‘ডেথ অব দ্য পাস্টরস ওয়াইফ’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘ডেথ অব দ্য পাস্টরস ওয়াইফ’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

মৃত্যুর আগে মিকা বলেছিলেন মাথায় গুলি লাগলে আত্মহত্যা ভাববেন না

মির্টল বিচের মিলার দম্পতিকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, তাঁদের সংসার বেশ সুখের। মিকা মিলার ছিলেন এক পাদরির স্ত্রী। তাঁর স্বামী জন-পল মিলার সলিড রক চার্চের ধর্মীয় নেতা। গির্জার সদস্যদের চোখে তাঁদের জীবন ছিল প্রায় আদর্শ। কিন্তু সেই ছবির আড়ালে ছিল দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদের চেষ্টা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত মিকার মৃত্যু।

নেটফ্লিক্সের তিন পর্বের ডকুসিরিজ ‘ডেথ অব দ্য পাস্টরস ওয়াইফ’ সেই ঘটনাগুলোই নতুন করে সামনে এনেছে। ৩০ বছর বয়সী মিকার মৃত্যু আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচিত হলেও তাঁর মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল এবং কেন তিনি এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছেছিলেন—সেটিই অনুসন্ধান করেছে সিরিজটি। মিকার পরিবার, বন্ধু ও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের পাশাপাশি এতে রয়েছে আগে প্রকাশ্যে না আসা কিছু ভিডিও।

মিকার মৃত্যুর পর জন-পল দ্রুত গির্জার কাজে ফিরে যাওয়ায় অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়। মিকার পরিবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের অভিযোগ প্রকাশ করতে শুরু করে। পুরোনো পোস্টে মিকার নির্যাতনের কথা বলার বিষয়গুলোও নতুন করে সামনে আসে। দ্রুতই #JusticeForMica হ্যাশট্যাগে ঘটনাটি টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গির্জার বাইরে বিক্ষোভও হয়।

কম বয়সেই পরিচয়
মিকা ফ্রান্সিস কিশোরী বয়সে সলিড রক চার্চে যেতেন। তখনই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় জন-পল মিলারের। সে সময় জন-পল ছিলেন বিবাহিত এবং পাঁচ সন্তানের বাবা। পরে মিকা তাঁর সন্তানদের দেখাশোনার কাজও করতেন।

২০১৫ সালে মিকা ও জন-পলের প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় বলে মিকার পরিবারের ভাষ্য। তখন মিকার বয়স ২০, জন-পলের ৩৫। দুজনই আগের সংসার থেকে বেরিয়ে ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর বিয়ে করেন।

মিকার পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। তাঁর বোন সিয়েরা ফ্রান্সিসের অভিযোগ, জন-পল অনেক কম বয়স থেকেই মিকার প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং ধীরে ধীরে তাঁকে নিজের প্রভাবের মধ্যে নিয়ে আসেন। জন-পল অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁদের দাম্পত্য ছিল ভালোবাসায় পূর্ণ।

দাম্পত্যে টানাপোড়েন
বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই তাঁদের সম্পর্কে সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে। মিকা ২০২৩ সালের অক্টোবরে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেটি খারিজ হয়ে যায়। এরপর জন-পলও বিচ্ছেদের আবেদন করেন, যা মার্চে খারিজ হয়।

এর মধ্যেই মিকা পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, তাঁর গাড়ির চাকা কাটা হয়েছে। এক সপ্তাহে এটি দ্বিতীয় ঘটনা বলে জানান তিনি। কেউ তাঁকে অনুসরণ করছে বলেও তাঁর সন্দেহ ছিল। পুলিশকে মিকা বলেছিলেন, ‘আমি আমার জীবনের জন্য ভয় পাচ্ছি।’
মৃত্যুর পর তাঁর বোন সিয়েরা জানান, মিকা তাঁকে আগে বলেছিলেন, তাঁর মাথায় গুলি লাগলে সেটি যেন আত্মহত্যা বলে ধরে নেওয়া না হয়। মিকা স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগও পরিবারের সদস্য ও গির্জার লোকজনকে জানিয়েছিলেন বলে দাবি করেন সিয়েরা। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে স্বামীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশের আবেদনও করেছিলেন মিকা।

অন্যদিকে জন-পল দাবি করেন, তাঁদের সংসার সুখের ছিল। মিকা তাঁর স্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি গির্জার সৃজনশীল পরিচালক ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবেও কাজ করতেন।

যেদিন মারা গেলেন মিকা
২০২৪ সালের ১৫ এপ্রিল মিকা আবার বিচ্ছেদের আবেদন করেন। শুনানি হওয়ার কথা ছিল ৫ জুন। এর মধ্যে তিনি জন-পলের সঙ্গে থাকা বাড়ি ছেড়ে আলাদা অ্যাপার্টমেন্টে চলে যান। ২৫ এপ্রিল জন-পলকে বিচ্ছেদের কাগজ দেওয়া হয়। দুই দিন পর, ২৭ এপ্রিল মারা যান মিকা।

‘ডেথ অব দ্য পাস্টরস ওয়াইফ’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

সেদিন বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে নিজের বাসা থেকে বের হন মিকা। দুপুর ১২টা ১২ মিনিটে একটি পন শপ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ও গুলি কেনেন। এরপর উত্তর ক্যারোলাইনার একটি স্টেট পার্কে যান। বেলা ২টা ৫৪ মিনিটে ৯১১-এ ফোন করে জানান, তিনি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছেন। পরিবারের লোকজন যেন তাঁর মরদেহ খুঁজে পান, সে জন্য ফোনের অবস্থান শনাক্ত করার অনুরোধও করেন।
পরে একটি নদীতে তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়। মাথায় গুলির আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।

