নায়ক ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি। তবে তাঁর মেজাজ-মর্জি সুবিধার নয়—কথা কম, কাজ (পড়ুন মারপিট) বেশি। হিন্দি সিনেমায় এমন ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ নায়ক অচেনা কিছু নয়। চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক সুরেশ ত্রিবেণী আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন সেই চেনা গল্পেই, তবে নতুন আবহে। ছবির মূল চরিত্রে ৬৯ বছর বয়সী অনিল কাপুর, যিনি ‘অ্যাংরি’ কিন্তু ‘ইয়ং ম্যান’ বলা যায় কি? কাগজে-কলমে না হলেও পর্দায় তাঁর নায়কোচিত উপস্থিতিতে ৬৯ বছর বয়সে সত্যি সত্যি ‘ইয়ং’ হয়ে উঠেছেন অনিল কাপুর। তাই তাঁর অভিনীত নতুন সিনেমা ‘সুবেদার’-এ অনেক দুর্বলতা থাকলেও অনিল কাপুরের জন্যই একবার দেখা যায়।
একনজরেসিনেমা: ‘সুবেদার’ধরন: অ্যাকশন-ড্রামাপরিচালক: সুরেশ ত্রিবেণীঅভিনয়: অনিল কাপুর, রাধিকা মদন, সৌরভ শুক্লা, মোনা সিংস্ট্রিমিং: অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওদৈর্ঘ্য: ২ ঘণ্টা ২২ মিনিট
ছবিতে অনিল কাপুর অভিনয় করেছেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার অর্জুন মৌর্যর চরিত্রে। অবসরের পর তিনি ফিরে আসেন নিজের শহরে। গল্প শুরু হয় অর্জুন মৌর্যর স্ত্রীর মৃত্যুর পর। মেয়ে শ্যামার (রাধিকা মদন) সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ঠিকঠাক নয়। দীর্ঘদিন সীমান্তে দায়িত্ব পালন করেছেন অর্জুন, সেভাবে সংসার করা হয়নি। এমনকি স্ত্রীর মৃত্যুর সময়ও থাকতে পারেননি, সে সময় মেয়ে বারবার ফোন করেও বাবার সাড়া পাননি। সেই সম্পর্ক এখনো স্বাভাবিক হয়নি।
‘সুবেদার’-এর প্রেক্ষাপট উত্তর ভারতের একটি ক্ষয়িষ্ণু ছোট শহর। সেখানে স্থানীয় ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর আধিপত্যে সাধারণ মানুষের জীবন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে। সেই প্রেক্ষাপটে এক সেনা কর্মকর্তা—যিনি পদমর্যাদায় খুব বড় নন—নিজেকে দেখতে পান ক্ষমতার এক নির্মম চক্রের মুখোমুখি। এই সাধারণ কিন্তু শক্তিশালী প্রেক্ষাপটই ছবির মূল চালিকা শক্তি।
অর্জুন শহরে ফিরে আসে প্রিয় লাল জিপসি গাড়ি নিয়ে। প্রয়াত স্ত্রী আচার বিক্রি আর দরজির কাজ করে টাকা জমিয়ে গাড়ি কিনেছিল; লাল জিপসি তাই অর্জুনের সবচেয়ে প্রিয়। এই গাড়ির সূত্রেই স্থানীয় অপরাধীর সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে অর্জুন; পরে সেটা রূপ নেয় আরও কঠিন পরিস্থিতিতে। শহরে অর্জুনের বন্ধু বলতে প্রভাকর (সৌরভ শুক্লা)। দুই বন্ধু মিলে কি পারবেন ভয়ংকর এই গ্যাংয়ের সঙ্গে লড়তে?
