
স্বাধীন চলচ্চিত্র হিসেবে বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসব ও প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়ে প্রশংসিত ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ এবার মুক্তি পাচ্ছে দেশের জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকিতে। ২৬ আগস্ট রাত ১২টা থেকে দেশ-বিদেশের দর্শকেরা সিনেমাটি দেখতে পারবেন। ছাত্ররাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল, পদ পাওয়ার প্রতিযোগিতা, গ্রুপিং, হল–রাজনীতি, টাকার লেনদেন এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তরুণদের জড়িয়ে পড়ার চেনা বাস্তবতাকে হাস্যরসের মোড়কে সিনেমায় তুলে ধরেছেন নির্মাতা আকাশ হক।
ছাত্ররাজনীতিতে ক্ষমতা কীভাবে এক হাত থেকে অন্য হাতে যায়, সেই ক্ষমতার পালাবদলে কী কী পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়, কোথায় টাকা ওড়ে, কার টাকা কার পকেট ঘুরে কোথায় যায়—এমন অনেক কিছুই উঠে এসেছে ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’–এ। ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে ‘রাজা’ হয়ে ওঠেন, আবার ক্ষমতা হারিয়ে কীভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েন, সেই গল্পও আছে সিনেমায়। নেতার কাছাকাছি যেতে বা আস্থাভাজন হতে কিছু কর্মী যেসব ‘পন্থা’ অবলম্বন করেন, সেসবও বাদ যায়নি।
এই অতি-আনুগত্যের সংস্কৃতির ব্যঙ্গাত্মক প্রকাশ পাওয়া যায় সিনেমার ‘সহমত ভাই’ গানেও। গানের কথাগুলো এমন—‘নেতা আপনি শুধু আগান আমরা আছি পাশে/ আপনার জন্য জীবন দেব দলকে ভালোবেসে/ আপনি যদি ডানে আগান আমরা যাব ডানে/ আপনি যদি ভাসেন নেতা আমরা ভাসব বানে/ সামনে যদি বুলেট আসে পেতে দেব বুক/ আপনা দুঃখে দুঃখী আমি আপনার সুখে সুখ।’
সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অন্ধকার ও বাস্তব রূপ, ক্ষমতা, হল–রাজনীতি এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তরুণদের জড়িয়ে পড়ার মতো বিষয়গুলো মজার ছলে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক বক্তব্যের বদলে হাস্যরসের মাধ্যমে পরিচিত বাস্তবতার দিকে দর্শকের দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসব ও প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি দেখার পর দর্শকের প্রতিক্রিয়াও পেয়েছেন আকাশ হক। সেই অভিজ্ঞতা কেমন? জানতে চাইলে নির্মাতা বলেন, ‘আমার মনে হয়, মানুষ সিনেমাটার হিউমার খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই আমাকে বলেছেন—ভাই, এই চরিত্রটা তো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক ভাইয়ের মতো। অনেকেই বলেছেন—এটি একটা সাহসী কাজ। কিন্তু আমার কাছে সাহসী হওয়ার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দর্শকের মনে হওয়া যে—হ্যাঁ, এই কথাটা বলা দরকার ছিল।’
‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ আকাশ হকের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করার পর গণরুমে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতাসহ নিজের দেখা চারপাশের নানা ঘটনা এই সিনেমা নির্মাণে তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে। এর আগেও নির্মাতা জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর গণরুমে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, তার ছাপ রয়েছে সিনেমায়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় একটি পরিসরে গল্প বলতে গিয়ে কেন রাজনীতিকেই এতটা গুরুত্ব দিলেন? বিশ্ববিদ্যালয়–জীবনের অন্য কোনো দিক কি তাঁকে গল্প বলতে বা সিনেমা নির্মাণে তাড়িত করেনি? আকাশ হকের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি কেবল ক্যাম্পাস বা ছাত্ররাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আকাশ হক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি আমার কাছে শুধু ছাত্ররাজনীতির গল্প নয়; এটা বাংলাদেশের বৃহত্তর ক্ষমতার কাঠামোর একটা ছোট সংস্করণ। এখানকার ক্ষমতার খেলা, পদ পাওয়ার জন্য যে প্রতিযোগিতা, সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক, গ্রুপিং—এগুলো শুধু ক্যাম্পাসের বিষয় না, এগুলো আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছবি। তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে সিনেমা করতে গিয়ে রাজনীতিকে এড়িয়ে যাওয়াটা আমার কাছে বরং অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।’
রাজনীতি নিয়ে হাস্যরস—এমন একটি বিষয়কে সিনেমার গল্প হিসেবে বেছে নেওয়ার আগে ঝুঁকির কথাও ভাবতে হয়েছে নির্মাতাকে। আকাশ হক জানান, তাঁর ভয় কিছুটা ছিল। তবে সেই ভয় না থাকলে হয়তো সিনেমাটি নির্মাণের যাত্রাটাও এতটা মজার হতো না। তাঁর দাবি, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে সিনেমাটি নির্মাণ করেননি তিনি; বরং তাঁর আগ্রহ ছিল একটি সংস্কৃতি, ব্যবস্থা ও মানসিকতাকে তুলে ধরা।
আকাশ হক বলেন, ‘আমি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে টার্গেট করিনি। আমি একটা কালচার, একটা সিস্টেম এবং একটা মানসিকতা নিয়ে কথা বলতে চেয়েছি। আমার একমাত্র লক্ষ্য ছিল বাস্তবতার সঙ্গে দায়িত্বশীল থাকা, যতটুকু সম্ভব। সেন্সর বোর্ড আমাদের হতাশ করেনি, রীতিমতো প্রশংসাই করল বলে মনে হলো।’
সিনেমাটিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে ‘সহমত ভাই’ গানটি। তাবিব মাহমুদের লেখা, সুর ও কণ্ঠে গানটির মিউজিক কম্পোজিশন করেছেন শুভ্র রাহা। গানটি যেন সংক্ষেপে পুরো সিনেমার গল্প ও বক্তব্যকেই তুলে ধরে। কেন র্যাপের মাধ্যমে এই বক্তব্য তুলে ধরার কথা ভাবলেন, সে প্রসঙ্গে নির্মাতা বলেন, ‘র্যাপ ঢঙে অনেক জটিল কথা সরাসরি বলা যায়। এই সিনেমার পরিবেশের সঙ্গে র্যাপের তালটাই মানায় বলে আমার মনে হয়েছে।’
প্রেক্ষাগৃহসহ বিভিন্ন জায়গায় ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’ প্রদর্শিত হলেও এখনো অনেক দর্শকের কাছে সিনেমাটি পৌঁছায়নি। এবার চরকির মাধ্যমে দেশ-বিদেশের দর্শকের কাছে সিনেমাটি পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। ওটিটিতে মুক্তির ফলে আরও বড় পরিসরের দর্শক সিনেমাটি দেখতে পারবেন। দর্শকদের সিনেমাটি ভালো লাগবে বলেই আশা করছেন নির্মাতা আকাশ হক।
সিনেমাটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেবদ্যুতি আইচ, রকি খান, ববি বিশ্বাস, আখতারুজ্জামান আজাদ, আবু সায়ীদ, ইফাদ হাসান, চয়ন মন্ডল, এস এ জীবন, মেহেদী হাসান সোহানসহ আরও অনেকে। পরিচালনার পাশাপাশি ‘দ্য ইউনিভার্সিটি অব চানখাঁরপুল’–এর প্রযোজনা, চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও চিত্রগ্রহণের কাজও করেছেন আকাশ হক।