দিন কয়েক ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন হয়ে গেছে নস্টালজিয়া উসকে দেওয়ার মাধ্যম। সাধারণ ব্যবহারকারী তো বটেই, তামাম দুনিয়ার হেন তারকা নেই যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে আশির দশকের ছবি পোস্ট করেননি। সেই সব ছবির সূত্র ধরেই আলোচনায় উঠে আসছে আশির দশকের পপ কালচারের নানা অনুষঙ্গ। ঠিক এমন সময়, গত ৪ মে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম অ্যাপল টিভি+–এ এসেছে নতুন সিনেমা ‘মে ডে’। যার পটভূমি আবার আশির দশক! ঘটনা হয়তো নেহাতই কাকতালীয়, কিন্তু আশির দশক নিয়ে যখন দুনিয়াজুড়ে মানুষ নস্টালজিয়ায় ভুগছেন, তখন এমন একটি সিনেমা নিয়ে যে জোর চর্চা হবে, সেটা সহজেই বোধগম্য। মুক্তির পর থেকেই দর্শক–সমালোচক উভয়েরই মন কেড়েছে এই বাডি অ্যাকশন–কমেডি সিনেমা।
একনজরেসিনেমা: ‘মে ডে’ধরন: অ্যাকশন–কমেডিপরিচালনা: জন ফ্রান্সিস ড্যালি ও জোনাথন গোল্ডস্টেইনঅভিনয়: রায়ান রেনল্ডস, কেনেথ ব্রানা, মারচিন দোরচিনস্কিস্ট্রিমিং: অ্যাপল টিভি+দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৫১ মিনিট
আশির দশকের সিনেমার কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আকাশে যুদ্ধবিমান, বরফঢাকা সীমান্ত, শত্রুর পেছনে ছুটে চলা নায়ক, গাড়ি ধাওয়া, অসম্ভব সব অ্যাকশন আর দুই ভিন্ন মেরুর মানুষের অপ্রত্যাশিত বন্ধুত্ব। ‘মে ডে’ সেই পুরোনো দিনের সিনেমারই নতুন সংস্করণ। জন ফ্রান্সিস ড্যালি ও জোনাথন গোল্ডস্টেইনের ছবিটি ‘টপ গান’-এর অ্যাকশন, আশির দশকের বাডি কমেডি সিনেমার হাস্যরস আর শীতল যুদ্ধের আবহ একসঙ্গে মিশিয়েছে। ফল? খুব মৌলিক কোনো সিনেমা নয়, কিন্তু ‘মে ডে’ বেশ উপভোগ্য।
গল্পের শুরু ১৯৮৭ সালে। মার্কিন নৌবাহিনীর পাইলট ট্রয় ‘অ্যাসাসিন’ কেলি (রায়ান রেনল্ডস) একটি গোপন মিশনে সোভিয়েত রাশিয়ার আকাশসীমায় ঢোকেন। যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর বরফে ঢাকা দুর্গম এলাকায় আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় তাঁকে। জ্ঞান ফেরার পর কেলি আবিষ্কার করেন, তাঁকে আশ্রয় দিয়েছেন স্থানীয় এক রুশ নাগরিক নিকোলাই উস্তিনভ (কেনেথ ব্রানা)। তবে নিকোলাই সাধারণ কোনো নাগরিক নন, তিনি সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা! যুক্তরাষ্ট্রের গোপন মিশনে সোভিয়েত ইউনিয়নে এসে আটকা পড়া পাইলটের আশ্রয়দাতা খোদ সাবেক কেজিবি এজেন্ট; শুরুর এই চমকই সিনেমাটির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
নিকোলাই আসলে সোভিয়েত ব্যবস্থায় বীতশ্রদ্ধ। তিনি মার্কিন পপ কালচারের পাঁড় ভক্ত। তাঁর ঘরে ‘টপ গান’-এর পোস্টার, আমেরিকান গান, সংস্কৃতি আর জীবনযাপনের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ। কেলিকে তিনি প্রথমে নিজের কেবিনে লুকিয়ে রাখতে চান। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ট্রয়কে ধরতে কেজিবি কর্মকর্তা আলেকজান্ডার ভলকভ (মারচিন দোরচিনস্কি) এবং তাঁর বাহিনী তাড়া শুরু করলে নিকোলাইও নিজের দেশের চোখে শত্রু হয়ে ওঠেন।
তখন শুরু হয় দুজনের এক বিপজ্জনক যাত্রা—হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে মস্কোর মার্কিন দূতাবাসে পৌঁছাতে হবে। কেলির প্রয়োজন দেশে ফেরার নিরাপদ পথ, আর নিকোলাই চান যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়। ফলে একে অপরকে খুব একটা পছন্দ না করলেও তাঁদের বন্ধু হতে হয়। একজন মার্কিন সামরিক পাইলট, অন্যজন সাবেক কেজিবি কর্মকর্তা—শীতল যুদ্ধের আবহে দুই বিপরীত প্রান্তের মানুষ শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে অসম্ভব এক জুটি।
