হাবিব তাঁর সংগীতজীবনের শুরু, লন্ডন প্রবাসের স্মৃতি ও লোকজ সুরের সংগ্রাহকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা জানালেন
হাবিব তাঁর সংগীতজীবনের শুরু, লন্ডন প্রবাসের স্মৃতি ও লোকজ সুরের সংগ্রাহকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা জানালেন

কায়া-হেলাল, শিরিন-ন্যান্‌সিদের সঙ্গে হাবিবের পরিচয় হয়েছে যেভাবে

বাংলা সংগীতজগতে ফিউশন আর আধুনিক সংগীতের এক নতুন ধারা আনেন হাবিব ওয়াহিদ। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে লন্ডনে পাড়ি জমানো এই শিল্পী যখন দেশে ফেরেন, সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এক নতুন সুরশৈলী, যা বদলে দিল দেশীয় সংগীতে চেনা আবহ। প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় হাবিব ওয়াহিদ তাঁর সংগীতজীবনের শুরু, লন্ডন প্রবাসের স্মৃতি ও লোকজ সুরের সংগ্রাহকদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা জানালেন।

হাবিব। শিল্পীর ফেসবুক থেকে

লন্ডনের প্রবাসজীবন, কায়া-হেলাল
হাবিব ওয়াহিদের সংগীতজীবনের একটা অংশজুড়ে আছে লন্ডন। ১৯৯৯ সালে পাড়ি জমান সেখানে, দেশে ফেরেন ২০০২ সালের শেষ দিকে। তবে লন্ডনে থাকাকালে কেবল পড়াশোনা নয়, সংগীতের এক নতুন জগতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। বাংলা লোকজ গানকে নতুন করে আবিষ্কার করেন প্রবাসজীবনে। সেখানে বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদের এক বন্ধুর মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয় কায়ার সঙ্গে। হাবিব বলেন, ‘ওই বন্ধু আবার ছিলেন আব্বার মিউজিশিয়ান। যখন ছোট ছিলাম, তখন উনি আব্বার সঙ্গে বাজাতেন।’


লন্ডনে সপ্তাহান্তে একটি রেস্তোরাঁয় লাইভ মিউজিক করতেন হাবিব। তখন তিনি ইংরেজি কভার গান করেন। সেই রেস্তোরাঁর মালিক ছিলেন কায়ার বন্ধু এবং হেলালের ভগ্নিপতি। সেখান থেকেই হেলালের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা। মূলত প্রবাসে থাকাকালে যাঁদের সঙ্গে হাবিবের সংগীতের গভীর সংযোগ গড়ে উঠেছিল, তাঁদের কণ্ঠগুলোকে তিনি মানুষের সামনে আনতে চেয়েছিলেন।

হাবিবের সঙ্গে হেলাল

দেশে ফিরেই হাবিব ওয়াহিদ প্রথম হাত দেন ‘কৃষ্ণ’ অ্যালবামে। অ্যালবামটিতে বাংলা লোকগানের সঙ্গে পাশ্চাত্যের সংগীতের মিশ্রণ ঘটান তিনি। ২০০৩ সালে পপসংগীতে নতুন স্বাদ নিয়ে আসে অ্যালবামটি। লোকগানের ফিউশন অ্যালবামটিতে হাবিব ওয়াহিদ আর কায়ার যুগলবন্দী তরুণদের মন জয় করে। পরের বছর কায়া ও হেলালকে নিয়ে হাবিব প্রকাশ করেন ‘মায়া’ নামের আরেকটি অ্যালবাম। মিক্সড এই অ্যালবামের গানগুলোও শ্রোতৃপ্রিয় হয়। এরপর দুই দশক পার হয়েছে, কিন্তু ‘কৃষ্ণ’, ‘আমি কূলহারা কলঙ্কিনী’, ‘কালা’, ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘কুহু সুরে মনের আগুন’ গানগুলোর আবেদন এখনো ফুরায়নি।

একসঙ্গে হাবিব, কায়া ও হেলাল

‘বাউল কুইন’ শিরিন
শিল্পী শিরিনের সঙ্গেও হাবিবের পরিচয় লন্ডনে। একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে শিরিনকে প্রথমবারের মতো শুনেছিলেন। হাবিব বলেন, ‘তখনই তাঁকে নিয়ে কিছু করার চিন্তা মাথায় আসে। কারণ, কণ্ঠটা অনেক ইউনিক লাগছিল। তিনি ফোক গান এত ভালো গাইতেন, মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। তিনি তখন শখে গান গাইলেও স্থানীয় কমিউনিটিতে “বাউল কুইন’’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।’

