
ভারতের অপরাধ ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো শুধু একটি মামলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং পুরো সমাজের মানসিকতায় স্থায়ী ছাপ ফেলে। ১৯৭৮ সালের গীতা ও সঞ্জয় চোপড়া হত্যাকাণ্ড, যা পরবর্তী সময়ে ‘রঙ্গা-বিল্লা কাণ্ড’ নামে পরিচিত হয়, তেমনই একটি ঘটনা। প্রায় অর্ধশতাব্দী পরেও এই ঘটনা মানুষের স্মৃতিতে জীবন্ত। অ্যামাজন প্রাইমের নতুন ওয়েব সিরিজ ‘রাখ’ সেই ভয়াবহ ঘটনাকেই অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেছে।
যে সন্ধ্যা আর স্বাভাবিক থাকেনি
১৯৭৮ সালের ২৬ আগস্ট। দিল্লির ধৌলা কুয়ানে বসবাস করতেন ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মদন মোহন চোপড়া। তাঁর মেয়ে গীতা চোপড়া (১৬) এবং ছেলে সঞ্জয় চোপড়া (১৩) সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে বের হয়েছিল একটি সাধারণ কাজের জন্য।
গীতা তখন দিল্লির জিসাস অ্যান্ড মেরি কলেজের ছাত্রী। সেদিন রাত ৮টায় অল ইন্ডিয়া রেডিওর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘যুববাণী’-তে অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। ভাই সঞ্জয়ও তার সঙ্গে যাচ্ছিল।
সেদিন দিল্লিতে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। পথের একাংশে তারা একটি গাড়িতে লিফট নেয়। গাড়িচালক তাদের গোল ডাকখানার কাছে নামিয়ে দেন। সেখান থেকে অল ইন্ডিয়া রেডিওর দূরত্ব ছিল মাত্র এক কিলোমিটার।
কিন্তু তারা আর কখনো গন্তব্যে পৌঁছায়নি।
রেডিওতে মেয়ের কণ্ঠের বদলে অন্য কারও কণ্ঠ
রাত ৯টার দিকে চোপড়া পরিবার রেডিও খুলে বসে। গীতার কণ্ঠ শোনার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে অন্য একজনের কণ্ঠ ভেসে আসে। উদ্বিগ্ন হয়ে ক্যাপ্টেন চোপড়া নিজেই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, গীতা ও সঞ্জয় কখনোই সেখানে পৌঁছায়নি। এরপর শুরু হয় দুঃস্বপ্ন।
আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব—সব জায়গায় খোঁজ নেওয়া হয়। কোথাও তাদের সন্ধান মেলে না। পুলিশে খবর দেওয়া হয়। দিল্লিজুড়ে শুরু হয় অনুসন্ধান।
দুই দিন পর মিলল লাশ
দুই দিন ধরে কোনো খোঁজ ছিল না। অবশেষে ২৮ আগস্ট দিল্লির উপকণ্ঠের একটি জঙ্গলে গরু চরাতে গিয়ে এক ব্যক্তি দুটি মৃতদেহ দেখতে পান। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডাকা হয় পরিবারকে। সেগুলো ছিল গীতা ও সঞ্জয়ের নিথর দেহ। মুহূর্তেই পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়।
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছিল সঞ্জয়
ময়নাতদন্তে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর তথ্য। ১৩ বছর বয়সী সঞ্জয়ের শরীরে ছিল ২৫টিরও বেশি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। অনেক আঘাত ছিল তার হাতে। তদন্তকারীরা মনে করেন, সে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সঞ্জয় একজন দক্ষ বক্সার ছিল। সেই কারণেই সম্ভবত হামলাকারীরাও গুরুতর আহত হয়েছিল।
অন্যদিকে গীতার শরীরে পাওয়া যায় অসংখ্য ছুরিকাঘাতের চিহ্ন। বুকে, মাথায় এবং হাতে গভীর ক্ষত ছিল। গলার কাছেও ছিল ভয়াবহ আঘাত।
হত্যার নৃশংসতা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দেয়।
যৌন নির্যাতনের প্রশ্ন
ঘটনার পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল গীতার ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ। দেহ উদ্ধারের সময় পচন ধরতে শুরু করায় চিকিৎসকেরা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেননি। তবে তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তরা একপর্যায়ে নির্যাতনের কথা স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করে।
ফলে বিষয়টি আজও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে।
কীভাবে ধরা পড়ল খুনি?
