তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে।
যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।
যদি থাকি কাছাকাছি,
দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি—
তবু মনে রেখো।
—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মুক্তির পর প্রায় দুসপ্তাহ পার হয়েছে। তবু অন্তর্জালে ‘মুসাফির ক্যাফে’ নিয়ে চর্চা যেন থামছেই না। বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সে সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজের তালিকায় এখনো শীর্ষে রয়েছে এটি। দেশের অভিনয়শিল্পী থেকে সাধারণ দর্শক—সবাই কথা বলছেন সিরিজটি নিয়ে। হালে ওটিটির বহু সিনেমা–সিরিজ নিয়ে চর্চা হয়েছে, কিন্তু ‘মুসাফির ক্যাফে’ নিয়ে কেন এত আলোচনা? পুরোপুরি রোমান্টিক ঘরানার একটি সিরিজ নিয়ে শেষ কবে এত চর্চা হয়েছে, মনে করা মুশকিল। সিরিজটির মূল সুর অসমাপ্ত প্রেমের গল্প। উপমহাদেশে আবেগপ্রবণ দর্শকের নিজের জীবনে এমন গল্পের অভাব নেই। সিরিজটি যে তাঁদের নস্টালজিয়া উসকে দিয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। অনেক ইতিবাচক দিক থাকলেও মানের বিচারে কতটা উতরাল ‘মুসাফির ক্যাফে’?
চেনা প্রেমের গল্পই বলে মুসাফির ক্যাফে, তবে সিরিজটির বড় শক্তি সম্পর্ককে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আবার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও সেখানেই—গল্প বলার ধরন এতটাই নিরাপদ ও পরিচিত যে শেষ পর্যন্ত সিরিজটি সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারে না। ছোট শহরের প্রেক্ষাপটে প্রেম, স্বপ্ন, বিচ্ছেদ আর নতুন করে জীবন শুরু করার গল্প নিয়েই এগিয়েছে গল্প। দিব্য প্রকাশ দুবের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত আট পর্বের এই সিরিজের কেন্দ্রে রয়েছে চন্দর, সুধা ও প্রীতিকে ঘিরে ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি। কাগজে-কলমে গল্পটির মধ্যে মায়াময় প্রেমের গল্প হয়ে ওঠার সব উপাদানই ছিল। কিন্তু নির্মাণের সীমাবদ্ধতা আর অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতার কারণে সে সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সফটওয়্যার কোম্পানির চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে আসে চন্দর (বিক্রান্ত ম্যাসি)। চাকরি করলেও তার স্বপ্ন, পাহাড়ে নিজের একটি ক্যাফে খোলা। এ সময় তার জীবনে আসে প্রাণবন্ত ও আত্মবিশ্বাসী আইনজীবী সুধা (বেদিকা পিন্টো)। দ্রুত গভীর হয় দুজনের সম্পর্ক। কিন্তু জীবনের লক্ষ্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাতে সে সম্পর্ক ভেঙে যায়। সময়ের ব্যবধানে চন্দরের জীবনে আসে শান্ত ও সংবেদনশীল প্রীতি (মহিমা মাকওয়ানা)। দুটি ভিন্ন সময়রেখায় গল্প এগোয়।
একনজরেসিরিজ: ‘মুসাফির ক্যাফে’ধরন: রোমান্টিক ড্রামাউৎস: ‘মুসাফির ক্যাফে’, দিব্য প্রকাশ দুবেপরিচালনা: রুচির অরুণঅভিনয়: বিক্রান্ত ম্যাসি, বেদিকা পিন্টো, মহিমা মাকওয়ানাস্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্সপর্বসংখ্যা: ৮দৈর্ঘ্য: ৩৫–৪৫ মিনিট
বর্তমানে পাহাড়ি শহর মুসৌরিতে চন্দর ও প্রীতি মিলে একটি ক্যাফে চালায়। বাইরে থেকে তাদের জীবন নিখুঁত মনে হলেও ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, চন্দর এখনো আট বছর আগের এক অসমাপ্ত সম্পর্কের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে। সেই অতীতেই রয়েছে সুধার সঙ্গে তার প্রেম, বিচ্ছেদ আর বদলে যাওয়া জীবন।
