
এক যুগের পেশাদার সংগীতজীবনে হাজারের মতো বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেল, অর্ধশত ওয়েব ফিল্ম, সাতটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ আর নাটকে কাজ করেছেন। শুরু করেছেন নজরুলের শতাধিক গানের নতুন সংগীতায়োজনের কাজ। তবে তাঁর পথচলাটা মোটেও সহজ ছিল না। সময়ের আলোচিত সুরকার ও সংগীত পরিচালক জাহিদ নিরব-এর গল্প শুনেছেন মনজুর কাদের
জাহিদ নিরবের ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে ‘রকস্টার’। ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবিটির সব কটি গানেরই তিনি সংগীত পরিচালক, সমসাময়িক বাংলা চলচ্চিত্রে এমনটা খুব একটা দেখা যায় না। শুধু গান নয়, তাঁর করা ছবির আবহসংগীতও দর্শক-শ্রোতাদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
নিরবের মতে, আগে চলচ্চিত্রে কাজ করলেও রকস্টার তাঁকে সাধারণ দর্শকের কাছে নতুনভাবে পরিচিত করেছে। দেশের সবচেয়ে বড় তারকা শাকিব খানের সিনেমার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার খবর প্রকাশের পর থেকেই আলোচনায় ছিলেন তিনি। ফলে কাজের চাপের পাশাপাশি প্রত্যাশার ভারও ছিল অনেক। তবে ছবি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা হলেও আবহসংগীত নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য তাঁকে শুনতে হয়নি। তাঁর আক্ষেপ, আরও সময় পেলে কাজটি আরও পরিপূর্ণভাবে করতে পারতেন।
মুক্তির দিক থেকে নিরবের প্রথম চলচ্চিত্র ‘পদ্মাপুরাণ’ হলেও কাজের শুরুটা ‘পরাণ’ দিয়ে। এরও আগে চিরকুট ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে ‘আয়নাবাজি’ চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গান ‘না বুঝি দুনিয়া’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে ‘ময়ূরাক্ষী’, ‘দেশান্তর’, ‘উৎসব’ ও ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর মতো চলচ্চিত্রে গান ও আবহসংগীতের কাজ করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ওয়েব কনটেন্টেও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন নিরব। এখন পর্যন্ত ৪০টির বেশি ওয়েব ফিল্ম ও সিরিজে সংগীত পরিচালনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘মহানগর’, ‘হোটেল রিল্যাক্স’, ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’, ‘নিঃশ্বাস’, ‘দাগ’, ‘শুক্লপক্ষ’ এবং সর্বশেষ ‘লাইফলাইন’।
ভিটেহারা থেকে সংগ্রামের শুরু
মুন্সিগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীর তীরের ইদ্রাকপুর গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিরবের সংগীতের হাতেখড়ি বাবার কাছে। সংগীতে নিরবের হাতেখড়ি বাবা আনোয়ার হোসেনের কাছে। পরে তবলা শিখেছেন শরীফ মাহমুদ ও বাদল চন্দ্র সাহার কাছে। গিটার, কিবোর্ড ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছেন মিনহাজ বাবুর কাছ থেকে, যিনি কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। নিরব বললেন, ‘তিনি কোনো টাকা ছাড়া নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জে গিয়ে আমাকে গিটার এবং কিবোর্ড শেখাতেন। আব্বার কারণে এটা শিখিয়েছেন। দুই মাস। ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যালও তাঁর কাছে শিখেছি।’
