আশা ভোসলেকে নিয়ে লিখেছেন বাংলাদেশের বরেণ্য সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন
আশা ভোসলেকে নিয়ে লিখেছেন বাংলাদেশের বরেণ্য সংগীতশিল্পী  সাবিনা ইয়াসমীন

‘আশাজি হাসিমুখে জানান, মাছ-ভাত আর রসগোল্লা তাঁর খুব প্রিয়’

শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে পপ গান—দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নানা ধরনের গান গেয়েছেন তিনি। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও কম নাটকীয় নয়। তবে পারিবারিক অশান্তি ও উপার্জনের চাপ সামলে বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের ছায়া থেকে বেরিয়ে ঠিকই নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছিলেন আশা ভোসলে। ভারতের এই প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী গতকাল মারা গেছেন। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন বাংলাদেশের বরেণ্য সংগীতশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন

১৯৭৮ বা ১৯৭৯ সালে আশাজির (ভোসলে) সঙ্গে আমার প্রথম সরাসরি দেখা। প্রথম দেখাতেই তাঁর ব্যক্তিত্ব, নম্রতা আর ভদ্রতা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। সেবার তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। শেরাটন হোটেলে তাঁর গান শুনতে গিয়েছিলাম। পরে ব্যাক স্টেজে গিয়ে দেখা করলে খুব আন্তরিকভাবে বললেন, ‘তোমাদের গান খুব বেশি শোনার সুযোগ পাই না, তবে কিছু গান শুনেছি; খুব ভালো লেগেছে। তোমার নাম শুনেছি, তোমার গানও শুনেছি।’

অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কোন গানটি শুনেছেন?’
বললেন, ‘জন্ম আমার ধন্য হলো—এত সুন্দর গেয়েছ!’
আবার জানতে চাইলাম, কোথায় শুনেছেন?
আশাজি জানান, বোম্বেতে একটি অনুষ্ঠানে গানটি আমি গেয়েছিলাম, সেই অনুষ্ঠানেরই একটি রেকর্ড তিনি শুনেছেন।
এ কথা শুনে আমি আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিলাম।

২.
১৯৮০ সালে ‘অন্যায় অবিচার’ ছবির গানে কণ্ঠ দিতে বোম্বে যাই। সেখানে আবার তাঁর সঙ্গে দেখা। আর ডি বর্মনের সঙ্গে স্টুডিওতে মহড়া করছিলাম। কিছুক্ষণ পর আশাজি এলেন। দেখা হওয়ার পর আবারও বললেন, ‘তোমার নাম শুনেছি, গানও শুনেছি—খুব ভালো গাও।’ সেদিন ছিল ‘ছেড়ো না ছেড়ো না হাত’ গানটির রেকর্ডিং, সহশিল্পী কিশোর কুমার। বাংলা ও হিন্দি—দুই ভাষাতেই কাজ হচ্ছিল। আমি গান তুলছিলাম, আশাজি চুপচাপ শুনছিলেন। হঠাৎ আর ডিকে বললেন, “এই গানের জন্য একদম পারফেক্ট কণ্ঠ নির্বাচন করেছ।’”

সাবিনা ইয়াসমিন

ছবির পরিচালক শক্তি সামন্তও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনিও তাঁর কথায় সায় দিলেন। এত বড় মাপের শিল্পীর কাছ থেকে এমন প্রশংসা পেয়ে আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। বারবার বলছিলাম, ‘কী বলছেন এসব!’ আশাজি একটু একটু বাংলা বলছিলেন। হাসিমুখে জানান, মাছ-ভাত আর রসগোল্লা তাঁর খুব প্রিয়।
আমি বললাম, ‘আরে বাহ্‌, খুব ভালো তো!’ তাঁর ব্যবহার আমাকে সব সময় মুগ্ধ করেছে। তাঁরা দুই বোনই এমন—লতাজির (মঙ্গেশকর) সঙ্গেও যখন পরিচয় হয়েছে, একই অনুভূতি হয়েছে। তাঁর গান সম্পর্কে বলার মতো দুঃসাহস বা স্পর্ধা আমার নেই। একজীবনে তাঁর কত বাংলা ও হিন্দি গান শুনেছি—সবই মনের ভেতরে গেঁথে আছে।
আজ সকালে প্রথম শুনলাম, তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন। ফেসবুকে খবরটি দেখে খুব দোয়া করছিলাম, যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন; কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তাঁর মৃত্যুসংবাদ পেলাম। কথাই বলতে পারছিলাম না। চোখ ভিজে আসছিল। মনে হচ্ছিল, যেন নিজের মা–বাবার মতো কেউ চলে গেলেন।

অল্প সময়ের এই দেখাগুলো থেকেই আমার উপলব্ধি—আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আমরা যেন সব সময় ভদ্র ও নম্র থাকি। যত বড় শিল্পীই হই না কেন, আচরণে সেই সৌজন্য ও বিনয় যেন বজায় থাকে। আমার জীবনে আশাজি যে কত বড় প্রভাব বিস্তার করেছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তাঁর অনেক গান আয়ত্ত করার চেষ্টা করেছি, মাঝেমধ্যে গেয়েছিও। শাস্ত্রীয় সংগীত যেন তিনি ভাজা ভাজা করে ফেলেছেন—অসাধারণ নিখুঁত দক্ষতা। আবার চটুল গানেও সমান। তাঁর প্রতিটি ধরনের গানই আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে—এখনো করে, আগামীতেও করবে।

(অনুলিখিত)