নতুন প্রজন্মের প্রেমের গল্পে কি যৌনতার জায়গা দখল করছে খেলাধুলা? নেটফ্লিক্সের নতুন টিন ড্রামা ‘ক্রু গার্ল’–এর জনপ্রিয়তা এবং সাম্প্রতিক আরও কিছু রোমান্টিক সিরিজের দিকে তাকালে এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। এসব গল্পে প্রেম আছে, আকর্ষণ আছে, শরীরী টানও আছে; কিন্তু তা প্রকাশ পাচ্ছে নৌকাবাইচ, হকি, রাগবি, আইস ড্যান্সিং, সাঁতার কিংবা প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার মধ্য দিয়ে।
প্রেমিক-প্রেমিকার ঘনিষ্ঠতা দেখাতে এখন আর সব সময় চুম্বন বা যৌন দৃশ্যের প্রয়োজন হচ্ছে না। একই দলে খেলা, একসঙ্গে অনুশীলন করা, প্রতিযোগিতার চাপ ভাগ করে নেওয়া, কিংবা কোনো হ্রদের ধারে পাশাপাশি বসে থাকাও হয়ে উঠছে প্রেমের ভাষা। বিশেষ করে জেন–জি দর্শকদের জন্য তৈরি সিরিজে এই পরিবর্তনটি বেশ স্পষ্ট।
‘ক্রু গার্ল’–এর গল্পে প্রেম, অর্থ আর নৌকাবাইচ
নেটফ্লিক্সের ‘ক্রু গার্ল’–এর কেন্দ্রীয় চরিত্র ১৬ বছর বয়সী টিগান তাও। সে একা নৌকাবাইচে অংশ নেওয়া চ্যাম্পিয়ন। খেলাটির প্রতি তার নিষ্ঠা প্রবল। কিন্তু হোটেল ব্যবসায়ী বাবা আর্থিক অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে গেলে টিগানের জীবন একমুহূর্তে বদলে যায়।
মা এলাকে সঙ্গে নিয়ে তাকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলে যেতে হয়। নতুন ঠিকানা নিউ ইংল্যান্ডের একটি পুরোনো, প্রায় ভেঙে পড়া বাড়ি। পরিচিত জীবন, বন্ধু, স্কুল—সবকিছু পেছনে ফেলে নতুন জায়গায় শুরু করতে হয় টিগানকে।
বাবার তৈরি একটি শিক্ষা ট্রাস্টের সহায়তায় টিগান ভর্তি হয় ইস্টন প্রেপ স্কুলে। কিন্তু সেখানে মেয়েদের কোনো নৌকাবাইচ দল নেই। ফলে নিজের পছন্দের খেলাটি চালিয়ে যেতে তাকে ছেলেদের দলে যোগ দিতে হয়। দলের মূল খেলোয়াড় না হয়ে সে ‘কক্সওয়েন’ হিসেবে কাজ করে—নৌকায় বসে অন্যদের গতি, ছন্দ ও সমন্বয় ঠিক রাখার দায়িত্ব নেয়।
নতুন স্কুলে টিগানের সামনে শুধু খেলাধুলার চ্যালেঞ্জ নয়, তৈরি হয় প্রেমের জটিলতাও। দলের দুই ছেলের প্রতি তার আকর্ষণ তৈরি হয়। একজন ক্যাম ডিলিংগার। সে ছোট শহরের শ্রমজীবী পরিবারের ছেলে। শান্ত, ভদ্র ও সহানুভূতিশীল ক্যাম টিগানের প্রতি আন্তরিক। অন্যদিকে জশ রেজিস ধনী পরিবারের সন্তান। সে দাম্ভিক, উচ্ছৃঙ্খল এবং নিজের অবস্থান নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী।
জশের পরিবার বিমান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। নিজের চাচাতো ভাই রাইডারের সঙ্গে পারিবারিক উত্তরাধিকার নিয়ে তার প্রতিযোগিতা চলছে। ফলে জশের ব্যক্তিগত জীবনেও প্রেম, অর্থ ও পারিবারিক ক্ষমতার লড়াই একসঙ্গে কাজ করে।
টিগানের গল্পের বাইরে সিরিজে আরও কিছু সম্পর্কের রেখা আছে। নৌকাবাইচ দলের সদস্য বালু গোপনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের এক ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে টিগানের মা এলার জীবনেও তৈরি হয় আলাদা এক প্রেমের গল্প। পুরোনো এক বন্ধুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছায়, যেখানে দর্শক ভাবতে থাকেন—তাঁরা কি শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে হবেন?
‘ক্রু গার্ল’ শুধু কিশোর-কিশোরীদের প্রেমের গল্প নয়। এখানে আছে পারিবারিক সংকট, শ্রেণিগত পার্থক্য, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্বসহ অনেক কিছুই।
পরিচিত গল্প
‘ক্রু গার্ল’–এর গল্পে নতুনত্ব খুব বেশি নেই। ত্রিভুজ প্রেম, ছোট শহর, নতুন স্কুলে আসা, ধনী ও সাধারণ পরিবারের ছেলেদের মধ্যে পার্থক্য—এসব টিন ড্রামার পরিচিত উপাদান। টিগান একই সঙ্গে বহিরাগত এবং প্রতিভাবান। নতুন জায়গায় তাকে নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়। এই পথেই প্রেম, বন্ধুত্ব ও প্রতিযোগিতা একসঙ্গে এগোয়।
সমালোচকেরা সিরিজটির এই পরিচিত কাঠামো নিয়ে একমত হলেও খেলাধুলার ধরনটিকে কিছুটা নতুন সংযোজন হিসেবে দেখেছেন। এত দিন টিন স্পোর্টস রোমান্সে হকি, বাস্কেটবল বা ফুটবল বেশি দেখা গেলেও ক্রু গার্ল বেছে নিয়েছে নৌকাবাইচকে।
ডিসাইডারের সমালোচনায় বলা হয়েছে, সিরিজটি হকির বদলে নৌকাবাইচকে সামনে এনেছে। গল্পে পুরোনো ত্রিভুজ প্রেম, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও স্কুলজীবনের নানা পরিচিত উপাদান থাকলেও নৌকাবাইচের মতো তুলনামূলক কম ব্যবহৃত একটি খেলাকে কেন্দ্রীয় জায়গায় বসানো সিরিজটির আলাদা বৈশিষ্ট্য। সমালোচকের মতে, মিকু মার্তিনোর অভিনয়ে টিগান চরিত্রটি প্রাণবন্ত হয়েছে।
তবে সবাই এতটা প্রশংসা করেননি। ভ্যারাইটির সমালোচনায় বলা হয়েছে, ‘ক্রু গার্ল’ দেখতে সুন্দর হলেও বাস্তবতার অভাব, খাপছাড়া সংলাপ এবং একই ধরনের বিষয় বারবার ফিরে আসায় সিরিজটি শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে রটেন টমেটোজ–এ প্রকাশিত সমালোচনাগুলোতে সিরিজটির পরিচিত গল্পের মধ্যেও আকর্ষণ খুঁজে পাওয়া গেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ক্রু গার্ল’ নতুন কিছু যোগ না করলেও পরিচিত গল্পকে রোমান্টিক টান ও নৌকাবাইচের রোমাঞ্চ দিয়ে এগিয়ে নেয়।
সিরিজটির প্রধান অভিনেত্রী মিকু মার্তিনোও গল্পের এই মিশ্রণ নিয়ে কথা বলেছেন। নেটফ্লিক্সের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, কৈশোরের সময়টা যেমন অগোছাল, তেমনই সুন্দর। বন্ধুত্ব, প্রেম, পরিবার—সবকিছু একসঙ্গে সামলানোর অভিজ্ঞতাই সিরিজটির মূল বিষয়।
মার্তিনোর মতে, ‘ক্রু গার্ল’ শুধু কিশোর দর্শকদের জন্য নয়; ত্রিশ, চল্লিশ বা তার বেশি বয়সী দর্শকেরাও এতে নিজেদের কৈশোরের স্মৃতি খুঁজে পেতে পারেন। তাঁর কাছে এটি মূলত বড় হয়ে ওঠার গল্প—যেখানে প্রেমের পাশাপাশি পরিবার, বন্ধুত্ব ও নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার বিষয়ও আছে।
