বাবা কায়সার হামিদের সঙ্গে কারিনা কায়সার
বাবা কায়সার হামিদের সঙ্গে কারিনা কায়সার

এই ফুটবল উৎসবে নেই বাবার সঙ্গী কারিনা

শুরু হচ্ছে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ ফুটবল বিশ্বকাপ। বাংলাদেশ মাঠে না থাকলেও বিশ্বকাপ ঘিরে দেশের অলিগলি, পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে ঘরোয়া আড্ডায় ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। আর বিশ্বকাপ মানেই কায়সার হামিদের ঘরেও ছিল আলাদা উন্মাদনা। প্রিয় দল, খেলোয়াড় আর ম্যাচ নিয়ে সাবেক এই ফুটবলারের বাসায় চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক। সেই আড্ডার সবচেয়ে বড় সঙ্গী ছিলেন তাঁর কন্যা কারিনা। কিন্তু এবার বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে তাঁকে ছাড়া। তাই ফুটবল উৎসবের উচ্ছ্বাসের মধ্যেও কায়সার হামিদের পরিবারে নেমে এসেছে শূন্যতা।

বাবা কায়সার হামিদের সঙ্গে কারিনা কায়সার

গত ১৫ মে মৃত্যু হয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সারের। লিভার-সংক্রান্ত জটিলতায় প্রথমে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয় তাঁকে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতের চেন্নাইয়ে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

কায়সার হামিদের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয় গতকাল বুধবার সন্ধ্যায়। যেখানে বারবার ফিরে এসেছে কারিনার প্রসঙ্গ। জানান, একমাত্র মেয়ের মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে এবার নেই বিশ্বকাপ উন্মাদনা।

কারিনা কায়সার

বাবা-মেয়ের সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বের, ফুটবলের তাঁরা ছিলেন একই দলের সমর্থক। পরিবারের অন্য সদস্যদের পছন্দ ভিন্ন হলেও বিশ্বকাপ এলেই বাবা-মেয়ের জুটি থাকত একই শিবিরে। বাবা–মেয়ে মিলেই ঘর মাতিয়ে রাখতেন। শুধু ঘরেই নয়, বিশ্বকাপের ম্যাচ বড় পর্দায় দেখতে বাবা–মেয়ে যেতেন বনানী ডিওএইচএস মাঠে।

কায়সার হামিদ বলেন, ‘ও ছিল ফুটবলের ভীষণ ভক্ত। মজার বিষয় হলো, আমি ব্রাজিল সমর্থন করতাম, সে–ও তা সমর্থন করত। আবার ব্রাজিল বাদ পড়ে গেলে যদি ফ্রান্স বা জার্মানিকে সমর্থন করি, সেও সেই দলেই চলে যেত।’

শুধু খেলা দেখা নয়, বাবার ফুটবল–ক্যারিয়ারের স্মৃতিগুলোও আগলে রাখতেন কারিনা। কায়সার হামিদ জানান, তাঁর খেলার সময়কার অনেক ভিডিও এখন আর সহজে পাওয়া যায় না। কিন্তু কারিনা ইন্টারনেটে খুঁজে খুঁজে সেসব ভিডিও বের করতেন।
কায়সার হামিদ বলেন, ‘ও প্রায়ই আমাকে ডেকে বলত, “আব্বু, তোমার একটা ভিডিও পেয়েছি, দেখো।” ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের সময়কার কিছু ভিডিওও খুঁজে বের করেছিল। এসব দেখে খুব আনন্দ পেত।’

বর্তমান প্রজন্মের কাছে কায়সার হামিদের পরিচয় অনেক সময় ‘কারিনার বাবা’ হিসেবেও এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারিনার জনপ্রিয়তার কারণে এমনটা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গর্বই বোধ করেন কায়সার হামিদ। বলেন, ‘এখনকার ছেলেমেয়েরা আমাকে কারিনার বাবা হিসেবেই চেনে। এতে আমার কাছে কখনো খারাপ লাগেনি, বরং ভালোই লেগেছে। গর্বে আবার বুক ভরে গেছে।’

কারিনা কায়সার

মেয়ের স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে অবশ্য বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দেশের ফুটবলের এই কিংবদন্তি। বিশ্বকাপের প্রসঙ্গ থেকে কথোপকথন যত এগিয়েছে, ততই ফিরে এসেছে কারিনার কথা। মেয়ের মৃত্যুটা যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। কায়সার হামিদ বলেন, ‘ওকে মিস করা মানে কী! প্রচণ্ড, প্রচণ্ড মিস করি। ওর কথা মনে পড়লে পুরোনো ভিডিও দেখি। তখন চোখে পানি এসে পড়ে। ধরে রাখতে পারি না। আমার মেয়েটা এভাবে চলে গেল।’

পরিবার সূত্রে জানা যায়, প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হন কারিনা। পরে তাঁর শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়ে। একই সঙ্গে হেপাটাইটিস এ এবং ই-জনিত জটিলতায় তাঁর লিভার ফেইলিউর দেখা দেয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে আইসিইউতে নেওয়া হয় এবং পরে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়।

কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে পরিচিতি পেলেও সাম্প্রতিক সময়ে অভিনয় ও চিত্রনাট্য লেখার কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন কারিনা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাণবন্ত উপস্থাপনা ও জীবনঘনিষ্ঠ কনটেন্ট তরুণ দর্শকদের কাছে তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। পরে ওটিটি ও নাটকের জগতেও ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার হিসেবেও কাজ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘ইন্টার্নশিপ’ ও ‘৩৬-২৪-৩৬’।