‘মে ডে’ কোল্ড ওয়ারের রাজনৈতিক জটিলতা নিয়ে গভীর কোনো বক্তব্য দিতে চায় না; বরং শত্রুতা, জাতীয় পরিচয় আর মতাদর্শের বাইরে মানুষে মানুষে সম্পর্কের জায়গাটাকেই সামনে আনে। কে আমেরিকান, কে রুশ—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বিপদে কে কার পাশে দাঁড়াচ্ছে। অবশ্য এই সরলীকরণই ছবির সীমাবদ্ধতাও বটে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বকে শেষ পর্যন্ত অনেকটা ‘আমরা আসলে একে অন্যের মতোই’ ধরনের সহজ বার্তায় নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে এটি তো আর রাজনৈতিক থ্রিলার নয়; মূলত অ্যাকশন-কমেডি। সেই জায়গায় পরিচালকদ্বয় বেশ সফল।
১১০ মিনিটের সিনেমায় গতি দুরন্ত; এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে যাওয়ার সময় একঘেয়েমি খুব একটা তৈরি হয় না। বরফঢাকা বন, গাড়ি ধাওয়া, ট্রেন, উড়োজাহাজ আর অ্যাকশন—সব মিলিয়ে গল্প ক্রমে এগিয়ে চলে। বাড়তি পাওনা অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর পাশাপাশি কমেডি । কখনো লুকিয়ে থাকার দৃশ্য, কখনো ভুল সময়ে ভুল জায়গায় উপস্থিতি—এসব মজার মুহূর্ত ছবিটিকে প্রাণবন্ত রাখে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ‘মে ডে’ নিজের পূর্বসূরিদের কথাও ভুলে যায় না। ‘টপ গান’-এর প্রতি ছবিটির ভালোবাসা স্পষ্ট। ব্রুস স্প্রিংস্টিনের গান থেকে শুরু করে পোশাক, চরিত্রের ধরন, ক্যামেরার ব্যবহার—সবকিছুতেই আশির দশকের প্রতি একধরনের নস্টালজিয়া কাজ করেছে। এমনকি সিনেমাটির অ্যাকশনেও সেই সময়ের বড় পর্দার রোমাঞ্চ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা আছে।
তবে যতটা প্রত্যাশা তৈরি করে সিনেমাটি শুরু হয়, ততটা সব চরিত্র শেষ পর্যন্ত কাজে লাগানো হয়নি। নিকোলাইয়ের মেয়ে আনার (মারিয়া বাকালোভা) চরিত্রটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত। হ্যারল্ড কেলি (ডেভিড মোর্স) চরিত্রও গল্পে আবেগ যোগ করার সুযোগ পেয়েও খুব বেশি দূর যেতে পারেনি। এমনকি রায়ান রেনল্ডসও কিছু জায়গায় নিজের চেনা ব্যক্তিত্বের বাইরে পুরোপুরি বের হতে পারেননি। তাঁর রসিকতা, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি ও ব্যঙ্গাত্মক সংলাপ দর্শকের পরিচিত—এখানে সেটিই চরিত্রের অংশ হয়ে গেছে। ফলে কেলিকে আলাদা কোনো চরিত্রের চেয়ে ‘রায়ান রেনল্ডস চরিত্রে রায়ান রেনল্ডস’ বলেই মনে হয়।
কিন্তু কেনেথ ব্রানার ক্ষেত্রে ঘটনা একেবারেই উল্টো। নিকোলাই চরিত্রে ব্রানা যেন সিনেমাটিকে নিজের করে নিয়েছেন। ব্রানা নিজের চরিত্রটিকে শুধু ‘আমেরিকাপ্রেমী সাবেক কেজিবি’ হিসেবে আটকে রাখেননি। তাঁর মধ্যে একধরনের বিষণ্নতা, একাকিত্ব, বিদ্রোহ ও শিশুসুলভ কৌতূহল রেখেছেন। ফলে চরিত্রটি একই সঙ্গে হাস্যরসাত্মক ও মানবিক হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বড় চমক—অ্যাকশন। সাধারণত শেকসপিয়ার, গোয়েন্দা বা গম্ভীর চরিত্রে বেশি দেখা ব্রানাকে এখানে ঘুষি মারতে, লড়তে, ধাওয়া করতে দেখাটা বেশ মাজার। বয়স ৬৫ হলেও অ্যাকশন দৃশ্যে তিনি যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য। কিছু মুহূর্তে মনে হয়, এত দিন কেন তাঁকে এমন চরিত্রে দেখা গেল না!
রেনল্ডস ও ব্রানার রসায়নও ছবিটির প্রাণ। একজন আত্মবিশ্বাসী আমেরিকান পাইলট, অন্যজন আমেরিকান সংস্কৃতিতে মুগ্ধ রুশ। তাঁদের ঝগড়া, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং ধীরে ধীরে বন্ধুত্বে পৌঁছানোর পথটাই সিনেমার সবচেয়ে উপভোগ্য অংশ। ব্রানা এখানে রেনল্ডসের চেনা হাস্যরসকে ভারসাম্য দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তাই সিনেমাটি রেনল্ডসের ছবি হলেও সবচেয়ে বেশি মনে থাকে ব্রানাকেই।
ভিলেনের চরিত্রেও কিছুটা চমক আছে। মারচিন দোরচিনস্কি প্রচলিত ‘রুশ ভিলেন’-এর ছাঁচে ঢুকে না গিয়ে চরিত্রটিকে খানিকটা সংযত রেখেছেন।
তবে ‘মে ডে’ একেবারে নিখুঁত নয়। আশির দশকের প্রতি অতিরিক্ত সচেতনতা কখনো কখনো ছবিটিকে স্বাভাবিক গল্পের বদলে ‘নস্টালজিয়ার প্রদর্শনী’ বলে মনে হয়।
তবে ‘মে ডে’ ‘টপ গান: ম্যাভেরিক’ হতে চায়নি। বরং ‘টপ গান’, ‘মিডনাইট রান’ আর আশির দশকের বাডি অ্যাকশন ছবিগুলোর প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজের মতো একটি মিশ্রণ তৈরি করেছে। আর সেই মিশ্রণ যে বেশ উপভোগ্য হয়েছে, বলাই বাহুল্য।