‘পিপল উই মিট অন ভ্যাকেশন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘পিপল উই মিট অন ভ্যাকেশন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

৪ কোটি ৫ লাখ ভিউ! ভ্রমণ আর প্রেমের গল্পে ঝড় তুলেছিল যে সিনেমা

একসঙ্গে ঘুরতে যাওয়া, বছরের পর বছর বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখা—তারপর একসময় আবিষ্কার করা, সম্পর্কটি আসলে বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি কিছু। চেনা এই প্রেমের গল্পকেই নতুন আবহে পর্দায় এনেছে নেটফ্লিক্সের রোমান্টিক কমেডি ‘পিপল উই মিট অন ভ্যাকেশন’। এমিলি হেনরির জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি মুক্তির পর দর্শকের আগ্রহ কাড়ে দ্রুত। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই এটি নেটফ্লিক্সের ইংরেজি সিনেমার তালিকায় ১ নম্বরে উঠে আসে এবং ১ কোটি ৭২ লাখ ভিউ পায়। পরে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ভিউ দাঁড়ায় ৪ কোটি ৫ লাখ।

সংখ্যার পাশাপাশি সিনেমাটি আলোচনায় এসেছে আরও একটি কারণে—দুই কেন্দ্রীয় চরিত্রের সম্পর্ক। প্রেমের গল্প হলেও এখানে প্রেমের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব, নিজেদের খুঁজে পাওয়া এবং জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।

দুই বিপরীত স্বভাবের মানুষ
গল্পের কেন্দ্রে পপি রাইট ও অ্যালেক্স নিলসেন। পপি প্রাণচঞ্চল, স্বাধীনচেতা, হুটহাট সিদ্ধান্ত নিতে ভালোবাসে। অন্যদিকে অ্যালেক্স অনেক বেশি গোছানো, নিয়ম মেনে চলা মানুষ। দুজনের স্বভাব একেবারেই বিপরীত। তবু কলেজজীবন থেকে তাদের বন্ধুত্ব।

প্রায় এক দশক ধরে তারা প্রতি গ্রীষ্মে একসঙ্গে কোথাও না কোথাও বেড়াতে যায়। কখনো কানাডা, কখনো নিউ অরলিন্স, কখনো বার্সেলোনা—প্রতিটি ভ্রমণ যেন তাদের সম্পর্কের নতুন একটি অধ্যায় খুলে দেয়। কিন্তু জীবনের একপর্যায়ে এসে পপি বুঝতে শুরু করে, অ্যালেক্সকে ছাড়া তার জীবন কেমন হবে, সেটি ভাবাই কঠিন।
অ্যালেক্সও কি একইভাবে ভাবে? বন্ধুত্বের আড়ালে এত দিন যে অনুভূতিকে দুজন এড়িয়ে গেছে, সেটিই ধীরে ধীরে সামনে আসে। ফলে প্রশ্ন ওঠে, তারা কি সত্যিই শুধু বন্ধু, নাকি এত দিনের সঙ্গীর মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রেম?

‘পিপল উই মিট অন ভ্যাকেশন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

এক দশকের সম্পর্ক, দুই ঘণ্টার সিনেমা
সিনেমাটির অন্যতম আকর্ষণ এর সময়ের কাঠামো। গল্প সরলভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় এগোয় না। অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন সময়ের ভ্রমণ, স্মৃতি, ভুল-বোঝাবুঝি এবং সম্পর্কের টানাপোড়েন মিলিয়ে তৈরি হয়েছে পপি ও অ্যালেক্সের দীর্ঘ যাত্রা।

মূল উপন্যাসটি ২০২১ সালে প্রকাশের পর নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার তালিকায় ১ নম্বরে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রেই বইটির ২০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। ফলে বইটির বিপুল ভক্তের প্রত্যাশা ছিল সিনেমাটিকে ঘিরে। নির্মাতা ব্রেট হ্যালির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এত বড় একটি গল্পকে দুই ঘণ্টার কম সময়ে পর্দায় তুলে ধরা।
সেই জায়গায় তিনি গল্পের সব ঘটনা ধরে রাখার বদলে পপি ও অ্যালেক্সের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। অর্থাৎ কোথায় তারা বেড়াতে গেল, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—প্রতিটি ভ্রমণের পর তারা একে অপরের কতটা কাছাকাছি এল।

