দুই দশকের বেশি সময় ধরে বলিউড তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, বন্ধুত্ব, বিয়ে, বিচ্ছেদ থেকে শুরু করে নানা বিতর্কিত মন্তব্য—সবকিছুরই সাক্ষী হয়েছে যে সোফা, এবার সেখানে শেষবারের মতো বসবেন করণ জোহর। ২২ বছর পর জনপ্রিয় সেলিব্রিটি চ্যাট শো ‘কফি উইথ করণ’ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। অনুষ্ঠানটির নবম মৌসুমই হবে শেষ মৌসুম। ১৪ অক্টোবর থেকে জিওহটস্টারে শুরু হবে এই শেষ অধ্যায়।
২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা অনুষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত আটটি মৌসুমে মোট ১৬১টি পর্ব প্রচার করেছে। দীর্ঘ এই সময়ে ভারতীয় বিনোদনজগতের অসংখ্য তারকা বসেছেন করণের সেই বিখ্যাত ‘কফি কাউচে’। তাঁদের কেউ বলেছেন প্রেমের কথা, কেউ জানিয়েছেন সম্পর্ক ভাঙার গল্প, কেউ প্রকাশ করেছেন বন্ধুত্বের অন্দরমহলের খবর। আবার কখনো অতিথির একটি মন্তব্যই পরদিন হয়ে উঠেছে বড় সংবাদ।
শুরুটা শাহরুখ-কাজলকে দিয়ে
২০০৪ সালের ১৯ নভেম্বর স্টার ওয়ার্ল্ডে প্রথম প্রচারিত হয় ‘কফি উইথ করণ’। প্রথম পর্বের অতিথি ছিলেন শাহরুখ খান ও কাজল, করণ জোহরের সিনেমার সবচেয়ে পরিচিত জুটিগুলোর একটি। অনুষ্ঠানের প্রথম মৌসুমেই এসেছিলেন অমিতাভ বচ্চন ও অভিষেক বচ্চন, ঐশ্বরিয়া রাই ও সঞ্জয় লীলা বানসালির মতো তারকারাও।
প্রথম দিকে অনুষ্ঠানটির মূল আকর্ষণ ছিল তারকাদের একটু অন্যভাবে দেখা। সিনেমার প্রচারণামূলক সাক্ষাৎকারের বদলে এখানে তাঁদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, সহকর্মীদের নিয়ে মতামত কিংবা নানা মজার প্রশ্নের মুখোমুখি করতেন করণ। ‘র্যাপিড ফায়ার’ পর্বও দ্রুত অনুষ্ঠানের অন্যতম জনপ্রিয় অংশ হয়ে ওঠে।
ফলে ‘কফি উইথ করণ’ ধীরে ধীরে সাধারণ সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান থেকে আলাদা পরিচিতি পায়। বলিউডের তারকাদের পর্দার বাইরের ব্যক্তিত্ব জানার অন্যতম জায়গা হয়ে ওঠে এটি।
তারকাদের অন্দরমহলের জানালা
দুই দশকে অনুষ্ঠানের সোফায় বসেছেন বলিউডের প্রায় সব প্রজন্মের বড় তারকা। শাহরুখ খান, অমিতাভ বচ্চন, আমির খান, সালমান খান, অক্ষয় কুমার, অজয় দেবগন, কাজল, রানী মুখার্জি, কারিনা কাপুর, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, দীপিকা পাড়ুকোন, রণবীর কাপুর, রণবীর সিং থেকে শুরু করে আলিয়া ভাট; অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকা কার্যত ভারতীয় মূলধারার তারকাদের একটি দীর্ঘ তালিকা।
কারিনা কাপুর ও কাজল এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বেশি আসা অতিথিদের মধ্যে রয়েছেন। কখনো একসঙ্গে, কখনো অন্য তারকার সঙ্গে জুটি বেঁধে তাঁরা হাজির হয়েছেন করণের সামনে।
তবে ‘কফি উইথ করণ’-এর সাফল্যের রহস্য শুধু তারকার উপস্থিতিতে ছিল না। করণের প্রশ্ন করার ধরন, দ্রুতগতির কথোপকথন এবং অতিথিদের কাছ থেকে এমন তথ্য বের করে আনার চেষ্টা, সব মিলিয়ে প্রতিটি পর্বকে আলাদা আলোচনার বিষয় করে তুলত।
বিতর্কও কম হয়নি
অনুষ্ঠানটির দীর্ঘ যাত্রায় বিনোদনের পাশাপাশি বিতর্কও ছিল নিয়মিত সঙ্গী। সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০১৯ সালে। ষষ্ঠ মৌসুমের একটি পর্বে ক্রিকেটার হার্দিক পান্ডিয়া ও লোকেশ রাহুলের মন্তব্য নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। নারীদের নিয়ে পান্ডিয়ার মন্তব্যকে ঘিরে তৈরি হয় তীব্র বিতর্ক। পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষমা চান। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড দুজনকেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় এবং তদন্ত চলাকালে তাঁদের সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে দেশে ফিরিয়ে দেয়।
পরে ২০১৯ সালের ২৪ জানুয়ারি তাঁদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