বাবা আনোয়ার হোসেন ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই বাবা-ছেলে মিলে গান শেখাতেন, যা ছিল পরিবারের অন্যতম আয়ের উৎস। ২০০৫ সালে তাঁদের জীবনে বড় ধাক্কা আসে। প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের অধিগ্রহণে নিরবদের পৈতৃক বাড়িসহ এলাকার আরও ১১টি বাড়ি চলে যায়। ভিটেমাটি হারিয়ে পরিবারকে মুন্সিগঞ্জ শহরে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। একের পর এক বাসা বদল করে চলেছে সংসার। এসএসসি পাসের পর সরকারি হরগঙ্গা কলেজে ভর্তি হলেও সংগীতের ব্যস্ততায় পড়াশোনা আর এগোয়নি। পরিবারের দায়িত্বও এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। মা–বাবা ও দুই ভাইয়ের সংসারে উপার্জনের ভরসা হয়ে ওঠেন জাহিদ নিরব।
২০১২ সালে স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় আসেন নিরব। কিন্তু শুরুটা ছিল কঠিন। স্টুডিওর পাশের ছোট একটি কক্ষে আরও দুজনের সঙ্গে থাকতেন। অর্থ সাশ্রয়ের জন্য দিনের পর দিন এক বেলা খেয়ে কাটিয়েছেন। কখনো বিস্কুট বা পাউরুটি খেয়েই রাত পার করেছেন। আবার কখনো অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার ভাড়া বাঁচাতে নারায়ণগঞ্জের ফুটপাতের টংদোকানে ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন প্রথম বাস বা ট্রেনের জন্য।
কিবোর্ডিস্ট হিসেবে জাহিদ নিরবের যাত্রা শুরু মাত্র ৫০০ টাকায়, স্কুলজীবনে। ঢাকায় এসে সেই সম্মানী বেড়ে হয় দেড় হাজার টাকা। পরে চিরকুট ব্যান্ডে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে ভাগ্য। একসময় কিবোর্ড বাজিয়েই সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা সম্মানী পেয়েছেন, যা তাঁর কল্পনারও বাইরে ছিল। চিরকুটের সঙ্গে এক দশকের পথচলা, শত শত কনসার্ট, হাজারের বেশি বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল, শত শত নাটক, ওয়েব কনটেন্ট এবং চলচ্চিত্রে কাজ—সব মিলিয়ে আজ দেশের সংগীতাঙ্গনের পরিচিত মুখ। সময়ের পরিক্রমায় যে পরিবার একসময় ভিটেমাটি হারিয়ে ভাড়া বাসায় ঘুরে বেড়িয়েছে, সেই পরিবারের জন্য নিজের উপার্জনে মুন্সিগঞ্জের পঞ্চসারে জমি কিনে বাড়ি তৈরি করেছেন তিনি। ঐতিহ্যবাহী কাঠের দোতলা সেই বাড়িতে ব্যস্ততার ফাঁকে ঢাকার নিকেতনের বাসা থেকে মাঝেমধ্যে ছুটে যান স্ত্রীসহ নিরব, তাঁর মা–বাবা ও ছোট ভাই।
ভাড়া বাঁচাতে টংদোকানে রাত
পেশাদার সংগীতজীবনের শুরুর দিকে নারায়ণগঞ্জেই সবচেয়ে বেশি স্টে শো করতেন নিরব। ঢাকায় আসার পরও প্রায় দুই বছর নিয়মিত সেখানে পারফর্ম করতে যেতেন। কিবোর্ডিস্ট হিসেবে তখন একটি অনুষ্ঠানে তাঁর সম্মানী ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা। কিন্তু সেই আয়ের তুলনায় যাতায়াত খরচ ছিল ভাবনার বিষয়। নিরব জানালেন, অনেক সময় রাত ১২টার দিকে অনুষ্ঠান শেষ হতো। তখন মগবাজারে ফিরতে সিএনজি ভাড়া লাগত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। সেই খরচ বাঁচানোর জন্য তিনি রাতে ঢাকায় ফিরতেন না। ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করে বাস বা ট্রেনে করে ফিরতেন।
বললেন, ‘রাত ১২টা থেকে সকাল ৬–৭টা—এই দীর্ঘ সময় কাটত নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া মোড়ের ফুটপাত আর টংদোকানে। শো শেষে অনেক শিল্পী ও পরিচিতজনেরা সেখানে আড্ডা দিতেন। রাত তিনটা-চারটা পর্যন্ত সময়টা কোনোভাবে কেটে গেলেও ভোরের আগের কয়েক ঘণ্টা ছিল সবচেয়ে কঠিন। সবাই চলে যাওয়ার পর একা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম প্রথম বাস বা ট্রেনের জন্য।’
২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এমন অসংখ্য রাত কেটেছে তাঁর। তবে সেই সময়টায় কখনো হতাশা হননি নিরব। বরং এটিকে দেখেছেন নিজের ভবিষ্যতের আশীর্বাদ হিসেবে। তিনি বললেন, ‘তখন আশপাশের অনেকেই একই সম্মানী পেয়ে নেশাটেশা করে টাকা খরচ করলেও তিনি সঞ্চয়ের চেষ্টা করেছেন। আয়ের বেশির ভাগ অর্থই তুলে দিতাম আব্বাকে।’