‘পিপল উই মিট অন ভ্যাকেশন’ নতুন কোনো প্রেমের সংজ্ঞা দেয় না। বরং বহু পুরোনো ‘বন্ধু থেকে প্রেমিক’ গল্পটিকেই নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ আর সম্পর্কের দ্বিধার সঙ্গে মিলিয়েছে। এ কারণেই হয়তো সিনেমাটি মুক্তির পর এত দ্রুত দর্শকের কাছে পৌঁছে গেছে। ১ কোটি ৭২ লাখ ভিউ থেকে ৪ কোটি ৫ লাখে পৌঁছানো শুধু একটি সংখ্যার গল্প নয়; এটি দেখায়, বড় বাজেটের অ্যাকশন কিংবা অন্ধকার থ্রিলারের ভিড়েও দর্শক এখনো সহজ প্রেমের গল্পের জন্য জায়গা রাখেন। পপি আর অ্যালেক্সের গল্প শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো প্রশ্নই সামনে আনে—জীবনে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা হতে পারে, অসংখ্য জায়গায় যাওয়া হতে পারে; কিন্তু এমন একজন মানুষ কি থাকে, যার সঙ্গে পথচলাটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ভ্রমণ?

পপি-অ্যালেক্স হয়ে উঠলেন এমিলি ও টম
পপির চরিত্রে অভিনয় করেছেন এমিলি বেডার, আর অ্যালেক্সের ভূমিকায় টম ব্লাইথ। দুজনের রসায়নই সিনেমাটির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি।
পপির চরিত্রে বেডারকে একই সঙ্গে উচ্ছল, মজার এবং আবেগপ্রবণ হতে হয়েছে। চরিত্রটি শুধু হাস্যরসের উৎস নয়; তার ভেতরে রয়েছে অনিশ্চয়তা, একাকিত্ব ও নিজের জীবন নিয়ে দ্বিধাও। বেডার সেই পরিবর্তনগুলোকে খুব স্বাভাবিকভাবে পর্দায় এনেছেন।

অন্যদিকে ব্লাইথের অ্যালেক্স অনেকটাই সংযত। সে বেশি কথা বলে না, অনুভূতি প্রকাশেও স্বচ্ছন্দ নয়। কিন্তু চোখের অভিব্যক্তি ও ছোট ছোট আচরণের মধ্য দিয়ে চরিত্রটির আবেগ প্রকাশ করেছেন ব্লাইথ। ফলে পপির প্রাণচাঞ্চল্যের বিপরীতে অ্যালেক্সের স্থিরতা গল্পে আলাদা ভারসাম্য তৈরি করেছে।

এমিলি হেনরি নিজেও দুই অভিনেতার রসায়ন নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর মতে, বেডার ও ব্লাইথের মধ্যে এমন স্বাভাবিক বোঝাপড়া ছিল, যা পর্দায় পপি ও অ্যালেক্সের সম্পর্ককে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

‘পিপল উই মিট অন ভ্যাকেশন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

শুধু দুই তারকার সিনেমা নয়
সিনেমাটিতে আরও অভিনয় করেছেন সারাহ ক্যাথরিন হুক, জামিলা জামিল, লুসিয়েন লাভিসকাউন্ট, লুকাস গেজ, মাইলস হাইজার, অ্যালান রাক ও মলি শ্যানন। তাঁদের উপস্থিতি মূল প্রেমের গল্পের বাইরে সিনেমাটির জগৎকে আরও প্রাণবন্ত করেছে।
বিশেষ করে সহশিল্পীদের নিয়ে সমালোচকদের একটি অংশ ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। শক্তিশালী পার্শ্বচরিত্রগুলো সিনেমাটিকে শুধু পপি-অ্যালেক্সের প্রেমকাহিনি হয়ে থাকতে দেয়নি।

নির্মাতা ব্রেট হ্যালির ভাবনা
‘হার্টস বিট লাউড’ ও ‘অল দ্য ব্রাইট প্লেসেস’-এর পরিচালক ব্রেট হ্যালি এই সিনেমায় পুরোনো ধাঁচের রোমান্টিক কমেডির আবহ ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। তাঁর কাছে এটি শুধু প্রেমের গল্প নয়; বরং মানুষ আসলে কেমন জীবন চায়, কাকে পাশে চায় এবং নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক কেমন—সেসব প্রশ্নের গল্প।