তদন্তকারীরা পরে জানতে পারেন, গীতা ও সঞ্জয় তাদের অপহরণকারীদের সঙ্গে তীব্র লড়াই করেছিল। সংঘর্ষে হামলাকারীরা আহত হয় এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে বাধ্য হয়। সেখান থেকেই তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পান। পুলিশের নজরে আসে দুই পলাতক অপরাধীর নাম—কুলজিৎ সিং ওরফে রঙ্গা ও জসবীর সিং ওরফে বিল্লা। ট্রেনে ধরা পড়ার নাটকীয় ঘটনাহত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই সপ্তাহ পর, ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে, রঙ্গা ও বিল্লা আগ্রা থেকে কালকা মেইল ট্রেনে ওঠে।
ভুল করে তারা সেনাসদস্যদের জন্য সংরক্ষিত একটি কামরায় প্রবেশ করে।সেখানে দায়িত্বে থাকা সেনাসদস্য গুরতেজ সিং ও এ ভি শেট্টি তাদের পরিচয়পত্র দেখতে চান। আচরণে অসংগতি দেখে তাঁদের সন্দেহ হয়।কাকতালীয়ভাবে গুরতেজ সিংয়ের কাছে সেদিন একটি হিন্দি সংবাদপত্র ছিল, যেখানে ‘ওয়ান্টেড’ হিসেবে রঙ্গার ছবি ছাপা হয়েছিল।
ছবির সঙ্গে মুখের মিল দেখে সেনাসদস্যরা আরও সতর্ক হন। ট্রেন দিল্লিতে পৌঁছানোর পর দুজনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় অস্ত্র, রক্তমাখা পোশাক এবং অন্যান্য আলামত।
বিচার ও মৃত্যুদণ্ড
গ্রেপ্তারের পর রঙ্গা ও বিল্লার বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার মামলা হয়। দিল্লির আদালত তাদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে দিল্লি হাইকোর্টেও সেই রায় বহাল থাকে। একাধিক আপিল ও আইনি লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তিহার জেলের ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত ফাঁসিগুলোর একটি।
কেন পুরো ভারত কেঁপে উঠেছিল?
সত্তরের দশকের ভারত আজকের ভারতের মতো ছিল না। তখন শিশু-কিশোরেরা একা চলাফেরা করত। অপরিচিত কারও গাড়িতে লিফট নেওয়াও অস্বাভাবিক কিছু মনে করা হতো না। গীতা ও সঞ্জয়ের হত্যাকাণ্ড সেই বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়। ভারতজুড়ে অভিভাবকদের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের নিরাপত্তা, পুলিশি ব্যবস্থা এবং অপরাধ দমনের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।অনেকের মতে, এই ঘটনাই ভারতে শিশুনিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতার বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
‘রাখ’ সিরিজ কেন আলোচনায়?নতুন সিরিজ ‘রাখ’ সরাসরি এই মামলার পুনর্নির্মাণ নয়। তবে এর কাহিনির অনুপ্রেরণা এসেছে গীতা-সঞ্জয় চোপড়া হত্যাকাণ্ড থেকে। নির্মাতারা সেই সময়ের সামাজিক পরিবেশ, ভয়, অসহায়তা এবং বিচার পাওয়ার দীর্ঘ লড়াইকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।ক্রাইম থ্রিলার সিরিজটিতে অভিনয় করেছেন আলী ফজল, সোনালি বেন্দ্রে, রামদীপ যাদব, আমির বশির। এটি পরিচালনা করেছেন প্রসিত রয়।
এনডটিভি অবলম্বনে