২০১৩ সালে তাঁর মা–বাবা ও ছোট ভাই ঢাকায় চলে আসেন। এরপর পরিবারের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন নিরব। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই আলাদা থাকায় পরিবারের দায়িত্ব অনেকটাই এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। শুরুতে মগবাজারে, পরে নিকেতনে বসবাস শুরু করে পরিবারটি। এখনো তাঁর বাবা সেখানে সংগীতের তালিম দিয়ে যাচ্ছেন।
এক বেলা খেয়ে কাটত দিন
জাহিদ নিরবের আজকের অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। ঢাকায় এসে সংগীতকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পথটা তাঁর জন্য মোটেও সহজ ছিল না। কখনো ভাড়া করা কিবোর্ড নিয়ে কনসার্টে যেতে হয়েছে, কখনো আবার দিনের পর দিন এক বেলা খেয়ে কাটাতে হয়েছে। ২০১২ সালে ঢাকায় এসে অরবিট ব্যান্ডে কিবোর্ডিস্ট হিসেবে যাত্রা শুরু নিরবের। তখন মগবাজারে ব্যান্ডের স্টুডিওর পাশের একটি ছোট রুমে আরও দুজনের সঙ্গে থাকতেন। এর আগে তিনি অংশ নিয়েছিলেন ‘গেট সেট রক’ রিয়েলিটি শোতে, যেখানে বিচারকের আসনে ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু, বাপ্পা মজুমদার ও পিলু খান। সেই প্রতিযোগিতায় কিবোর্ডিস্ট হিসেবে সেরা চারে জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অরবিট ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেন নিরব। পাশাপাশি আরও কয়েকটি ব্যান্ডে বাজানোর পাশাপাশি শিল্পী আগুন, কনা ও কোনালের সঙ্গেও পারফর্ম করেছেন।
তবে সেই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনৈতিক সংকট। নিরব জানালেন, অরবিটে বাজানো শুরু করার সময় তাঁর নিজের কোনো কিবোর্ডই ছিল না। ভাড়া করা কিবোর্ড নিয়ে অনুষ্ঠান করতে যেতেন। চিরকুটে যোগ দেওয়ার মাত্র দুই-তিন মাস আগে নিজের প্রথম কিবোর্ড কিনতে সক্ষম হন। তখন একটি ভালো কিবোর্ডের দাম ছিল লাখ টাকার বেশি, যা তাঁর জন্য ছিল বিশাল একটি বিনিয়োগ। মজার বিষয় হলো, যাঁদের কাছ থেকে তিনি কিবোর্ড ভাড়া নিতেন, তাঁদের অনেকেই ভাড়া নিতে চাইতেন না। কখনো কখনো ২০০-৩০০ টাকা দিলেই হয়ে যেত। তখন একটি অনুষ্ঠানে কিবোর্ড বাজিয়ে তাঁর সম্মানী ছিল মাত্র দেড় হাজার টাকা।
ঢাকার প্রথম বছরটি ছিল সবচেয়ে কঠিন। সেই সময়ের কথা মনে করলেন এভাবে, ‘খাবারের খরচ বাঁচানোর জন্য ইচ্ছা করেই দেরি করে ঘুম থেকে উঠতাম, যাতে এক বেলা খেয়েই দিন পার করা যায়। মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পাশে একটি ছোট রেস্তোরাঁ ছিল, সেখানে একটি ডিম কিনলেই ভাত ও ডাল মিলত। ২৫ থেকে ৩০ টাকার মধ্যেই লাঞ্চ কিংবা ডিনার সেরে নিতে পারতাম।’
দিনের বেশির ভাগ সময় না খেয়ে কাটত। রাত জেগে কাজ করার পর বিস্কুট বা পাউরুটি খেয়ে ঘুমাতে যেতেন। বিকেল কিংবা সন্ধ্যার দিকে ঘুম থেকে উঠে রাত আটটার মধ্যে দিনের একমাত্র ভারী খাবার খেয়ে নিতেন। এভাবেই কেটেছে ঢাকার শুরুর বছরটা। সংগ্রামের সেই দিনগুলো অবশ্য স্থায়ী হয়নি। ঢাকায় আসার দুই বছরের মধ্যেই তাঁর শো বাড়তে শুরু করে। এমনও সময় গেছে, এক মাসে প্রায় ৩০টি কনসার্টে পারফর্ম করেছেন তিনি। ২০১৪ সালের শেষ দিকে পরিচয় হয় জনপ্রিয় ব্যান্ড চিরকুট-এর সদস্যদের সঙ্গে। ২০১৫ সালের জুনে ব্যান্ডটির স্থায়ী সদস্য হিসেবে যোগ দেন। টানা এক দশক চিরকুটের সঙ্গে কাজ করার পর ২০২৪ সালের শেষ দিকে ব্যান্ড ছেড়ে একক সংগীতজীবনে মনোযোগ দেন। নিকেতনে সাউন্ড অব সাইলেন্স নামে একটি স্টুডিও বানিয়েছেন, যেখানে নাটক, ওয়েব ফিল্ম, চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ, বিজ্ঞাপনচিত্র ও গান রেকর্ডিংয়ের কাজ নিয়মিত হচ্ছে।
ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প
সংগীতাঙ্গনে জাহিদ নিরবের পথচলা মোটেও খুব সহজ ছিল না। দীর্ঘ সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়েই আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন তিনি। সেই যাত্রার অন্যতম মোড় ঘোরানো ঘটনা ঘটে ২০১৪ সালে, যখন তাঁর পরিচয় হয় চিরকুট ব্যান্ডের সদস্য পাভেল আরীনের সঙ্গে। পরের বছর চিরকুটে যোগ দেওয়া এবং পাভেল আরীনের স্টুডিও ‘বাটার কমিউনিকেশন’-এ কাজ শুরু করাই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হয়ে ওঠে।
তবে তখনো আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। জানালেন, অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চিরকুটের কনসার্ট নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটলেও বছরের বাকি সময় কাজের সংকট দেখা দিত। এমন দিনও গেছে, যখন নিকেতন থেকে পান্থপথে যাওয়ার রিকশা ভাড়াটুকুও তাঁর কাছে ছিল না। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে থাকায় নিজের চেয়ে বেশি ভাবতে হতো পরিবারের প্রয়োজনের কথা।
ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। বাটার কমিউনিকেশনের অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি চিরকুটের অন্য সদস্যদের মতো সমান সম্মানী পেতে শুরু করেন জাহিদ নিরব। একসময় সেই সম্মানীর পরিমাণ স্টেজ শো প্রতি লাখ টাকার ঘরও ছাড়িয়ে যায়। ২০২০ সালের পর থেকে তাঁর আর্থিক চাপ অনেকটাই কমে আসে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখে বিজ্ঞাপনচিত্রের কাজ। নিরব জানান, ২০১৭ সাল থেকে বিজ্ঞাপনের জিঙ্গেল ও সংগীতায়োজনের কাজ নিয়মিত করতে শুরু করেন। গত ৯ বছরে তিনি এক হাজারের বেশি বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেল তৈরি করেছেন, যা তাঁকে এই অঙ্গনের অন্যতম ব্যস্ত সংগীতকর্মী বানিয়েছে।
জাহিদ নিরবের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে নির্মাতা রেদওয়ান রনি পরিচালিত ‘মিস্টার জনি’র আবহসংগীত। পরে নিজের সুর ও কণ্ঠে গাওয়া ‘এ মন তোমার মনে’ গানটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। মুনতাশির আকিব পরিচালিত ‘প্রেমিক ১৯৮২’ নাটকে ব্যবহৃত গানটি শ্রোতাদের নজর কাড়ে। তবে নাটকের সংগীতাঙ্গনে তাঁর পরিচিতি সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে ‘ক্লোজআপ কাছে আসার গল্প’ প্রকল্পে কাজ করার মাধ্যমে। ২০২০ সালে প্রথমবার এই প্ল্যাটফর্মে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর টানা চার বছর যুক্ত থেকে একের পর এক জনপ্রিয় কাজ উপহার দেন।
এত কষ্ট, এত চ্যালেঞ্জ, পরিবারের চাপ, টিকে থাকার সংগ্রাম, না খেয়ে দিন পার—কিসে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন এমন প্রশ্নে নিরবের উত্তর, ‘এত ছোট ছিলাম, এভাবে কখনো ভেবেও দেখি নাই। বরঞ্চ ওই কষ্টগুলো আশীর্বাদ ছিল বলে মনে হয়।’
নজরুলসংগীত, ভিন্ন উদ্যোগ
নজরুলসংগীতের প্রতি ছোটবেলা থেকেই আলাদা ভালো লাগা জাহিদ নিরবের। ছোটবেলায় নিয়মিত নজরুলের গান গাইতেন, প্রশংসাও পেতেন। সেই ভালোবাসাই এখন রূপ নিয়েছে বড় এক সংগীত প্রকল্পে। কাজী নজরুল ইসলামের গান নিয়ে নিরব শুরু করেছেন দ্য নজরুল ট্যাপস’ নামে একটি প্রকল্প। এতে মোট ১২৮টি গান নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে ছয়টি গান বানিয়েছেন তিনি। আধুনিক ও ইলেকট্রনিক সাউন্ডের মাধ্যমে নজরুলসংগীতকে নতুনভাবে উপস্থাপন করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। নিরব বললেন, ‘মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর পর নজরুলসংগীতের বড় পরিসরে মানসম্মত রেকর্ডিং খুব একটা হয়নি। অন্যদিকে রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে নিয়মিত নানা ধরনের কাজ হচ্ছে। এটা ঠিক, নজরুলের গান গাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি প্রচলিত উপস্থাপনার কারণে সাধারণ শ্রোতার অনেকেই এই গানগুলোর সঙ্গে সহজে কানেক্ট হতে পারেন না। তাই নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে নজরুলসংগীতকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে আধুনিক সাউন্ড ডিজাইনের মাধ্যমে গানগুলো উপস্থাপন করতে চাই।’
দ্য নজরুল ট্যাপস-এ এরই মধ্যে কণ্ঠ দিয়েছেন জাহিদ নিরব, শামীম, ইউসুফ ও দোলা রহমান। দেশের প্রথম সারির আরও অনেক শিল্পীকে এই প্রকল্পে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। নজরুলের গানকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরে সমকালীন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগকে নিজের সংগীতজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলেই মনে করেন জাহিদ নিরব।
স্বপ্ন তাঁর গ্র্যামির
বাংলা সংগীতকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার স্বপ্ন দেখেন সংগীতশিল্পী ও সংগীত পরিচালক জাহিদ নিরব। তাঁর বিশ্বাস, গ্র্যামি জয় বাংলাদেশের শিল্পীদের জন্য অসম্ভব কিছু নয়। তবে এ জন্য আন্তর্জাতিকভাবে নিবন্ধিত রেকর্ড লেবেলের সঙ্গে কাজ করতে হবে এবং সঠিক প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে। নিরবের মতে, সংগীত কোনো প্রতিযোগিতা নয়; এটি অনুভূতি প্রকাশের শিল্প। যে সৃষ্টি মানুষের হৃদয় সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করবে, সেটিই বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেবে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সাফল্য পাওয়া সম্ভব। ফিউশনের চেয়ে নিজস্ব ঘরানা ও শিকড়নির্ভর সংগীতে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষপাতী তিনি।
সংগীতে নিরবের হাতেখড়ি বাবা আনোয়ার হোসেনের কাছে। পরে তবলা শিখেছেন শরীফ মাহমুদ ও বাদল চন্দ্র সাহার কাছে। গিটার, কিবোর্ড ও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম নিয়েছেন মিনহাজ বাবুর কাছ থেকে, যিনি কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। নিরব বললেন, ‘তিনি কোনো টাকা ছাড়া নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জে গিয়ে আমাকে গিটার এবং কিবোর্ড শিখাতেন। আব্বার কারণে এটা শিখিয়েছেন। দুই মাস। ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যালও তাঁর কাছে শিখেছি।’
প্রযুক্তিকে সংগীতযাত্রার সহায়ক মনে করেন নিরব। ইন্টারনেট ও ইউটিউবের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন ধারার সংগীত সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছেন। কোরিয়ান কে-পপ যেভাবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে, তেমনি বাংলাদেশি সংগীতও একদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করবে—এমনটাই তাঁর প্রত্যাশা। নিরবের অনুপ্রেরণার তালিকায় রয়েছেন ওস্তাদ মেহেদী হাসান, লতা মঙ্গেশকর, গুলাম আলী, আরিজিৎ সিং, ক্রিস্টিনা অ্যাগুইলেরা, ডেমিয়েন রাইস ও মাইকেল জ্যাকসন। আর বাংলাদেশের গিটারিস্ট ইমন চৌধুরী ও ভারতের সঞ্জয় দাস তাঁর আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণার বড় উৎস। বিশ্বমঞ্চে বাংলা সংগীতের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলাই এখন জাহিদ নিরবের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।