হ্যালির লক্ষ্য ছিল দর্শক যেন সিনেমাটি দেখার সময় মনে করেন, তাঁরাও পপি ও অ্যালেক্সের সঙ্গে ছুটিতে বেরিয়েছেন। তাই বিভিন্ন লোকেশনের সৌন্দর্য, ভ্রমণের উচ্ছ্বাস এবং চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত মুহূর্ত—সবকিছুকে গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়েছে।

এ কারণেই সিনেমাটির একটি বড় আকর্ষণ এর দৃশ্যপট। ইতালি, কানাডা, নিউ অরলিন্স কিংবা বার্সেলোনা—প্রতিটি জায়গা শুধু পটভূমি নয়, পপি ও অ্যালেক্সের সম্পর্কের পরিবর্তনের সাক্ষী।

সমালোচকদের প্রশংসা, আবার আপত্তিও
দর্শকের বড় সাড়া পেলেও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া একেবারে একমুখী নয়। ‘রটেন টমেটোজ’-এ সিনেমাটির টমাটোমিটার স্কোর ৭৮ শতাংশ, যেখানে সমালোচকদের সার্বিক মতামতে মূলত দুই অভিনয়শিল্পীর আকর্ষণীয় উপস্থিতি এবং সিনেমাটির হালকা মেজাজের প্রশংসা করা হয়েছে।

তবে কিছু সমালোচক মনে করেছেন, এমিলি হেনরির উপন্যাসে যে গভীরতা ও আবেগ ছিল, প্রায় দুই ঘণ্টার সিনেমায় তার সবটা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কেউ কেউ সংলাপকে অতিরিক্ত পরিচিত বা অনুমানযোগ্য বলেছেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সমালোচনায় সিনেমাটিকে মিষ্টি কিন্তু দ্রুত ভুলে যাওয়ার মতো বলে মন্তব্য করা হয়েছে। আবার দ্য হলিউড রিপোর্টারের মতে, সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তি দুই কেন্দ্রীয় অভিনেতার রসায়ন।

‘পিপল উই মিট অন ভ্যাকেশন’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

জনপ্রিয়তার রহস্য কোথায়
‘পিপল উই মিট অন ভ্যাকেশন’-এর সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ সম্ভবত এর পরিচিত অথচ আবেগঘন সম্পর্কের গল্প। এখানে দর্শক জানেন, শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে; তবু অপেক্ষা করেন কখন পপি ও অ্যালেক্স নিজেদের অনুভূতিকে স্বীকার করবে।

তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এমিলি হেনরির বইয়ের বিশাল পাঠকগোষ্ঠী। বইটির জনপ্রিয়তা সিনেমাটির জন্য আগেই একটি দর্শক তৈরি করে দিয়েছিল। নেটফ্লিক্সের বৈশ্বিক প্রচার, সুন্দর লোকেশন এবং এমিলি বেডার-টম ব্লাইথের রসায়ন সেই আগ্রহকে আরও বাড়িয়েছে।

পুরোনো ঘরানায় নতুন প্রজন্মের প্রেম
‘পিপল উই মিট অন ভ্যাকেশন’ নতুন কোনো প্রেমের সংজ্ঞা দেয় না। বরং বহু পুরোনো ‘বন্ধু থেকে প্রেমিক’ গল্পটিকেই নতুন প্রজন্মের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ আর সম্পর্কের দ্বিধার সঙ্গে মিলিয়েছে।

এ কারণেই হয়তো সিনেমাটি মুক্তির পর এত দ্রুত দর্শকের কাছে পৌঁছে গেছে। ১ কোটি ৭২ লাখ ভিউ থেকে ৪ কোটি ৫ লাখে পৌঁছানো শুধু একটি সংখ্যার গল্প নয়; এটি দেখায়, বড় বাজেটের অ্যাকশন কিংবা অন্ধকার থ্রিলারের ভিড়েও দর্শক এখনো সহজ প্রেমের গল্পের জন্য জায়গা রাখেন।

পপি আর অ্যালেক্সের গল্প শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো প্রশ্নই সামনে আনে—জীবনে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে দেখা হতে পারে, অসংখ্য জায়গায় যাওয়া হতে পারে; কিন্তু এমন একজন মানুষ কি থাকে, যার সঙ্গে পথচলাটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ভ্রমণ?

আইএমডিবি, ভ্যারাইটি, নেটফ্লিক্সডটকম ও পিপলডটকম অবলম্বনে