতে প্রিয়াঙ্কা অভিনয় করেছেন উনিশ শতকের ক্যারিবীয় প্রেক্ষাপটে থাকা এক মায়ের চরিত্রে, যিনি তলোয়ার হাতে নিয়ে নিজের ছেলেকে বাঁচাতে লড়াই করেন। অ্যামাজনের জন্য নির্মিত ছবিটি ২৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাচ্ছে।

বক্স অফিস না থাকলেও এ ধরনের ছবিই আসলে প্রাইম ভিডিও বা নেটফ্লিক্সের মতো প্ল্যাটফর্মের সাবস্ক্রিপশন বাড়ায়। মজার ব্যাপার হলো, প্রকল্পটি শুরুতে নেটফ্লিক্সের ছিল, যেখানে জোয়ি সালডানার অভিনয়ের কথা ছিল। পরে প্রিয়াঙ্কা যুক্ত হন এবং অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওজ ছবিটির স্বত্ব নেয়। সালডানা অবশ্য নির্বাহী প্রডিউসার হিসেবে যুক্ত থাকছেন।

‘সিটাডেল’: অ্যামাজনের স্পাই ইউনিভার্স
এরপর আসছে অ্যামাজনের সুপার-বাজেট স্পাই সিরিজ ‘সিটাডেল’-এর দ্বিতীয় মৌসুম। প্রিয়াঙ্কা চোপড়া জোনাস ও রিচার্ড ম্যাডেন অভিনীত এই সিরিজের প্রথম সিজনের বাজেট ছিল প্রায় ৩০ কোটি ডলার! এটি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অ্যামাজনের দ্বিতীয় সর্বাধিক দেখা নতুন অরিজিনাল শো হয়।

গত কয়েক বছরে অ্যামাজন ও প্রিয়াঙ্কার সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। জন সিনা ও ইদ্রিস এলবার বিপরীতে ‘হেডস অব স্টেট’-এ অভিনয় করেন তিনি। অ্যামাজনের অভ্যন্তরীণ ডেটা ও প্রিয়াঙ্কার টিমের এআই অ্যানালাইসিস—দুটিই দেখায়, এই ছবির প্রচারণায় প্রিয়াঙ্কার নামই সবচেয়ে বেশি ‘আওয়াজ’ তৈরি করেছে। কারণ পরিষ্কার—ভারতে প্রতি মাসে ২৫ কোটির বেশি মানুষ স্ট্রিমিং ভিডিও দেখে। এটি স্টুডিওগুলোর জন্য শীর্ষ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের একটি।

এ কারণেই গুঞ্জন চলছে—অ্যামাজনের প্রথম ‘জেমস বন্ড’ ছবিতেও প্রিয়াঙ্কার নাম থাকতে পারে। ‘এখন তো এটা সত্যিই গ্লোবাল হতে পারে। নতুন মালিকানায় “বন্ড” ফ্র্যাঞ্চাইজি কোন পথে যায়, সেটা দেখার জন্য আমি খুবই কৌতূহলী,’ বলেন প্রিয়াঙ্কা।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

