
কানাডার এক কিশোরীর মৃত্যু কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে। স্কুলের বন্ধুদের হাতে নির্মম নির্যাতন, তারপর হত্যা—সেই বাস্তব ঘটনাই নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে হুলুর ক্রাইম ড্রামা ‘আন্ডার দ্য ব্রিজ’-এর মাধ্যমে। সিরিজটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়, এটি কিশোর বয়সের নিঃসঙ্গতা, বুলিং, পরিচয়ের সংকট এবং সমাজের অন্ধকার এক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।
১৯৯৭ সালের ১৪ নভেম্বর। কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভিক্টোরিয়ার উপকণ্ঠ সানিচ এলাকার ১৪ বছর বয়সী কিশোরী রিনা ভির্ককে ডাকা হয়েছিল একটি পার্টিতে। সেদিন রাতে সে আর বাড়ি ফেরেনি। পরে তার মরদেহ পাওয়া যায়। তদন্তে উঠে আসে ভয়াবহ তথ্য—নিজেরই সমবয়সী কয়েকজন কিশোর-কিশোরীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে খুন হয়েছিল রিনা।
এই সত্য ঘটনা নিয়েই ২০০৫ সালে বই লিখেছিলেন সাংবাদিক ও লেখক রেবেকা গডফ্রে। সেই বই অবলম্বনেই তৈরি হয়েছে ‘আন্ডার দ্য ব্রিজ’। সিরিজে রেবেকা গডফ্রের চরিত্রে অভিনয় করেছেন রেইলি কিও, পুলিশ কর্মকর্তা ক্যাম বেন্টল্যান্ড চরিত্রে আছেন লিলি গ্লাডস্টোন।
যে মেয়েটি নিজেকে ‘বহিরাগত’ মনে করত
রিনার পরিবার ছিল ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান। ছোটবেলা থেকেই তাকে নানা ধরনের বুলিংয়ের শিকার হতে হয়েছিল। নিজের চেহারা, ওজন, পারিবারিক রক্ষণশীলতা—সবকিছু মিলিয়ে সে প্রায়ই নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা ভাবত। পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসনও ছিল কঠোর। ফলে কৈশোরে এসে পরিবার থেকে দূরে সরে যেতে শুরু করে সে।
রিপোর্ট অনুযায়ী, কয়েকবার বাড়ি থেকেও পালিয়েছিল রিনা। এমনকি স্বাধীনভাবে থাকার আশায় নিজের বাবার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগও তুলেছিল, যদিও পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়।
এই মানসিক অস্থিরতার সময়েই সে জড়িয়ে পড়ে স্থানীয় এক কিশোরী গ্যাংয়ের সঙ্গে। সেই দলের নেত্রী ছিল নিকোল কুক নামের এক কিশোরী, যাকে বই ও সিরিজে ‘জোসেফিন বেল’ নামে দেখানো হয়েছে।
সেতুর নিচে সেই রাত
ঘটনার রাতে প্রথমে একটি স্কুলের পেছনে কিশোর-কিশোরীদের বড় জমায়েত হয়েছিল। পুলিশ সেটি ভেঙে দিলে কয়েকজন চলে যায় ক্রেগফ্লাওয়ার ব্রিজ এলাকায়। সেখানেই শুরু হয় রিনার ওপর ভয়াবহ হামলা।
তদন্তে উঠে আসে, গুজব ছড়ানোর অভিযোগে রিনাকে ‘শাস্তি’ দিতে চেয়েছিল দলটি। প্রথমে কয়েকজন মিলে তাকে মারধর করে। পরে অধিকাংশ চলে গেলেও দুই কিশোর—কেলি এলার্ড ও ওয়ারেন গ্লোওয়টসকি রিনার পিছু নেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়।
এক সপ্তাহ পর উদ্ধার করা হয় রিনার মরদেহ।
পুরো কানাডাকে নাড়িয়ে দেওয়া মামলা
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি অপরাধ ছিল না। এটি কানাডাজুড়ে বুলিং, কিশোর সহিংসতা ও সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি করেছিল। সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় ঘটনাটি।
হামলায় অংশ নেওয়া ছয় কিশোরী পরে হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়। তবে মূল হত্যার অভিযোগে বিচার হয় কেলি এলার্ড ও ওয়ারেন গ্লোওয়াটস্কির।
ওয়ারেন পরে নিজের অপরাধ স্বীকার করে এবং রিনার পরিবারের কাছে ক্ষমাও চেয়েছিল। অন্যদিকে কেলি এলার্ডের বিচার ছিল দীর্ঘ ও জটিল। একাধিকবার মামলা, আপিল ও পুনর্বিচারের পর শেষ পর্যন্ত তাকে দ্বিতীয় ডিগ্রি হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরে সে নিজের নাম পরিবর্তন করে কেরি সিম রাখে।
কেন আবার আলোচনায়
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাস্তব অপরাধভিত্তিক সিরিজের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কিন্তু ‘আন্ডার দ্য ব্রিজ’ আলাদা হয়ে উঠেছে এর আবেগগত নির্মাণ ও চরিত্রের গভীরতার কারণে। সিরিজটি শুধু হত্যাকাণ্ড দেখায় না; বরং প্রশ্ন তোলে, কীভাবে কিশোর বয়সের একাকিত্ব, গ্রহণযোগ্যতার আকাঙ্ক্ষা এবং দলগত মানসিকতা ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে?
বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে রিনার পরিচয়ের সংকট ও মানসিক চাপ অনেক দর্শকের কাছেই গভীরভাবে স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
ঘটনার দুই দশক পরও লেখক রেবেকা গডফ্রে লিখেছিলেন, এই হত্যাকাণ্ড এখনো মানুষকে ‘অস্বস্তিতে ফেলে এবং নাড়িয়ে দেয়’।
টাইম অবলম্বনে