‘মহারাজ’–এর সাফল্যের পর সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রার নতুন ছবি নিয়েই আগ্রহ ছিল দর্শকদের। সেই সঙ্গে তিন দশক পর সানি দেওল-অক্ষয় খান্না জুটিকে দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলেন দর্শকেরা। পর্দায় যখন সানি দেওল এবং অক্ষয় খান্নার মতো দুজন শক্তিমান অভিনেতার নাম একসঙ্গে ভেসে ওঠে, তখন দর্শকের প্রত্যাশার পারদ এমনিতেই বেড়ে যায়। বিশেষ করে ‘দামিনী’র সেই ‘ঢাই কিলো কা হাথ’খ্যাত সানি দেওল যখন আবারও আইনজীবীর কালো কোট গায়ে জড়ান, তখন নব্বই দশকের নস্টালজিয়ায় ভোগা দর্শকদের রোমাঞ্চিত হওয়াই স্বাভাবিক। তার ওপর অক্ষয় খান্না সদ্যই ‘ধুরন্ধর’ সিনেমায় খলনায়ক হিসেবে বাজিমাত করেছেন। এই দুই তারকাকে নিয়ে পরিচালক সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রা নির্মাণ করেছেন কোর্টরুম ড্রামা ‘ইক্কা’। রহস্যঘেরা ট্রেলার আর আদালতকেন্দ্রিক গল্প—সব মিলিয়ে ‘ইক্কা’ মুক্তির আগেই বলিউডের আলোচিত ওটিটি ছবিগুলোর একটি হয়ে উঠেছিল।
একনজরেসিনেমা: ‘ইক্কা’ধরন: কোর্টরুম ড্রামা, থ্রিলারপরিচালক: সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রাচিত্রনাট্য: আলথিয়া কৌশল ও ময়ঙ্ক তিওয়ারিঅভিনয়: সানি দেওল, অক্ষয় খান্না, তিলোত্তমা সোম, দিয়া মির্জা, আকাঙ্ক্ষা রঞ্জন কাপুর, সানজিদা শেখস্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম: নেটফ্লিক্সরানটাইম: ২ ঘণ্টা ৩৪ মিনিট
তাই ১০ জুলাই সিনেমাটি নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর এ নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। আর সেই প্রতিফলন দেখা যায় নেটফ্লিক্সের টপ চার্টে। মুক্তির পরপরই সিনেমাটি মুক্তির বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের শীর্ষ ১০ সিনেমার তালিকায় শীর্ষ স্থান দখল করে নেয়। মুক্তির পর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো সিনেমাটি রয়েছে শীর্ষে। এ পর্যন্ত ভিউ হয়েছে প্রায় ২ কোটি! শীর্ষ তালিকায় থাকলেও সিনেমাটি কি পারল নির্মাণগুণে উতরে যেতে? চলুন দেখা যাক।
গল্পের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন অর্জুন মেহরা (সানি দেওল), যিনি এমন একজন স্বনামধন্য ও নীতিমান আইনজীবী। তবে তিনি কেবল নির্দোষদের পক্ষেই আদালতে লড়েন। অর্জুন মেহরা নিজের নাম থেকে বেশি পরিচিত ‘ইক্কা’ নামে। কারণ, সবাই বলে থাকে, আদালতে কেসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো সব সময় তাঁর পকেটে একটি ‘ইক্কা’ অর্থাৎ টেক্কা থাকে।
অন্যদিকে শৌর্যমান গৌর (অক্ষয় খান্না) হলেন একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও ধনকুবেরের ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে এক তরুণীকে নিপীড়ন ও হত্যাচেষ্টার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। নীতিগত কারণে অর্জুন প্রথমে শৌর্যমান গৌরের কেস লড়তে চান না। কিন্তু এমন সময় অর্জুন মেহরার ব্যক্তিগত জীবনে আসে এমন এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা যে আদর্শকে বলি দিয়ে শৌর্যমানের পক্ষে কেস লড়তে হয় তাঁকে। নিজের পরিবারকে বাঁচাতে অর্জুন কি নিজের নৈতিকতাকে বলি দেন? নাকি ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে? এমন একটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ‘ইক্কা’ সিনেমাটি।
তারকাবহুল সিনেমাটি অভিনয়শিল্পীরা দারুণ অভিনয় করেছেন। সানি দেওল তাঁর পরিচিত ‘গর্জন’ আর সংলাপের বাইরে নিজেকে তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে ব্যক্তিগত সংকট আর নীতিগত দ্বন্দ্বের দৃশ্যগুলোতে তাঁর অভিনয় গল্পে প্রাণ দিয়েছে। অন্যদিকে অক্ষয় খান্না আবারও প্রমাণ করেছেন, উচ্চ স্বরে সংলাপ নয়, বরং চোখের ভাষা আর শরীরী অভিব্যক্তিই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। রহস্যময় শৌর্যমান গৌর চরিত্রে তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দারুণ অভিনয় করেছেন। সরকারি আইনজীবী মধুরা চরিত্রে তিলোত্তমা সোম সংযত ও দৃঢ় অভিনয় করে আদালতের দৃশ্যগুলোকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।
দিয়া মির্জা, সানজিদা শেখ ও আকাঙ্ক্ষা রঞ্জন কাপুর তাঁদের চরিত্র অনুযায়ী অভিনয় করলেও খুব বেশি গভীরতা তৈরি করতে পারেননি।
‘ইক্কা’ সিনেমার শুরুটা বেশ জমাট ছিল। খুব কম সময়ের ভেতরে দর্শক মূল গল্পে ঢুকে পড়েন। তবে ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি অন্য জায়গায়। দীর্ঘ সময় ধরেই দর্শক বুঝে উঠতে পারেন না, শৌর্যমান গৌর আদৌ অপরাধটি করেছেন কি না। মামলার তথ্য ধীরে ধীরে উন্মোচিত হওয়ায় কৌতূহল শেষ পর্যন্ত বজায় থাকে। একই সঙ্গে আদালতের লড়াইও শুধু বাদী-বিবাদীর আইনি তর্কে আটকে থাকে না। একদিকে সরকারি আইনজীবী মধুরা (তিলোত্তমা শোম) প্রমাণের ভিত্তিতে মামলাটি জিততে চান, অন্যদিকে নীতির সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হওয়া ডিফেন্স আইনজীবী অর্জুন মেহরা (সানি দেওল) ব্যক্তিগত সংকট ও পেশাগত দায়িত্বের টানাপোড়েনে পড়েন। আর এই দুই পক্ষের মাঝখানে থেকে অভিযুক্ত শৌর্যমান নিজের হিসাব-নিকাশে খেলার মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করে। শুরু থেকেই ছবিটি আকর্ষণীয় কোর্টরুম থ্রিলারের ইঙ্গিত দেয়।
কিন্তু বিরতির পর সেই ধার অনেকটাই হারিয়ে ফেলে ‘ইক্কা’। দ্বিতীয়ার্ধে এসে চিত্রনাট্য সেই ধূসর অঞ্চল থেকে বেরিয়ে অনেকটাই পরিচিত বলিউডি পথে হাঁটে। আদালতের যুক্তি, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনি লড়াইয়ের জায়গা দখল করে নেয় নাটকীয় মোড়, আবেগ আর কাকতালীয় কিছু ঘটনা।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, গল্প যেভাবে নিজেকে একটি বুদ্ধিদীপ্ত কোর্টরুম থ্রিলার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারে না। গল্পের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় স্বাভাবিক মনে হয় না। বরং মনে হয়, গল্পকে এগিয়ে নিতে সেগুলো জোর করেই আনা হয়েছে। ফলে আদালতের টানটান লড়াই ধীরে ধীরে নায়ককেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। কিছু টুইস্ট দর্শককে চমকে দেওয়ার চেষ্টা করলেও সেগুলো অনেকটা আগে থেকেই ধারণা করা যায়।
আক্ষেপের জায়গাটা এখানেই। শক্তিশালী অভিনয়শিল্পী, অভিজ্ঞ পরিচালক এবং সম্ভাবনাময় গল্প—সবকিছুই ছিল ‘ইক্কা’কে একটি স্মরণীয় কোর্টরুম ড্রামায় পরিণত করার জন্য। কিন্তু চিত্রনাট্যের দুর্বলতার কারণে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি পরিচালক সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রা।
তারকাদের জনপ্রিয়তা আর নব্বই দশকের নস্টালজিয়াকে পুঁজি করে ‘ইক্কা’ দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে পারলেও শেষ পর্যন্ত নিজের সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারেনি। যাঁরা মূলধারার বলিউডি কোর্টরুম ড্রামা পছন্দ করেন, তাঁদের সিনেমাটি ভালো লাগতে পারে। তবে যুক্তিনির্ভর ও ধারালো কোর্টরুম থ্রিলার প্রত্যাশা করলে ‘ইক্কা’ দেখার অভিজ্ঞতা কিছুটা অপূর্ণই মনে হয়।