২০০৮ সালে শিরিনকে নিয়ে হাবিব প্রকাশ করেন আরেক ব্যবসাসফল অ্যালবাম ‘পাঞ্জাবিওয়ালা’। এই অ্যালবামে ‘পাঞ্জাবিওয়ালা’ শিরোনামের গানটি ছাড়াও ‘মনের বাগানে’, ‘ওরে আমার ময়না পাখি’, ‘শিখায়া পিরিতি’, ‘শাহজালাল বাবা’, ‘না জেনে ভুল করো না’, ‘প্রেম নদীতে’ এবং ‘খাজা তোমার’-এর মতো গানগুলো ছিল।

শাহ আবদুল করিমের সান্নিধ্যে
লোকসংগীতের মহাজন শাহ আবদুল করিমের গানের প্রতি হাবিবের ছিল বিশেষ অনুরাগ। ২০০৭ সালের দিকে হাবিব হেলালসহ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে গিয়েছিলেন এই বাউল কবির সঙ্গে দেখা করতে। সেই স্মৃতি রোমন্থন করে হাবিব বলেন, ‘ওনার সঙ্গে একবারই দেখা হয়েছিল। তখন ওনার স্মৃতিশক্তি কমে গেছে, শারীরিকভাবেও খুবই দুর্বল ছিলেন। কিন্তু উনি তারপরও চেষ্টা করছিলেন যতটুকু আন্তরিক হওয়া যায়।’ শাহ আবদুল করিমের ‘মায়া লাগাইছে’ এবং ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’—এই গান দুটি হাবিবের সংগীতে এক নতুন মাত্রা যোগ করে।

হাবিব-ন্যান্‌সি

হাবিব-ন্যান্‌সি
হাবিবের হাত ধরে উঠে এসেছেন ন্যান্‌সি। বাবা ফেরদৌস ওয়াহিদের মাধ্যমেই ন্যান্‌সির কণ্ঠের খোঁজ পান। তাঁদের প্রথম কাজ ছিল একটি বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেল। এরপর ‘তোমাকে ছেড়ে আমি কী নিয়ে থাকব’ গানের একটি ছোট অংশে কণ্ঠ দেন ন্যান্‌সি। এ জুটির হাত ধরে বাংলা সিনেমার আধুনিক গানে এসেছিল নতুন ধারা। হৃদয়ের কথা সিনেমার ‘ভালোবাসব বাসব রে’, আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা সিনেমার ‘পৃথিবীর যত সুখ’, এ ছাড়া ‘ডুব’, ‘মনের ভেতর’, ‘হাওয়ায় হাওয়ায় দোলনা দোলে’,  ‘দ্বিধা’ তাদের উল্লেখযোগ্য কাজ।

হাবিব বলেন, ‘প্রতিটা সংগীতায়োজকের একটা কমফোর্ট জোন থাকে। ন্যান্‌সির সঙ্গে কাজ করা আমার কাছে সেই কমফোর্ট জোন। ওর ভয়েসটা অনেক ইউনিক। পাশাপাশি শ্রোতারাও আমাদের জুটিকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন।’

গত বছরের ঈদ ইত্যাদিতে হাবিব ওয়াহিদ ও প্রীতম হাসান

আনিলাম অপরিচিতের নাম
অচেনা বা কম চেনা প্রতিভাদের সঙ্গে কাজ করতে ভালোবাসেন হাবিব ওয়াহিদ। এই ধারা বজায় আছে এখনো। আরফিন রুমি, ইমরান মাহমুদুল ও প্রীতম হাসানেরা নিজেদের ক্যারিয়ারে হাবিবের প্রভাব নিয়ে বহুবার বলেছেন। হাবিব বলেন, ‘যাঁরা আমার কথা বলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই অনেক ভালো মিউজিশিয়ান। মানুষের জীবনে কিছু সময় থাকে, যখন তাঁর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের কিছুটা ঘাটতি দেখা দেয়। এমন সময়ে হয়তো কিছু মানুষের পাশে থাকতে পেরেছি। আমার সমর্থন তাঁদের প্রেরণা জুগিয়েছে। এ ছাড়া আর কিছুই না, আমি কাউকে তৈরি করিনি। আমার মাধ্যমে তাঁরা হয়তো নিজেদের খুঁজে পেয়েছেন। আমিও তো একসময় নতুন ছিলাম। তখন কারও না কারও সমর্থন পেয়েই তো আজকের জায়গায় এসেছি। নতুন অবস্থায় মাইলস থেকে কি-বোর্ড বাজানোর প্রস্তাব পাই। এটা কিন্তু আমাকে আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল।’
হাবিব এখন নিজের ইউটিউব চ্যানেলের জন্য নানা রকম কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। গেয়েছেন এবার ঈদে প্রচারের অপেক্ষায় থাকা ‘ইত্যাদি’র জন্যও।