পরদিন গির্জায় ফিরে জন-পল মিকার মৃত্যুর খবর জানান। তিনি বলেন, মিকার মৃত্যু আত্মহত্যা এবং তিনি মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছিলেন।

মিকার মৃত্যুর পর জন-পল তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলেন। তাঁর দাবি, মিকার বাইপোলার ডিজঅর্ডার, স্কিজোফ্রেনিয়া ও ডিপেনডেন্ট পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার ছিল এবং এর আগে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। মিকা একাধিকবার মানসিক সমস্যার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন; সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে।জন-পলের দাবি ছিল, মিকার পরিবার তাঁকে ওষুধ খেতে নিরুৎসাহিত করেছিল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ঘটনা
মিকার মৃত্যুর পর জন-পল দ্রুত গির্জার কাজে ফিরে যাওয়ায় অনেকের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়। মিকার পরিবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের অভিযোগ প্রকাশ করতে শুরু করে। পুরোনো পোস্টে মিকার নির্যাতনের কথা বলার বিষয়গুলোও নতুন করে সামনে আসে। দ্রুতই #JusticeForMica হ্যাশট্যাগে ঘটনাটি টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। গির্জার বাইরে বিক্ষোভও হয়।

কেউ কেউ জন-পলকে মিকার হত্যার জন্য দায়ী করেন। তদন্তে অবশ্য সেই অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পুলিশ জানায়, মিকা যেদিন মারা যান, জন-পল তখন সাউথ ক্যারোলাইনার চার্লস্টনে ছিলেন এবং সন্তানদের স্কুলের একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে উপস্থিত ছিলেন।
তবে মিকার মৃত্যুর আগের ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত থামেনি।

‘ডেথ অব দ্য পাস্টরস ওয়াইফ’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে দুই পক্ষের দুই দাবি
মিকার মৃত্যুর পর জন-পল তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলেন। তাঁর দাবি, মিকার বাইপোলার ডিজঅর্ডার, স্কিজোফ্রেনিয়া ও ডিপেনডেন্ট পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার ছিল এবং এর আগে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। মিকা একাধিকবার মানসিক সমস্যার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন; সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
জন-পলের দাবি ছিল, মিকার পরিবার তাঁকে ওষুধ খেতে নিরুৎসাহিত করেছিল। অন্যদিকে মিকার পরিবারের অভিযোগ, তাঁর মানসিক সমস্যার মূল কারণ ছিল জন-পলের সঙ্গে সম্পর্ক। পরিবারের আইনজীবী রেজিনা ওয়ার্ড এমনও অভিযোগ করেন, জন-পল নিজের লিথিয়ামের ওষুধ মিকাকে জোর করে খাওয়াতেন। তবে তদন্তে মিকার নামে লিথিয়ামের কোনো প্রেসক্রিপশন পাওয়া যায়নি।

নতুন মামলায় জন-পল
মিকার মৃত্যুর আগে তাঁকে অনুসরণ করা হচ্ছে—এমন অভিযোগের বিষয়টি পরে আবার সামনে আসে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এফবিআই জানায়, জন-পল তদন্তকারীদের কাছে সত্য তথ্য দেননি। তাঁর বিরুদ্ধে সাইবারস্টকিং এবং এফবিআইকে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

ফেডারেল অভিযোগে বলা হয়েছে, জন-পল মিকার ওপর নজরদারি চালানোর জন্য লোক নিয়োগ করেছিলেন। তাঁর গাড়ির গতিবিধি অনুসরণ করা, এক দিনে ৫০ বারের বেশি ফোন করা এবং অনুমতি ছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত ছবি অনলাইনে প্রকাশের মতো অভিযোগও রয়েছে।

২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি আদালতে হাজির হন জন-পল। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। মামলার পরবর্তী শুনানি অক্টোবর ২০২৬-এ হওয়ার কথা। দোষী প্রমাণিত হলে সাইবারস্টকিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং মিথ্যা তথ্য দেওয়ার জন্য দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

‘মিকার আইন’ করার উদ্যোগ
মিকার পরিবার এখন শুধু বিচার নয়, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার অন্য মানুষদের জন্যও কাজ করতে চাইছে। তাঁদের আইনজীবী রেজিনা ওয়ার্ড ‘মিকার আইন’ নামে একটি নতুন আইন করার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। এতে পারিবারিক সহিংসতার আওতায় ‘কোয়ারসিভ কন্ট্রোল’ বা জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণের মতো আচরণ যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে—যেমন কাউকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা, প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে বঞ্চিত করা বা নিয়মিত অনুসরণ করা।

ডকুসিরিজের পরিচালক জুলিয়া উইলবি ন্যাসনের মতে, পারিবারিক নির্যাতন সব সময় শারীরিক আঘাত দিয়ে শুরু হয় না। প্রযুক্তি এখন কাউকে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি করার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। আলাদা আলাদা ঘটনা হয়তো তেমন গুরুতর মনে না–ও হতে পারে, কিন্তু সবকিছু একসঙ্গে দেখলে নির্যাতনের একটি ধারাবাহিক চিত্র স্পষ্ট হয়।
সিরিজটির শোরানার মাইক গ্যাসপারোর আশা, মিকার গল্প দর্শকদের এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতি চিনতে সাহায্য করবে, যা হয়তো তাঁরা নিজের জীবনে বা কাছের কারও জীবনে দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর কাছে, মিকার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার সেটিই।

টাইম অবলম্বনে