ডলি পার্টন। এএফপি ফাইল ছবি
ডলি পার্টন। এএফপি ফাইল ছবি

স্বামীর প্রতি লাল চুলের নারীর আগ্রহ, যেভাবে জন্ম নেয় ডলির ‘জোলিন’

এক নারী আরেক নারীর কাছে তাঁর প্রিয় মানুষটিকে কেড়ে না নেওয়ার আকুতি জানাচ্ছেন। ঈর্ষা, ভালোবাসা আর হারানোর ভয়—সহজ কথায় গভীর এই অনুভূতির গান ‘জোলিন’। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত গানটি ডলি পার্টনের ক্যারিয়ারকে নিয়ে যায় অন্য উচ্চতায়। পরের বছরই তিনি লেখেন ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। পেশাগত বিচ্ছেদের বেদনাকে উপজীব্য করে লেখা সেই গান পরে হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

এই দুটি গানই যেন ডলি পার্টনের সংগীতজীবনের সারাংশ—নিজের অভিজ্ঞতা থেকে গল্প নেওয়া, সাধারণ অনুভূতিকে অসাধারণভাবে প্রকাশ করা এবং সেই গল্পকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া। ‘কোট অব ম্যানি কালারস’, ‘নাইন টু ফাইভ’, ‘মাই টেনেসি মাউন্টেন হোম’, ‘হিয়ার ইউ কাম এগেইন’—এমন আরও কত গানেই তিনি বলেছেন নিজের ও সাধারণ মানুষের কথা।

কান্ট্রি সংগীতের সেই কিংবদন্তি শিল্পী, গীতিকার, অভিনেত্রী, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবী ডলি পার্টন আর নেই। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলে মারা গেছেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

ডলির প্রতিনিধির দেওয়া বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ক্যানসারের সঙ্গে অল্প সময়ের লড়াইয়ের পর ন্যাশভিলের ভ্যান্ডারবিল্ট-ইনগ্রাম ক্যানসার সেন্টারে স্বজনদের উপস্থিতিতে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে অবসান হলো কান্ট্রি সংগীতের একটি যুগের। সাত দশকের কর্মজীবনে গান, অভিনয়, ব্যবসা ও মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমে কোটি মানুষের জীবনে প্রভাব রেখেছেন তিনি।

‘জোলিন’-এর নেপথ্যের গল্প
প্রথম দিকে ডলির একক গান প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। পরে কান্ট্রি সংগীতের সঙ্গে পপের ছোঁয়া যোগ করে নিজের গানের ধরনে পরিবর্তন আনেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর জনপ্রিয়তা।

১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘জোলিন’ সেই যাত্রায় বড় মোড় এনে দেয়। গানটির জন্মও ডলির ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। তিনি জানিয়েছিলেন, এক লাল চুলের ব্যাংককর্মী তাঁর স্বামীর প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ দেখাতেন। সেই নারীকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা থেকেই গানটির ভাবনা আসে।

তবে গানটি শুধু একজন নারী ও তাঁর দাম্পত্যের গল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রিয় মানুষকে হারানোর ভয় ও সম্পর্কের অনিশ্চয়তার সর্বজনীন অনুভূতি গানটিকে কালজয়ী করে তোলে। পরে দ্য হোয়াইট স্ট্রাইপস, বিয়ন্সেসহ বিভিন্ন প্রজন্মের বহু শিল্পী নিজেদের মতো করে ‘জোলিন’ পরিবেশন করেছেন।

যে গান এলভিসকে দেননি
‘জোলিন’-এর পরের বছর আসে ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। দীর্ঘদিনের সহশিল্পী ও পরামর্শক পোর্টার ওয়াগনারের কাছ থেকে পেশাগতভাবে আলাদা হওয়ার সময় তাঁকে সম্মান জানিয়ে গানটি লিখেছিলেন ডলি। বিচ্ছেদের গান হলেও সেখানে অভিযোগের চেয়ে কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসাই বড় হয়ে উঠেছে।

ডলি পার্টন। এএফপি ফাইল ছবি

এলভিস প্রিসলি গানটি নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ব্যবস্থাপক প্রকাশনাস্বত্বের একটি অংশ দাবি করেন। ডলি তাতে রাজি হননি। সম্ভাব্য বড় সুযোগ হাতছাড়া হলেও নিজের গানের স্বত্ব ধরে রাখার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন তিনি।
বহু বছর পর, ১৯৯২ সালে ‘দ্য বডিগার্ড’ চলচ্চিত্রে হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে গানটি নতুন ইতিহাস তৈরি করে। বিশ্বজুড়ে বহু শ্রোতা এটিকে হুইটনির গান হিসেবে চিনলেও এর স্রষ্টা ও প্রথম শিল্পী ছিলেন ডলি। গানটির অভাবনীয় সাফল্য তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্তের গুরুত্বও প্রমাণ করে।