রাজামৌলির নতুন ছবি: ভারতীয় সিনেমায় প্রত্যাবর্তন
হলিউডের পাশাপাশি প্রিয়াঙ্কা ফিরছেন ভারতীয় সিনেমায়ও। এস এস রাজামৌলির নতুন ছবি ‘বারানসি’তে তিনি অভিনয় করবেন। এই ছবির বাজেট প্রায় ১৫ কোটি ডলার, যা এটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভারতীয় সিনেমা বানিয়েছে।
গত নভেম্বরে প্রিয়াঙ্কার প্রথম লুক প্রকাশিত হতেই ইন্টারনেটে ঝড় ওঠে। ছবিতে আরও আছেন মহেশ বাবু। এটি প্রিয়াঙ্কার ২০১৯-এর পর প্রথম ভারতীয় ছবি এবং এক দশকের বেশি সময় পর প্রথম তেলেগু ভাষার প্রজেক্ট।
‘এটা আমার করা যেকোনো কাজের থেকে আলাদা,’ বলেন প্রিয়াঙ্কা। রাজামৌলি নাকি ছবির ব্যাপারে অভিনেতাদের কাছেও খুব কম তথ্য দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা কখনো অ্যান্টার্কটিকা, কখনো অন্য কোনো জগতে চলে যাই—তাঁর তৈরি করা দুনিয়াগুলো এত বিশাল, এত কল্পনাপ্রসূত। ওর মতো ভিশন খুব কম পরিচালকের আছে।’
তবে একটি শর্ত ছিল প্রিয়াঙ্কার। ‘আমি ওকে বলেছিলাম, আমি যদি ভারতীয় সিনেমায় ফিরি, তাহলে আমাকে নাচতে হবে। একটা ড্যান্স নাম্বার চাই-ই চাই,’ বলেন প্রিয়াঙ্কা। গানটি এখনো শুট হয়নি, তবে তিনি সেটির জন্য মুখিয়ে আছেন।

৩০-এ এসে নতুন শুরু
২০১৩ সালে, ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায়, প্রিয়াঙ্কা লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমান। ‘ত্রিশের কোঠায় ক্যারিয়ার নতুন করে শুরু করা ভয়ংকর। আমি আর্থিকভাবে নিরাপদ ছিলাম, প্রতিষ্ঠিত ছিলাম। আর আমি নিজেই সবকিছু উল্টে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম,’ বলেন তিনি।

হলিউডে অনেক বৈঠকে গিয়ে প্রিয়াঙ্কা বুঝতে পারেন, তাঁর সম্পর্কে আগেভাগেই ধারণা তৈরি করে ফেলা হয়। ‘অনেকে বলত, “ওহ্‌, আপনি তো খুব ভালো ইংরেজি বলেন!” এ ধরনের মন্তব্য থেকেই বোঝা যেত, আমাকে কীভাবে দেখা হচ্ছে,’ বলেন প্রিয়াঙ্কা।

কিন্তু প্রিয়াঙ্কা শুধু ছবিতে অতিথি চরিত্র হতে চাননি। তাঁর স্বপ্ন ছিল গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র; যেখানে তাঁর কাজ সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে যাবে।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও নিক জোনাস। অভিনেত্রীর ইনস্টাগ্রাম থেকে

নিক জোনাস, গুজব আর ব্যক্তিগত জীবন
২০১৭ সালে অস্কার পার্টিতে নিক জোনাসের সঙ্গে পরিচয়। এরপর শুরু হয় নতুন ধরনের সেলিব্রিটি মনোযোগ। বয়সের পার্থক্য, ভিন্ন দেশ, ভিন্ন সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে সম্পর্কটি নিয়ে নানা সমালোচনা ও গুজব।
‘শুরুর দিকে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়,’ বলেন প্রিয়াঙ্কা।
আজ আট বছর পর, প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘লোকজন যদি আমাদের সম্পর্ক ভাঙার অপেক্ষায় থাকে, সেটা তাদের ব্যাপার।’
নিক জোনাসের আন্তরিকতা, সততা আর পরিবারের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন প্রিয়াঙ্কা। নিকের প্রস্তাবের স্মৃতির প্রতীক হিসেবে দুজনের শরীরেই মিল থাকা ট্যাটু আছে—একটি চেক মার্ক।

সামনে কী
‘সিটাডেল’-এর নতুন মৌসুম বা ‘বারানসি’তে নিজের চরিত্র নিয়ে কিছু বলতে চান না প্রিয়াঙ্কা। হাসতে হাসতে বলেন, ‘আমি কাজ করি, তারপর বাসায় ফিরি।’
এর পাশাপাশি উইল ফ্যারেল ও জ্যাক এফরনের সঙ্গে নিকোলাস স্টোলারের কমেডি ছবি ‘জাজমেন্ট ডে’-তে অভিনয় করেছেন প্রিয়াঙ্কা। এটি তাঁর প্রথম ইংরেজি ভাষার কমেডি।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে