
নেটফ্লিক্সে প্রতি সপ্তাহেই মুক্তি পায় নানা স্বাদের সিরিজ, সিনেমা। সেগুলোর মধ্যে দেশি দর্শকেরা কী দেখছেন? চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে হিন্দি সিনেমা, সিরিজ ও রিয়েলিটি শো। এ ছাড়া দর্শকেরা দেখছেন কোরীয় সিরিজও। নেটফ্লিক্সে বাংলাদেশের টপ চার্টের সেরা পাঁচ সিনেমা ও সিরিজ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
সিনেমা
‘কন সিটি’
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা নিয়ে দেশের দর্শকের সব সময়ই আগ্রহ দেখা যায়। চলতি সপ্তাহে নেটফ্লিক্সের সিনেমার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে শীর্ষ রয়েছে তামিল ক্রাইম কমেডি সিনেমা ‘কন সিটি’। হরিশ দুরাইরাজের প্রথম সিনেমাটি গত ২৫ জুন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। এবার এসেছে ওটিটিতে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন অর্জুন দাস, আনা বেন, যোগী বাবু ও ভাদিভুক্কারাসি।
প্রতারক বা ‘কন আর্টিস্ট’দের গল্প সিনেমায় বরাবরই দর্শকদের টানে। কারণ, এখানে নায়ক সাধারণত আইনভঙ্গকারী হলেও দর্শক চায় সে যেন শেষ পর্যন্ত সফল হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুলকার সালমানের কিছু ছবির জনপ্রিয়তা তারই প্রমাণ। সেই ধারা মেনেই হয়তো ওটিটিতে মুক্তির পর জনপ্রিয়তা পেয়েছে সিনেমাটি।
শুরুতে ছবিটি একদল পরিস্থিতির শিকার মানুষের প্রতারণার গল্প নিয়ে এগিয়েছে। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র সারাভানন (অর্জুন দাস), মিত্রা (আনা বেন), জ্যাকি (যোগী বাবু) এবং জ্যাকির মা জানকি (ভাদিভুক্কারাসি)। কর্ণাটকের মুলকিতে তারা একটি ছোট হোটেল চালিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবারের মতো বসবাস করে। কিন্তু বাস্তবে তারা কেউই রক্তের সম্পর্কের নয়। সবাই চেন্নাই থেকে পালিয়ে আসা অপরাধী।
সারাভানন বিদ্যুৎ বিভাগে চাকরি করার সময় আর্থিক সংকটে জড়িয়ে প্রতারণা করেন। মিত্রা ভুয়া ভাড়া ব্যবস্থাপনা সংস্থা চালিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করেন। অন্যদিকে জ্যাকি ও তাঁর মা একটি ট্রাস্টের আড়ালে অর্থ লেনদেনের কারসাজিতে জড়িয়ে পড়েন। সমাজের চাপে, অর্থকষ্টে কিংবা বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁরা অপরাধের পথে হাঁটলেও পরে একে অপরের মধ্যে নতুন এক পরিবারের সন্ধান খুঁজে পান।
সাত বছর ধরে তাঁরা আত্মগোপনে থাকলেও সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায়, যখন সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তা মিত্রার ছেলে জীবাকে অপহরণ করেন। ছেলেটিকে উদ্ধার করতে এ দলটিকে আরেকটি বড় প্রতারণার পরিকল্পনা করতে হয়। এরপর কী হয়, তা নিয়েই এগিয়েছে গল্প।
‘ইক্কা’
তালিকার দুইয়ে রয়েটে কোর্টরুমা ড্রামা ‘ইক্কা’। মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি দেশের দর্শকের মধ্যে সাড়া ফেলেছে, টানা দুই সপ্তাহ ছিল নেটফ্লিক্সের টপ চার্টের শীর্ষে। গল্পের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন অর্জুন মেহরা (সানি দেওল), যিনি এমন একজন স্বনামধন্য ও নীতিমান আইনজীবী। তবে তিনি কেবল নির্দোষদের পক্ষেই আদালতে লড়েন। অর্জুন মেহরা নিজের নাম থেকে বেশি পরিচিত ‘ইক্কা’ নামে। কারণ, সবাই বলে থাকে, আদালতে কেসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো সব সময় তাঁর পকেটে একটি ‘ইক্কা’ অর্থাৎ টেক্কা থাকে।
অন্যদিকে শৌর্যমান গৌর (অক্ষয় খান্না) হলেন একজন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও ধনকুবেরের ছেলে। তাঁর বিরুদ্ধে এক তরুণীকে নিপীড়ন ও হত্যাচেষ্টার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। নীতিগত কারণে অর্জুন প্রথমে শৌর্যমান গৌরের কেস লড়তে চান না। কিন্তু এমন সময় অর্জুন মেহরার ব্যক্তিগত জীবনে আসে এমন এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা যে আদর্শকে বলি দিয়ে শৌর্যমানের পক্ষে কেস লড়তে হয় তাঁকে। নিজের পরিবারকে বাঁচাতে অর্জুন কি নিজের নৈতিকতাকে বলি দেন? নাকি ঘটনা মোড় নেয় অন্যদিকে? এমন একটি গল্পের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ‘ইক্কা’ সিনেমাটি।
‘পেড্ডি’
তালিকার তিনে রয়েছে রাম চরণ ও জাহ্নবী কাপুর অভিনীত সিনেমাটি। ‘আরআরআর’–এর পর থেকে অভিনেতার জনপ্রিয়তা উপমহাদেশে বেড়েছে। সে কারণেই তাঁর নতুন সিনেমা নিয়ে আগ্রহ থাকে দর্শকের। এ ছাড়া মুক্তির পর নানা বিতর্কের কারণেও ‘পেড্ডি’ নিয়ে দর্শকের আগ্রহ ছিল। নেটফ্লিক্সের তালিকায় তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
ছবির গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক গ্রাম, যার কোনো সরকারি স্বীকৃতি নেই। ভোটার কার্ড নেই, ঠিকানা নেই, সরকারি নথিতে অস্তিত্বও নেই। এমনই এক নামহীন গ্রামের বাসিন্দা পেড্ডি, যার চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাম চরণ। অসাধারণ ক্রীড়া প্রতিভার অধিকারী এই যুবক বিভিন্ন স্থানীয় দলের হয়ে খেলাধুলা করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু নিজের প্রতিভাকে ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়, গ্রামের পরিচয়ের লড়াইয়ের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্তই গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এই স্পোর্টস ড্রামা ছবিটি পরিচালনা করেছেন বুচি বাবু সানা।
‘ডেমন স্লেয়ার: কিমেতসু নো ইয়াইবা ১’
একসময় জাপানি অ্যানিমে ছিল মূলত নির্দিষ্ট একদল দর্শকের আগ্রহের বিষয়। কিন্তু গত এক দশকে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন অ্যানিমে শুধু জাপানের নয়, বৈশ্বিক বিনোদনশিল্পের অন্যতম শক্তিশালী ধারা। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকা নামগুলোর একটি ‘ডেমন স্লেয়ার: কিমেতসু নো ইয়াইবা’। ২০২০ সালে মুগেন ট্রেন যেভাবে বিশ্বজুড়ে বক্স অফিসে বিস্ময় তৈরি করেছিল, ছয় বছর পর সেই ইতিহাস নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে এ সিনেমাটি। নেটফ্লিক্সের বাংলাদেশের তালিকায় সিনেমাটি রয়েছে চারে।
জাপানে মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটি শুধু আয় নয়, দর্শকের উচ্ছ্বাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা এবং সমালোচকদের প্রশংসায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। অনেকের মতে, এটি শুধু একটি অ্যানিমে চলচ্চিত্র নয়; বরং কয়েক বছর ধরে নির্মিত একটি বিশাল গল্পের আবেগঘন পরিণতির শুরু।
২০১৯ সালে টেলিভিশন সিরিজ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ‘ডেমন স্লেয়ার’। কোয়োহারু গোতোগের একই নামের জনপ্রিয় মাঙ্গা অবলম্বনে নির্মিত এই সিরিজ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তানজিরো কামাদো। পরিবারের সবাই দানবের হাতে নিহত হওয়ার পর বেঁচে থাকে শুধু তার ছোট বোন নেজুকো, যে নিজেও দানবে পরিণত হয়। কিন্তু অন্য দানবদের মতো মানুষের ওপর আক্রমণ না করে নেজুকো নিজের মানবিকতা ধরে রাখে। বোনকে আবার মানুষে ফিরিয়ে আনা এবং দানবদের রাজা মুজান কিবুতসুজিকে পরাজিত করাই হয়ে ওঠে তানজিরোর জীবনের লক্ষ্য।
এই যাত্রায় দর্শক পরিচিত হয় অসংখ্য চরিত্রের সঙ্গে—জেনিতসু, ইনোসুকে, শিনোবু, গিয়ু, রেঙ্গোকু এবং হাশিরা বাহিনীর অন্য সদস্যরা। প্রতিটি চরিত্রের নিজস্ব গল্প, বেদনা এবং আত্মত্যাগ ডেমন স্লেয়ার–কে শুধু অ্যাকশন সিরিজ নয়, একটি আবেগঘন মানবিক কাহিনিতে পরিণত করেছে।
এই সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি এর নির্মাণশৈলী। প্রতিটি যুদ্ধ যেন চলমান চিত্রকর্ম। তরবারির আঘাত, আগুন, পানি, বজ্র কিংবা বিভিন্ন ‘ব্রিদিং টেকনিক’-এর ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা এতটাই নিখুঁত যে অনেক সময় মনে হয় দর্শক কোনো অ্যানিমেশন নয়, বরং জীবন্ত শিল্পকর্ম দেখছেন।
মুক্তির পর থেকেই জাপানের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে দর্শকের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। শুধু জাপান নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও ছবিটির জন্য অগ্রিম টিকিট বিক্রি, বিশেষ প্রদর্শনী ও আইম্যাক্স শোর চাহিদা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্লেষকদের মতে, এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় অ্যানিমে ইভেন্টগুলোর একটি।
‘গাট্টা কুস্তি ২’
তালিকার পাঁচে রয়েছে আরেকটি তামিল স্পোর্টস কমেডি সিনেমা। ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গাট্টা কুস্তি’ ছিল বক্স অফিসে সফল একটি তামিল ছবি। বিষ্ণু বিশাল ও ঐশ্বর্য লক্ষ্মীর জুটি দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছিল, ওটিটিতে মুক্তির পর ছবিটির জনপ্রিয়তাও আরও বেড়ে যায়। তবে ছবিটি নিয়ে একটি বড় বিতর্কও ছিল। নিজেকে নারীবান্ধব চলচ্চিত্র হিসেবে তুলে ধরলেও শেষ পর্যন্ত গল্পের মোড় অনেকের কাছে রক্ষণশীল ও নারীবিদ্বেষী বলে মনে হয়েছিল।
চার বছর পর সেই গল্পেরই ধারাবাহিকতা নিয়ে এসেছে ‘গাট্টা কুস্তি ২’। প্রথম ছবির ভীরা ছিলেন পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতীক। স্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করাই যেন ছিল তাঁর পুরুষত্বের প্রমাণ। দ্বিতীয় ছবিতে সেই ভীরাকেই একেবারে ভিন্ন রূপে দেখা যায়।
এবার তিনি সংসার সামলান, মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেন, স্ত্রীর কুস্তি প্রতিযোগিতায় পানীয় নিয়ে পাশে দাঁড়ান এবং পাড়ার গৃহিণীদের অ্যারোবিকস শেখান। অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ের কুস্তিগির হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে এগিয়ে চলেছেন তাঁর স্ত্রী কীর্থি। ভূমিকা বদলে যাওয়ার এই সিদ্ধান্তই ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক।
কারণ, পরিচালক দেখাতে চেয়েছেন, সমাজে নারীর মতো একজন গৃহকর্মে ব্যস্ত পুরুষকেও কীভাবে প্রতিনিয়ত বিচার করা হয়। ছবির অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো গৃহস্বামী ভীরাকে ঘিরে সমাজের প্রতিক্রিয়া। প্রতিবেশীদের কাছে তিনি হাস্যরসের বিষয়। অন্যান্য পুরুষ মনে করেন, ভীরার জীবনযাপন তাদের পুরুষত্বের জন্য হুমকি। স্কুলে মেয়েও বাবার পরিচয়ের কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। এমনকি আত্মীয়দের সঙ্গেও ভীরার সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়।
পরিচালক এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—সংসার সামলানো কি শুধু নারীর দায়িত্ব? একজন পুরুষ একই কাজ করলে সমাজ কেন তাকে ছোট করে দেখে?
সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন বিষ্ণু বিশাল ও ঐশ্বর্য লক্ষ্মী।
সিরিজ
‘মুসাফির ক্যাফে’
মুক্তির পর থেকেই বাংলাদেশের দর্শকদের মধ্যে আলোচনায় সিরিজটি। দুই সপ্তাহ পরই এটি রয়েছে নেটফ্লিক্সের সিরিজের তালিকার শীর্ষে। এটি পুরোপুরি রোমান্টিক ঘরানার, শেষ কবে রোমান্টিক ঘরানার সিরিজ নিয়ে এত চর্চা হয়েছে, মনে করা মুশকিল। ‘মুসাফির ক্যাফে’–এর মূল সুর অসমাপ্ত প্রেমের গল্প। উপমহাদেশে আবেগপ্রবণ দর্শকের নিজের জীবনে এমন গল্পের অভাব নেই, এমন সিরিজ যে তাঁদের নস্টালজিয়া উসকে দিয়েছে!
গল্পের শুরুতেই চন্দরকে (বিক্রান্ত ম্যাসি) দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের সফটওয়্যার কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসতে। চাকরি করলেও তার স্বপ্ন পাহাড়ে নিজের একটি ক্যাফে খোলা। এ সময় তার জীবনে আসে প্রাণবন্ত ও আত্মবিশ্বাসী আইনজীবী সুধা (বেদিকা পিন্টো)। দুজনের সম্পর্ক দ্রুত গভীর হয়। কিন্তু জীবনের লক্ষ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাতে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। সময়ের ব্যবধানে চন্দরের জীবনে আসে শান্ত ও সংবেদনশীল প্রীতি (মহিমা মাকওয়ানা)। অতীতের ভালোবাসা আর বর্তমানের সম্ভাবনার টানাপোড়েনই সিরিজের মূল চালিকা শক্তি। আলোচিত সিরিজটির পরিচালক রুচির অরুণ।
‘লক–আপ’
তালিকার দুইয়ে রয়েছে আলোচিত–সমালোচিত এই রিয়েলিটি শো। রিয়েলিটি শো মানেই যেন বিতর্ক। কিন্তু সেই বিতর্ক যখন অনুষ্ঠানকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম ও দর্শকের প্রতিদিনের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তখন সেটি কেবল একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান থাকে না—পরিণত হয় সাংস্কৃতিক আলোচনার বিষয়েও। নেটফ্লিক্সে সম্প্রচারিত ‘লক আপ: সাচ ইয়া সাজা’র দ্বিতীয় মৌসুম ঠিক সেই অবস্থানেই পৌঁছেছে।
মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অনুষ্ঠানটি কোটি কোটি ঘণ্টা দেখা হয়েছে। নেটফ্লিক্সের তথ্যমতে, মুক্তির পর অল্প সময়েই এটি ৫ কোটি ঘণ্টার বেশি দেখা হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি করেছে প্রায় ২৫০ কোটি ইন্টারঅ্যাকশন। সংখ্যাগুলো শুধু জনপ্রিয়তারই নয়, বিতর্কেরও সাক্ষ্য দেয়। কারণ, এই মৌসুমে যতটা আলোচনা হয়েছে প্রতিযোগিতা নিয়ে, তার চেয়ে কম নয় ব্যক্তিগত সম্পর্ক, অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, ঝগড়া, অশালীন ভাষা ও বেফাঁস মন্তব্য নিয়ে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ফারাহ খান ও রিতেশ দেশমুখ।
গত বুধবার রাতে এবারের মৌসুমের গ্র্যান্ড ফিনালে হয়েছে। এতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন শ্রেয়া কালরা।
‘দ্য ইস্ট প্যালেস’
কোরীয় এই লিমিটেড সিরিজটি রয়েছে তালিকার তিনে। একসময় কোরিয়ান ড্রামা মানেই ছিল হৃদয়ছোঁয়া প্রেমের গল্প কিংবা পারিবারিক আবেগ। পরে সেই ধারা বদলে দেয় ‘কিংডম’, ‘স্কুইড গেম’, ‘হেলবাউন্ড’ কিংবা ‘মুভিং’-এর মতো সিরিজ। এবার সেই তালিকায় যোগ হয়েছে নতুন নাম—‘দ্য ইস্ট প্যালেস’।
নেটফ্লিক্সের এই ডার্ক ফ্যান্টাসি সিরিজ মুক্তির পর থেকেই শুধু দক্ষিণ কোরিয়ায় নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দর্শকের নজর কেড়েছে। বাংলাদেশেও ফেসবুকের কোরিয়ান ড্রামা গ্রুপ, সিনেমাপ্রেমীদের কমিউনিটি এবং ওটিটি দর্শকদের আলোচনায় বারবার উঠে আসছে সিরিজটির নাম। অনেকে এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে চমকপ্রদ কোরিয়ান ফ্যান্টাসি সিরিজ বলছেন। ‘দ্য ইস্ট প্যালেস’–এর গল্প শুরু হয় জোসন যুগকে ঘিরে নির্মিত এক কাল্পনিক রাজ্যে।
রাজপরিবারে একের পর এক রহস্যময় মৃত্যু ঘটতে থাকে। রাজপুত্রদের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে এক অভিশপ্ত আত্মা। রাজা বুঝতে পারেন, এটি সাধারণ কোনো ষড়যন্ত্র নয়। এর পেছনে রয়েছে বহু বছরের অন্ধকার ইতিহাস এবং অতিপ্রাকৃত শক্তি। এই রহস্য সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন স্বভাবের মানুষকে।
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে কোরিয়ান কনটেন্টের দর্শক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ‘স্কুইড গেম’, ‘কিংডম’, ‘কুইন অব টিয়ার্স’ কিংবা ‘হোয়েন লাইফ গিভস ইউ ট্যানজারিনস’–এর পর নতুন সিরিজের জন্য দর্শকদের আগ্রহ আগেই তৈরি হয়েছিল। ‘দ্য ইস্ট প্যালেস’ সেই আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকটি কারণে। রহস্য ও ফ্যান্টাসির প্রতি যাঁদের ঝোঁক, তাঁদের জন্য এটি একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। বিশাল রাজপ্রাসাদ, অতিপ্রাকৃত জগৎ, দানব, আগুন, ছায়া আর অভিশাপ—সব মিলিয়ে প্রতিটি পর্ব সিনেমার মতো অনুভূতি দেয়। মাত্র আট পর্বের হওয়ায় গল্পে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা নেই। শুরু থেকেই রহস্য তৈরি হয়, আর প্রতিটি পর্ব শেষে দর্শকের মনে নতুন প্রশ্ন জাগে।
চোই–জুং কোই পরিচালিত সিরিজটিতে অভিনয় করেছেন নাম জু–হেউক, রোহ ইয়ুন–সেও ও চো সেউং–উ।
‘এজেন্ট কিম রিঅ্যাকটিভেটেড’
তালিকার তিনে রয়েছে কোরীয় অ্যাকশন থ্রিলার সিরিজটি। গত ২৬ জুন মুক্তি পাওয়া পাঁচ পর্বের সিরজিটি পরিচালনা করেছেন লি সিওয়ং-ইয়ং ও লি সো-ইয়ুন। অভিনয় করেছেন সো জি-সাব, চোই ডায়ে-হুন প্রমুখ।
সিরিজের কেন্দ্রীয় চরিত্র কিম দো-হিয়ন। বাইরে থেকে তিনি একজন সাধারণ কোম্পানি ম্যানেজার ও একক বাবা। কিন্তু তাঁর অতীত সম্পূর্ণ ভিন্ন—তিনি একসময় উত্তর কোরিয়ার ব্ল্যাক-অপস ইউনিটের সদস্য ছিলেন, পরে দ্বৈত গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেন এবং নতুন পরিচয়ে স্বাভাবিক জীবন শুরু করেন।