সিরিজটির নির্মাতা ভিভিয়ান লিন। গল্পে টিগানকে এমন এক জগতে রাখা হয়েছে, যেখানে তাকে প্রথমে ‘বাইরের মানুষ’ হিসেবে দেখা হয়। ছেলেদের দলে জায়গা করে নিতে তাকে শুধু নিজের ক্রীড়া দক্ষতা প্রমাণ করলেই হয় না; তাকে দলের সদস্যদের আস্থা অর্জন করতে হয়। এই জায়গায় খেলাধুলা হয়ে ওঠে মেয়েটির আত্মপরিচয় তৈরির পথ।
ত্রিভুজ প্রেমের পুরোনো ছক
টিগানের প্রেমের গল্পে ক্যাম ও জশ দুই বিপরীত মেরুর মানুষ। ক্যাম সাধারণ পরিবারের ছেলে। তার মধ্যে আছে নির্ভরতা ও আন্তরিকতা। জশের আছে অর্থ, সামাজিক ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়, পারিবারিক চাপ ও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা।
এ ধরনের চরিত্র টিন রোমান্সে নতুন নয়। একদিকে থাকে নিরাপদ ও ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক, অন্যদিকে থাকে বিপজ্জনক কিন্তু তীব্র আকর্ষণ। দর্শককে ভাবতে হয়, নায়িকা কাকে বেছে নেবে—যে তাকে বুঝতে পারে, নাকি যে তাকে চ্যালেঞ্জ করে?
‘ক্রু গার্ল’–এ এই দ্বন্দ্বকে আরও জটিল করেছে খেলাধুলা। কারণ ক্যাম ও জশ শুধু প্রেমের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, একই দলের খেলোয়াড়ও। ফলে মাঠের প্রতিযোগিতা ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে মিশে যায়। একজনের সাফল্য অন্যজনের ব্যর্থতা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আবার দলের স্বার্থে তাদের একসঙ্গে কাজ করতেও হয়।
টিন রোমান্সে খেলাধুলা এত গুরুত্ব কেন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তরুণ দর্শকদের জন্য তৈরি প্রেমের সিরিজে খেলাধুলার উপস্থিতি বেড়েছে। ‘অফ ক্যাম্পাস’ ও ‘হিটেড রাইভালরি’–তে হকি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে খেলোয়াড়দের সংঘর্ষ, লকাররুম, প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতা প্রেমের আবহ তৈরি করে। ‘ফাইন্ডিং হার এজ’–এ আইস ড্যান্সিং, ‘হার্টস্টপার’–এ রাগবি এবং ‘ক্রু গার্ল’–এ নৌকাবাইচ একই কাজ করছে।
খেলাধুলা এখানে শুধু আকর্ষণীয় শরীর দেখানোর উপায় নয়। একজন খেলোয়াড় যখন অন্যজনের সঙ্গে একই লক্ষ্য পূরণের জন্য কাজ করে, তখন তাদের মধ্যে অন্য ধরনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তারা একসঙ্গে ক্লান্ত হয়, ব্যর্থ হয়, আবার উঠে দাঁড়ায়। একে অপরের শরীরের শক্তি, দুর্বলতা ও সীমা সম্পর্কে জানতে পারে। এই অভিজ্ঞতা প্রেমের গল্পকে আরও গভীর করে।
প্রকৃতির কাছে ফিরে আসা
সাম্প্রতিক টিন রোমান্সে শুধু খেলাধুলা নয়, প্রকৃতির উপস্থিতিও বেড়েছে। হ্রদ, নদী, নৌকা, ঘাট, সাঁতার, রোদে শুয়ে থাকা কিংবা গ্রীষ্মকালীন বাড়ি—এসব দৃশ্য বারবার ফিরে আসে।