নিজের শৈশবও উঠে এসেছে গানে
ডলির সবচেয়ে জনপ্রিয় আত্মজীবনীমূলক গানগুলোর একটি ‘কোট অব ম্যানি কালারস’। শৈশবে তাঁর মা পুরোনো নানা রঙের কাপড় জোড়া লাগিয়ে একটি কোট বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেটি পরে স্কুলে গিয়ে সহপাঠীদের উপহাসের শিকার হন ডলি। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা তাঁকে শিখিয়েছিল, মানুষের প্রকৃত সম্পদ পোশাকে নয়, হৃদয়ে। ডলি বহুবার বলেছেন, এটি তাঁর সবচেয়ে প্রিয় গান।

‘মাই টেনেসি মাউন্টেন হোম’ গানেও ফিরে এসেছে ডলির শৈশব, পাহাড়ঘেরা বাড়ি, পরিবার ও গ্রামের স্মৃতি। বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেলেও নিজের জন্মভূমি ও শিকড় থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হননি তিনি।

১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ‘হিয়ার ইউ কাম এগেইন’ ডলিকে কান্ট্রি সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পপ শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেয়। গানটির জন্য প্রথম গ্র্যামি পান তিনি। এরপর ‘হার্টব্রেকার’, ‘টু ডোরস ডাউন’, ‘লাভ ইজ লাইক আ বাটারফ্লাই’, ‘রিয়েল লাভ’সহ একের পর এক গান শ্রোতৃপ্রিয় হয়।

কেনি রজার্সের সঙ্গে গাওয়া ‘আইল্যান্ডস ইন দ্য স্ট্রিম’ আশির দশকের অন্যতম জনপ্রিয় দ্বৈত গান। দুই শিল্পীর কণ্ঠের রসায়ন, সহজ সুর ও হৃদয়ছোঁয়া কথার কারণে গানটি প্রকাশের কয়েক দশক পরও সমান জনপ্রিয়।

ডলি পার্টন। এএফপি ফাইল ছবি

কর্মজীবী মানুষের কথা
১৯৮০ সালে একই নামের চলচ্চিত্রের জন্য লেখা ‘নাইন টু ফাইভ’ শুধু একটি জনপ্রিয় গান নয়, কর্মজীবী মানুষের সংগ্রামের প্রতীকও। অফিসের একঘেয়ে জীবন, পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য না পাওয়া এবং কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্যের কথা উঠে আসে এতে। গানটি ডলিকে মূলধারার পপ–সংস্কৃতিতে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
গীতিকার হিসেবে ডলির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প সহজ ভাষায় তুলে ধরার ক্ষমতা। প্রেম, বিচ্ছেদ, পরিবার, দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও আশা—এসবই ছিল তাঁর গানের মূল উপজীব্য। জীবদ্দশায় প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন তিনি। নিজের অধিকাংশ জনপ্রিয় গানের কথাও তাঁরই লেখা।

গান লেখাকে কখনো শুধু পেশা হিসেবে দেখেননি ডলি। তাঁর কাছে এটি ছিল একধরনের আত্মিক সাধনা। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, গান লিখতে বসলেই তিনি নিজেকে সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে কাছাকাছি অনুভব করেন।

কাঠের ঘর থেকে ন্যাশভিলে
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির সেভিয়ার কাউন্টির পিটম্যান সেন্টারে জন্ম ডলি রেবেকা পার্টনের। ১২ ভাই-বোনের বড় পরিবারে এক কক্ষের কাঠের ঘরে কেটেছে তাঁর শৈশব। বাবা সংসার চালাতে অল্প বয়সেই পড়াশোনা ছেড়ে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছিলেন। পরিবারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, তবে গান ছিল ডলির সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
মায়ের মুখে লোকগান ও পুরোনো পাহাড়ি গীত শুনে বড় হয়েছেন ডলি। গির্জায় গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর সংগীতযাত্রা। ছয় বছর বয়সে প্রিয় পুতুলকে নিয়ে প্রথম গান লেখেন। আট বছর বয়সে হাতে ওঠে গিটার, ১১ বছর বয়সে স্থানীয় বেতারে গান গাওয়া শুরু করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই মর্যাদাপূর্ণ কান্ট্রি সংগীতের মঞ্চ গ্র্যান্ড ওলে অপ্রিতে পরিবেশনার সুযোগ পান।

ডলি পার্টন। এএফপি ফাইল ছবি

স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেই গানের স্বপ্ন নিয়ে ন্যাশভিলে চলে যান ডলি। সঙ্গে ছিল নিজের লেখা গানে ভরা একটি স্যুটকেস। গীতিকার কাকার সহায়তায় ন্যাশভিলের সংগীতজগতে প্রবেশ করেন। শুরুতে অন্য শিল্পীদের জন্য গান লিখলেও পরে স্বতন্ত্র কণ্ঠ, অকপট কথামালা ও গল্প বলার ক্ষমতায় দ্রুতই শ্রোতাদের নজর কাড়েন।

পর্দায়ও সাফল্য
সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন ডলি। ‘নাইন টু ফাইভ’, ‘দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস’, ‘স্টিল ম্যাগনোলিয়াস’সহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। তাঁর অভিনীত ছবিগুলো বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও পেয়েছে।
চলচ্চিত্রের জন্য লেখা গানের সুবাদে দুবার অস্কারে সেরা মৌলিক গানের মনোনয়ন পেয়েছিলেন ডলি। টেলিভিশন অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও বই প্রকাশেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

শিল্পীর বাইরে আরেক ডলি
ডলি ছিলেন সফল উদ্যোক্তাও। টেনেসিতে তাঁর নামে গড়ে ওঠা বিনোদনকেন্দ্র ‘ডলিউড’ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়। নিজের জন্মস্থান ও আশপাশের মানুষের কর্মসংস্থান তৈরিতেও প্রতিষ্ঠানটি বড় ভূমিকা রেখেছে।
ঝলমলে পোশাক, উঁচু করে বাঁধা সোনালি চুল ও উজ্জ্বল সাজ ছিল ডলির পরিচিত রূপ। তবে চাকচিক্যের আড়ালে ব্যক্তিজীবনে ছিলেন সহজ, বিনয়ী ও রসবোধসম্পন্ন। নিজের বাহ্যিক রূপ নিয়েও অকপটে হাস্যরস করতেন। এই স্বতঃস্ফূর্ততাই তাঁকে নানা প্রজন্মের ভক্তদের কাছে আপন করে তুলেছিল।

শিশুদের হাতে ৩০ কোটির বেশি বই
গান ও অভিনয়ের বাইরে ডলির মানবিক উদ্যোগও তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল। শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে ১৯৯৫ সালে চালু করেন ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’। পড়াশোনার সুযোগ না পাওয়া বাবার স্মৃতি থেকেই উদ্যোগটির অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন তিনি। এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে শিশুদের হাতে বিনা মূল্যে ৩০ কোটির বেশি বই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

করোনা মহামারির সময় টিকা গবেষণায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার অনুদান দিয়েছিলেন ডলি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তায় দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি।

স্বীকৃতির দীর্ঘ তালিকা
কর্মজীবনে ডলি পার্টন ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার জিতেছেন। পেয়েছেন গ্র্যামির আজীবন সম্মাননা। বিশ্বজুড়ে তাঁর রেকর্ড বিক্রি হয়েছে ১০ কোটির বেশি। ১৯৯৯ সালে জায়গা পান কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমে। পরে সং রাইটার্স হল অব ফেম ও রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমেও অন্তর্ভুক্ত হন।

ডলির প্রায় ৬০ বছরের জীবনসঙ্গী কার্ল ডিন গত বছরের মার্চে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর শারীরিক সমস্যার কারণে কয়েকটি অনুষ্ঠান স্থগিত ও বাতিল করেছিলেন তিনি। তবে শেষ সময় পর্যন্ত নতুন গান, বই ও নিজের জীবন নিয়ে নির্মিত মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

টেনেসির ছোট্ট কাঠের ঘর থেকে বিশ্বসংগীতের শীর্ষে পৌঁছেছিলেন ডলি। তাঁর জীবনের সংগ্রাম, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ ও শিকড়ের গল্পই বারবার ফিরে এসেছে গানে। তাই মানুষটি চলে গেলেও ‘জোলিন’, ‘কোট অব ম্যানি কালারস’ কিংবা ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’-এর মতো গানেই থেকে যাবেন ডলি পার্টন।