অনিল কাপুরের অভিনয়ই ছবির প্রাণ। এ ছবিতে তাঁর উপস্থিতিই যেন বিশেষ কিছু। পুরো সিনেমায় অর্জুন চরিত্রটির খুব বেশি সংলাপ নেই। কিন্তু তাঁর অ্যাংরি লুক কিছু না বলেও অনেক কিছু বলে দেয়। অ্যাকশন দৃশ্যেও তিনি দুর্দান্ত, এই বয়সেই যেভাবে পর্দায় মারপিটের দৃশ্যগুলো সামলেছেন; প্রশংসা করতেই হয়। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি এই চরিত্রে এমন এক দৃঢ়তা এনে দেন, যা পুরো ছবিকে টেনে নিয়ে যায়। বয়সের ভার থাকলেও তাঁর উপস্থিতিতে কোনো ক্লান্তি নেই; বরং একধরনের পরিণত শক্তি কাজ করে।
অনিল কাপুর দেখিয়ে দেন, কীভাবে সংযত অভিনয় দিয়েও একটি চরিত্রকে প্রভাবশালী করে তোলা যায়। নায়কের ভেতরের দ্বন্দ্ব—একদিকে কর্তব্যবোধ, অন্যদিকে ক্ষোভ—এই দুইয়ের সংঘর্ষ ছবিকে আরও গভীরতা দেয়। তিনি কেবল একজন যোদ্ধা নন; তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধ্য হন। এই মানবিক দিকটিই ছবির গল্পকে সাধারণ অ্যাকশনধর্মী থ্রিলার থেকে কিছুটা আলাদা করে তোলে।
অর্জুনের মেয়ে শ্যামা চরিত্রে রাধিকা মদনও বেশ ভালো। পরিচালক শ্যামার চরিত্রটিকে স্বতন্ত্রতা দিয়েছেন। যে সাবেক সেনা কর্মকর্তা বাবার সাহায্য ছাড়াই নিজের লড়াই চালিয়ে যায়। অ্যাসিড আক্রমণের হুমকি, ধর্ষণের চেষ্টা সব নিজেই সামলে নেয়। পার্শ্ব চরিত্রগুলোতে আদিত্য রাওয়াল, সৌরভ শুক্লা, মোনা সিং, ফয়সাল মালিকও দারুণ। আলাদা করে বলতে হয় মোনা সিংয়ের কথা। ‘কোহরা ২’-এর পর একেবারে ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্রে আবারও চমকে দিয়েছেন তিনি।
‘সুবেদার’ মূলত নায়কের পেশাগত ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের মাধ্যমে গল্প এগিয়ে নিয়ে যায়। সুরেশ ত্রিবেণী নিজের সবশেষ সিরিজ ‘দলদল’-এও প্রধান চরিত্রের ক্ষোভ, ট্রমাকে আশ্রয় করেছিলেন। তবে সেই সিরিজের চেয়ে সিনেমায় সেটা আরও ভালোভাবে দেখাতে পেরেছেন তিনি। সঙ্গে সাউন্ড ডিজাইন, অধ্যায়ভিত্তিক ন্যারেশন ছবির নান্দনিকতা বৃদ্ধি করেছে। যদিও ক্লাইম্যাক্স অনেকটা চেনা ছকের, তবে অর্জুনের মানসিক লড়াই তুলে ধরার ক্ষেত্রে সফল নিমার্তা। অর্জুন শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে নয়, সামাজিক অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
সিনেমাটির প্রেক্ষাপট নির্মাণেও মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন নির্মাতা। এমনভাবে শহরের ভাঙাচোরা পরিবেশ, ভীতিকর ক্ষমতার কাঠামো ও মানুষের অসহায়তাকে তুলে ধরে যে দর্শক সহজেই সেই জগতে প্রবেশ করতে পারেন। বহুদিন ধরেই হিন্দি সিনেমা এমন বাস্তব ও অন্ধকারাচ্ছন্ন ছোট শহরের চিত্র খুব কমই দেখিয়েছে।
একটি ছোট শহরে ক্ষমতাশালী মাফিয়াদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পড়া এক মাঝারি পদমর্যাদার সেনাসদস্য—এই এক লাইনের গল্পকেই প্রায় দুই ঘণ্টার দ্রুত গতির ছবিতে বিস্তার করা হয়েছে। পুরোনো দিনের বলিউড অ্যাকশন-থ্রিলারের আবহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা, যেখানে নায়ক শুধু ব্যক্তিগত শত্রুর বিরুদ্ধে নয়, পুরো দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার সঙ্গেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
তবে সবকিছু নিখুঁতভাবে এগোয় না। মাঝে মাঝে ছবির গতি একটু হোঁচট খায়। কিছু মুহূর্তে মনে হয় গল্পটি আরও সংযতভাবে বলা যেত। চাইলে দৈর্ঘ্যও আরও একটু কমানো সম্ভব ছিল। তবু পরিচালকের আবহ নির্মাণ আর অনিল কাপুরের শক্তিশালী উপস্থিতি সেই দুর্বলতাগুলো অনেকটাই ঢেকে দেয়।