এ ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছিল, ‘কফি উইথ করণ’-এর কোনো মন্তব্য শুধু একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মধ্যে আটকে থাকে না। তারকারা যা বলেন, সেটি মুহূর্তেই সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে, কখনো তার প্রভাব অনুষ্ঠানটির বাইরেও অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
অনুষ্ঠানে বলিউডের স্বজনপ্রীতি নিয়েও একাধিকবার বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কঙ্গনা রনৌতের সঙ্গে করণের কথোপকথন বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছিল। আবার তারকাদের একে অপরকে নিয়ে মন্তব্য, সাবেক প্রেমিক-প্রেমিকা কিংবা সহকর্মীদের নিয়ে খোলামেলা কথাবার্তাও বহুবার খবরের শিরোনাম হয়েছে।
টেলিভিশন থেকে ওটিটিতে
২০১৯ সালে ষষ্ঠ মৌসুম শেষ হওয়ার পর কয়েক বছর বিরতি ছিল। এরপর ২০২২ সালে ‘কফি উইথ করণ’-এর নতুন যাত্রা শুরু হয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে। সে সময় করণ প্রথমে এমন একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন, যাতে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন অনুষ্ঠানটি বুঝি শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরে জানা যায়, অনুষ্ঠানটি বন্ধ হচ্ছে না; বরং টেলিভিশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে ডিজনি+ হটস্টারে।
সপ্তম মৌসুমের প্রযোজনার দায়িত্ব নেয় করণের প্রতিষ্ঠান ধর্মাটিক এন্টারটেইনমেন্ট। ২০২২ সালের ৭ জুলাই শুরু হওয়া মৌসুমের প্রথম পর্বে অতিথি ছিলেন রণবীর সিং ও আলিয়া ভাট। এরপর একে একে হাজির হন বলিউড ও দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার বহু তারকা।
ওটিটিতে যাওয়ার পর অনুষ্ঠানটির ধরনেও কিছু পরিবর্তন আসে। পর্বগুলো তুলনামূলক দীর্ঘ হয়, অতিথিদের সঙ্গে কথাবার্তার পরিসর বাড়ে এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয় নিয়ে আরও খোলামেলা আলোচনা দেখা যায়।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হয় অষ্টম মৌসুম। প্রথম পর্বেই একসঙ্গে এসেছিলেন রণবীর সিং ও দীপিকা পাড়ুকোন। এটি ছিল তাঁদের প্রথম যৌথ সাক্ষাৎকারগুলোর একটি। নিজেদের সম্পর্ক, বিয়ে ও প্রেমের গল্প নিয়ে তাঁদের কথাবার্তা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এবার কেন শেষ?
‘কফি উইথ করণ’ শেষ করার সিদ্ধান্তের কারণও জানিয়েছেন করণ জোহর। তাঁর ভাষায়, অনুষ্ঠানটি তাঁর বিনোদনজগতের পরিচয়ের বড় অংশ হয়ে উঠেছে। ২২ বছর পরও তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে এবার নবম মৌসুমে পৌঁছে গেছে অনুষ্ঠানটি।
কিন্তু এবার জীবনের পরবর্তী দশকে তিনি অন্যদিকে মন দিতে চান। বিশেষ করে আরও বেশি সিনেমা পরিচালনা করতে চান এবং আরও অনেক গল্প বলতে চান। সেই কারণেই ভারী মন নিয়ে নবম মৌসুমকে শেষ মৌসুম করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া বা দর্শকের আগ্রহের অভাবকে কারণ হিসেবে সামনে আনেননি করণ; বরং নিজের সৃজনশীল ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকেই সিদ্ধান্তটির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
করণের এই সিদ্ধান্ত তাঁর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’, ‘কাভি খুশি কাভি গম’, ‘মাই নেম ইজ খান’, ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ এবং সর্বশেষ ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’র মতো সিনেমা পরিচালনা করেছেন। একই সঙ্গে প্রযোজক হিসেবেও বলিউডে সক্রিয় তিনি।
শেষবারের সোফায় কারা?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শেষ মৌসুমে করণের অতিথি হবেন কারা? ১৪ অক্টোবর শুরু হতে যাওয়া নবম মৌসুমের অতিথি তালিকা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তাই কারা শেষবারের মতো সেই সোফায় বসবেন, তা নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে