
চিকিৎসকেরা বলে দিয়েছেন, ‘আর ভালো হওয়ার আশা নেই। আয়ু ফুরিয়ে আসছে।’ কয়েক মাস, বড় জোড় কয়েক বছর হয়তো বাঁচবেন। এমন সময় কী চলতে পারে ক্যানসারে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির মনোজগতে? আপনার মনে সম্ভাব্য যেসব উত্তর আসতে পারে, সেগুলোর কোনোটার সঙ্গেই এ ঘটনা হয়তো মিলবে না। কারণ, চিকিৎসকেরা ‘শেষ কথা’ বলে দেওয়ার পর ওই ব্যক্তির মনে হয়েছিল নিজের অতৃপ্ত যৌনজীবনের কথা! যে কয়েক দিন বাঁচবেন, সেই সময়ে তিনি নতুন করে নিজের যৌনজীবন উপভোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন! হইচই ফেলে দেওয়া এই সত্যি ঘটনা অবলম্বনেই গত বছর মুক্তি পায় ওয়েব সিরিজ ‘ডায়িং ফর সেক্স’। আলোচিত সিরিজটির জন্য গতকাল অনুষ্ঠিত গোল্ডেন গ্লোবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছেন মিশেল উইলিয়ামস।
পডকাস্টে মলি তাঁর প্রায় ২০০টি যৌন অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কের গল্প খোলামেলা ভাবে তুলে ধরেন। ২০২০ সালে ওয়ান্ডেরি থেকে প্রকাশিত ছয় পর্বের এই পডকাস্টটি মুক্তির পরই ব্যাপক সাড়া ফেলে। মলির মৃত্যুর এক বছর পর প্রকাশিত এই পডকাস্ট এখন পর্যন্ত ৫০ লাখের বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে।
মলির গল্প থেকে সিরিজ
২০১৯ সালে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে স্তন ক্যানসারে মারা যান মলি কোচান। তবে মৃত্যুর আগে পৃথিবীকে শুনিয়ে যান নিজের অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। মৃত্যুর আগে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু নিকি বয়ারের সঙ্গে মিলে ২০২০ সালে শুরু করেন পডকাস্ট ‘ডায়িং ফর সেক্স’। সেখানে তিনি তুলে ধরেন, চতুর্থ পর্যায়ের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর জীবন কীভাবে বদলে যায়। সেই পডকাস্ট থেকেই তৈরি হয়েছে একই নামের সিরিজটি। এফএক্স ও হুলুতে প্রচারিত এই সিরিজে মলির চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিশেল উইলিয়ামস। মলির সবচেয়ে কাছের বন্ধু নিকির চরিত্রে অভিনয় করেছেন জেনি স্লেট। মলির বন্ধু নিকি এখনো বেঁচে আছেন; সিরিজের নির্বাহী প্রযোজকদের একজনও তিনি।
সিরিজের পেছনের সত্য ঘটনা
২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল মুক্তি পাওয়া ‘ডাইং ফর সেক্স’ সিরিজটি মলি কোচানের জীবনের ওপর পুরোপুরি ভিত্তি করে তৈরি। কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছেন মলি—যিনি জানতে পারেন, তাঁর স্তন ক্যানসার চতুর্থ ধাপে পৌঁছেছে। চিকিৎসকদের কথায় স্পষ্ট হয়ে যায়, এই রোগ আর নিরাময়যোগ্য নয়।
এই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মলি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্বামীকে ছেড়ে দেন। ঠিক করেন, জীবনের শেষ সময়টুকুতে নিজে নতুন করে যৌনতা অন্বেষণ করবেন। এই যাত্রায় তাঁর পাশে ছিলেন বন্ধু নিকি বয়ার। মলির এই অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক, অনুভূতি ও আত্ম সংঘাত পরে রূপ নেয় একটি পডকাস্টে।
অনেক দিন ধরেই স্তন ক্যানসারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মলি। ২০১৫ সালের মধ্যেই তাঁর কেমোথেরাপি, দুই স্তন অপসারণ (বাইল্যাটারাল মাসটেকটমি), রেডিয়েশন থেরাপি এবং স্তন পুনর্গঠন অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এসব চিকিৎসার পরও কাজ হয়নি। চিকিৎসকেরা জানান, তিনি আবারও ক্যানসারে আক্রান্ত এবং এবার তা চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এই কঠিন সত্য জানার পর মলি সিদ্ধান্ত নেন, জীবনের শেষ অধ্যায়টা তিনি নিজের মতো করেই কাটাবেন। তিনি তাঁর দাম্পত্য জীবন ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন যৌনতা ও আত্মপরিচয়ের নতুন অভিজ্ঞতার খোঁজে। সেই অভিজ্ঞতাগুলোই তিনি লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেন পডকাস্টে।
পডকাস্টের জন্ম
২০১৮ সালের একদিন। দুপুরের খাবার খেতে বসে মলি ও নিকি কথা বলছিলেন। সেদিন দুপুরের আগেই মলি দুটি ডেটে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই আসে পডকাস্টের ভাবনা।
পডকাস্টে মলি তাঁর প্রায় ২০০টি যৌন অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কের গল্প খোলামেলা ভাবে তুলে ধরেন। ২০২০ সালে ওয়ান্ডেরি থেকে প্রকাশিত ছয় পর্বের এই পডকাস্টটি মুক্তির পরই ব্যাপক সাড়া ফেলে। মলির মৃত্যুর এক বছর পর প্রকাশিত এই পডকাস্ট এখন পর্যন্ত ৫০ লাখের বেশি বার ডাউনলোড হয়েছে।
পডকাস্টে মলির নিজের কথা পডকাস্টের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছিল, মলি শুধু স্তন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন না, তিনি লড়ছিলেন অতীতের নানা মানসিক আঘাতের সঙ্গেও।
একটি পর্বে মলি তাঁর দাম্পত্য জীবন নিয়ে বলেন, ‘ক্যানসার আসার আগেই আমাদের বিবাহিত জীবনে সমস্যা ছিল। রোগ ধরা পড়ার ঠিক আগে আমি আমাদের সম্পর্কটা নতুন করে প্রাণবন্ত করতে চাইছিলাম। তারপর হঠাৎ ক্যানসার এসে গেল।’
বই থেকে টিভি সিরিজ মলি কোচানের আত্মজীবনী ‘স্ক্রু ক্যানসার: বিকামিং হোল’ প্রকাশিত হয় ২০২০ সালে। বইটি প্রকাশের এক বছর আগেই ৪৫ বছর বয়সে মলি মারা যান।
মলির গল্পের বড় এক ভক্ত ছিলেন ‘নিউ গার্ল’-এর নির্মাতা এলিজাবেথ মেরিওয়েদার। নিকি বয়ারের সঙ্গে যৌথভাবে তিনিই বই ও পডকাস্টের গল্পকে রূপ দেন টিভি সিরিজ ‘ডাইং ফর সেক্স’-এ।
‘ডাইং ফর সেক্স’ শুধু যৌনতা নিয়ে নয়। এটি জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের সত্যটা খুঁজে পাওয়ার গল্প। ভয়কে অতিক্রম করে নিজের শরীর, চাওয়া, না পাওয়া ও অপূর্ণতাকে গ্রহণ করার গল্প।
কী আছে সিরিজে
সিরিজের প্রথম পর্বে এক প্যালিয়েটিভ কেয়ার থেরাপিস্ট মলিকে জিজ্ঞেস করেন-তিনি যদি একটি ‘বাকেট লিস্ট’ বানান, সেখানে কী কী রাখবেন। সেই আলাপেই মলি প্রথম উপলব্ধি করেন, তিনি জীবনের বাকি সময়ে যৌনতা, ডেটিং এবং সত্যিকারের ভালো লাগাকে অগ্রাধিকার দিতে চান।
এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ ছিল তাঁর সদিচ্ছাপূর্ণ কিন্তু কার্যত নিষ্ক্রিয় স্বামীকে (জে ডুপ্লাস) ছেড়ে যাওয়া। দ্বিতীয় ধাপ সবচেয়ে কাছের বন্ধু নিকিকে (জেনি স্লেট) তাঁর প্রধান পরিচর্যাকারী হওয়ার অনুরোধ করা। নিকি একমুহূর্তও দেরি না করে রাজি হয়ে যান।
বাস্তব জীবনেও মলি কোচানের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিকি বয়ারই তাঁর দেখভাল করেছিলেন। নিকি বয়ার পরে টাইম সাময়িকীতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সিরিজে তাঁদের বন্ধুত্বের অনেক কিছুই যথাযথভাবে উঠে এসেছে, আবার কিছু জায়গায় নেওয়া হয়েছে সৃজনশীল স্বাধীনতা।
স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর মলি অনলাইনে পরিচিত পুরুষদের সঙ্গে দেখা করতে শুরু করেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছবি আদান-প্রদান করেন, এমনকি স্ন্যাপচ্যাটেও।
সিরিজে একটি জায়গায় সৃজনশীল স্বাধীনতা নেওয়া হয়েছে বলে জানান নিকি। এক দৃশ্যে দেখা যায়, নিকির চরিত্রটি মলির মেডিকেল নথি হারিয়ে ফেলে। বাস্তবে নিকি ছিলেন ঠিক তার উল্টো—চরম গোছানো মানুষ, যিনি নার্ভাস হলে ঘর পরিষ্কার করতে শুরু করেন।
কেন এই গল্প আলাদা
‘ডাইং ফর সেক্স’ শুধু যৌনতা নিয়ে নয়। এটি জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের সত্যটা খুঁজে পাওয়ার গল্প। ভয়কে অতিক্রম করে নিজের শরীর, চাওয়া, না পাওয়া ও অপূর্ণতাকে গ্রহণ করার গল্প।
নিকি বয়ার বলেন, ‘মলি চাইত নিজেকে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখতে যেন হাসপাতালে আটকে থাকা না লাগে। মলি প্রেমে পড়তে চেয়েছিল। আর শেষ পর্যন্ত সে নিজেরই প্রেমে পড়েছিল। আপনার জীবনের শেষ করার আগে যেসব কাজ করতে চান-সেগুলো শুরু করে দিন এখনই।’
ই! নিউজ ও টাইম অবলম্বনে