‘এভরি ইয়ার আফটার’ ও ‘স্টার্লিং পয়েন্ট’–এর মতো গল্পে প্রকৃতি শুধু পটভূমি নয়; সম্পর্ক তৈরির জায়গা। চরিত্রগুলো অনেক সময় মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। ফলে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ফোন ও অনলাইন জীবনের বাইরে গিয়ে পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে।
এই বিচ্ছিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জেন–জি প্রজন্মের বড় একটি অংশ এমন সময়ে বড় হয়েছে, যখন সম্পর্কের বড় অংশই অনলাইনে তৈরি ও পরিচালিত হয়। ফলে নতুন গল্পগুলোতে বাস্তব জায়গা, শরীর ও স্পর্শের ওপর জোর দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
কোনো হ্রদের ধারে বসে থাকা, একসঙ্গে সাঁতার কাটা কিংবা অনুশীলনের পর ক্লান্ত শরীরে পাশাপাশি শুয়ে থাকা—এসব দৃশ্যে সরাসরি যৌনতা নেই। কিন্তু সেখানে শরীরী আকর্ষণ, লজ্জা, কৌতূহল ও ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি থাকে।
যৌনতার বদলে ‘নিরাপদ’ ঘনিষ্ঠতা
এই পরিবর্তনের পেছনে জেন–জি দর্শকদের যৌনতা নিয়ে দ্বিধা কাজ করছে বলে মনে করছেন অনেকে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা ও আলোচনায় বলা হয়েছে, তরুণ প্রজন্ম পর্দায় যৌন দৃশ্য নিয়ে আগের তুলনায় বেশি অস্বস্তিবোধ করছে। বাস্তব জীবনেও তরুণদের যৌন সম্পর্কে জড়ানোর হার কমেছে—যে প্রবণতাকে অনেক সময় ‘সেক্স রিসেশন’ বলা হয়।
এর পেছনে অতিরিক্ত অনলাইননির্ভর জীবন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ এবং কোভিড-১৯ মহামারির দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার প্রভাব থাকতে পারে। তবে এর মানে এই নয় যে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা বা যৌন অনুভূতি কমে গেছে। বরং যৌনতা নিয়ে লজ্জা, উদ্বেগ ও অস্বস্তি বেড়েছে।
তাই টিন রোমান্সে এমন কিছু দৃশ্যের প্রয়োজন হচ্ছে, যা সরাসরি যৌনতার দিকে না গিয়েও শরীরী ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি তৈরি করে। সাঁতারের পোশাক, ঘামে ভেজা শরীর, নৌকাবাইচের মেশিন, লকাররুম কিংবা পাশাপাশি অনুশীলন করা সেই মধ্যবর্তী জায়গা তৈরি করছে।
খেলাধুলা যেন একধরনের নিরাপদ অজুহাত। চরিত্রগুলো একে অন্যের শরীরের কাছাকাছি আসে, কিন্তু সেটিকে সরাসরি যৌন আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখানো হয় না। তারা দৌড়ায়, পড়ে যায়, আবার উঠে দাঁড়ায়। একে অন্যকে প্রতিযোগিতায় জিততে সাহায্য করে। শারীরিক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় আস্থা ও আকর্ষণ।
প্রেমের গল্পে যৌনতা থাকতেই পারে। কিন্তু ঘনিষ্ঠতার একমাত্র ভাষা যৌনতা নয়।সাম্প্রতিক সময়ে ‘যৌনতা এড়িয়ে চলা’ সিরিজগুলোর মতো ‘ক্রু গার্ল’ও সে পথই বেছে নিয়েছে।
টাইমস অবলম্বনে