সিরিজটিতে ২০১০-এর দশকের রোমান্টিক সিনেমার আবহ স্পষ্ট। সম্পর্ককেন্দ্রিক সংলাপ, নরম সুরের সংগীত, প্যাস্টেল রঙের দৃশ্য, ভ্রমণ আর আত্ম–অন্বেষণের মিশেলে পুরো সিরিজে নস্টালজিয়ার অনুভূতি তৈরি হয়। গল্প ও চরিত্র নির্মাণে ইমতিয়াজ আলীর সিনেমার প্রভাব প্রবল। সুধার স্বাধীনচেতা চরিত্রে ‘যাব উই মেট’-এর ছায়া, চন্দরের আত্মপরিচয়ের সংকটে তামাশা, আবার তাদের সম্পর্কের নানা বাঁকে ‘সোচা না থা’ কিংবা ‘লাভ আজকাল’-এর আবহ খুঁজে পাওয়া যায়। ফলে অনেক দৃশ্য নতুনের চেয়ে বরং পরিচিতই মনে হয়।
অভিনয়ে বিক্রান্ত ম্যাসি সাবলীল। চন্দর চরিত্রের দ্বিধা, হতাশা এবং ভালোবাসার টানাপোড়েন তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। সীমিত চিত্রনাট্যের মধ্যেও তাঁর অভিনয় সিরিজটিকে অনেকটা ধরে রেখেছে। বেদিকা পিন্টোও মন্দ নন। কিন্তু তাঁদের রসায়ন সব সময় স্বতঃস্ফূর্ত নয়। সম্পর্কের শুরুর অংশে তাঁদের অভিনয় অনেক সময় সাজানো মনে হয়। অন্যদিকে প্রীতি চরিত্রটি গল্পে গুরুত্বপূর্ণ হলেও পর্যাপ্ত গভীরতা পায় না। এ চরিত্রে মহিমা মাকওয়ানা সংযত ও পরিণত অভিনয় করেছেন। তবে তাঁর চরিত্রটির অতীত বা মানসিক জগৎ নিয়ে খুব বেশি কিছু দেখানো হয়নি। ফলে দর্শকের কাছে চরিত্রটি পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় না। সহশিল্পীদের মধ্যে আদিল হুসেন ও অনুভা ফতেপুরিয়ার উপস্থিতি স্বল্প সময়ের হলেও আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।
‘মুসাফির ক্যাফে’র সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দৈর্ঘ্য। যে গল্প চার বা পাঁচ পর্বেই সাবলীলভাবে বলা সম্ভব ছিল, সেটিকে আট পর্বে টেনে নেওয়ায় গতি হারিয়েছে। অনেক দৃশ্য পুনরাবৃত্তিমূলক মনে হয় এবং গল্পের আবেগও ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়। আরেকটি আক্ষেপ ভোপাল শহরকে ঘিরে। গল্পে শহরের নাম বারবার এলেও তার পরিবেশ, সংস্কৃতি বা সৌন্দর্যকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি। ভোপাল কেবল একটি লোকেশন হয়েই থেকে গেছে; গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে পারেনি, যা অনেকটা হয়ে উঠতে পেরেছে উত্তরাখন্ডের শৈল শহর মুসৌরি।
নানা সীমাবদ্ধতার পরও ‘মুসাফির ক্যাফে’ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আলাদা হয়ে ওঠে। সিরিজটি প্রেমের সম্পর্কে কাউকে নায়ক বা খলনায়ক বানানোর চেষ্টা করে না। সুধা ভালোবাসার চেয়ে বড় করে দেখতে চায় নিজের স্বপ্ন ও পরিচয়কে। আর চন্দর বিশ্বাস করে, সম্পর্কের মধ্যেই নিজের পূর্ণতা খুঁজে পাওয়া যায়। কারও অবস্থানকে একেবারে সঠিক বা ভুল বলা হয়নি; বরং সম্পর্কের ভাঙন কীভাবে ধীরে ধীরে অগ্রাধিকার, স্বপ্ন ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়, সেটাই সিরিজের মূল বক্তব্য। এখানে বিচ্ছেদের কারণ কোনো বড় বিশ্বাসঘাতকতা নয়; বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্বিধা, শারীরিক ঘনিষ্ঠতা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যাওয়ার মতো ছোট ছোট পরিবর্তনই সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করে। বাস্তব জীবনের অনেক সম্পর্কের মতোই এ দূরত্বকে বাইরের মানুষ প্রায়ই বুঝতে পারে না। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে নারী চরিত্রকে স্বার্থপর হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু মুসাফির ক্যাফে সেই সহজ সমীকরণে যায় না; বরং দেখায়, ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার জন্য যে আপস প্রয়োজন, সে আপস কখনো মানুষের অস্তিত্বকেই বদলে দিতে পারে।
‘মুসাফির ক্যাফে’ নিখুঁত নয়, তবে ফি সপ্তাহে আসা এন্তার থ্রিলারের ভিড়ে এটি যেন তাজা হাওয়ার মতোই। পুরোনো প্রেম নিয়ে নস্টালজিয়ায় ভোগা দর্শকেরা তাতে মুগ্ধ হবেন, সে আর আশ্চর্য কী।