কিম দো-হিয়নের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ একমাত্র মেয়ে মিন-জি। কিন্তু মিন-জি রহস্যজনকভাবে অপহৃত হলে কিম বুঝতে পারেন, অতীত তাঁকে ছেড়ে যায়নি। মেয়েকে উদ্ধার করতে তিনি আবারও ফেরেন পুরোনো পরিচয়ে। শুরু হয় এক নির্মম অভিযান, যেখানে তাঁকে একাই মোকাবিলা করতে হয় অপরাধী চক্র, ভাড়াটে ঘাতক এবং নিজের পুরোনো শত্রুদের। ধীরে ধীরে প্রকাশ পায় এমন এক ষড়যন্ত্র, যার শিকড় তাঁর অতীতের গোপন অভিযানের সঙ্গে জড়িত।
দুর্দান্ত অ্যাকশন, বাবা–মেয়ের আবেগ আর প্রতি পর্বের টানটান রোমাঞ্চের কারণে দেশি দর্শকেরাও আগ্রহ নিয়ে দেখেছেন সিরিজটি।
‘স্পুকি ইন লাভ’
তালিকার পাঁচে রয়েছে আরেকটি কোরীয় সিরিজ। গত ১৮ জুলাই মুক্তি পেয়েছে ছয় পর্বের হরর রোমান্টিক সিরিজটি। লি মিন–সো পরিচালিত এই সিরিজে অভিনয় করেছেন পার্ক–ইয়ুন–বিন, ইয়াং সে–জং, অং সেওং–উন। রোমান্স, রহস্য, কমেডি আর অতিপ্রাকৃত ঘটনাকে এক সুতায় গেঁথে তৈরি এই সিরিজটি মুক্তির পর থেকেই শুধু দক্ষিণ কোরিয়ায় নয়, আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছেও আলোচনার কেন্দ্রে। বাংলাদেশের কে-ড্রামা দর্শকদের মধ্যেও সিরিজটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে; ফেসবুক গ্রুপ, টিকটক ভিডিও এবং অনলাইন আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে এর নাম।
গল্প এগিয়েছে চেওন ইয়ো-রিকে নিয়ে। ধনী পরিবারের উত্তরাধিকারী হলেও তার জীবন মোটেও সাধারণ নয়। ছোটবেলা থেকেই সে মৃত মানুষের আত্মা দেখতে পায়। শুধু তা–ই নয়, যেসব আত্মা অন্যায়ভাবে মারা গেছে, তারা ইয়ো-রির কাছেই সাহায্য চায়। অন্যদিকে মা কাং-উক একজন দক্ষ ও যুক্তিবাদী প্রসিকিউটর। খুনের জটিল মামলার তদন্তই তার নিত্যদিনের কাজ। এক রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে তার দেখা হয় ইয়ো-রির সঙ্গে।
প্রথম দেখাতেই দুজনের মধ্যে কোনো প্রেম জন্মায় না। বরং একজন বিশ্বাস করে যুক্তিতে, অন্যজন অতিপ্রাকৃত জগতে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারে, একসঙ্গে কাজ করলেই অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব। আর সেই তদন্তের মধ্য দিয়েই শুরু হয় ভিন্নধর্মী এক প্রেমের গল্প।
নামের কারণে অনেকেই ভাবতে পারেন এটি হয়তো একটি হরর সিরিজ। বাস্তবে ‘স্পুকি ইন লাভ’ ভয় দেখানোর চেয়ে রহস্য আর আবেগের ওপর বেশি জোর দেয়। প্রতিটি পর্বে নতুন কোনো আত্মা, নতুন কোনো হত্যাকাণ্ড কিংবা বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা অপরাধ সামনে আসে। সেই রহস্য সমাধান করতে গিয়ে ইয়ো-রি ও কাং-উকের সম্পর্কও ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে।
আইএমডিবি ও নেটফ্লিক্স অবলম্বনে