
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দীর্ঘ সৃজনজীবনের পথচলা-১৬ বছরের কিশোর বয়স থেকে আশির কোঠার ঋদ্ধ পরিণতি—এই বিস্তৃত সময়কে সুর, কবিতা ও ভাষ্যপাঠের মেলবন্ধনে তুলে ধরল ব্যতিক্রমধর্মী আয়োজন ‘যাত্রাপথের আনন্দগান’। গত ৩০ জানুয়ারি শুক্রবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানটি দর্শক-শ্রোতাদের নিয়ে যায় রবীন্দ্রসৃষ্টির ভেতরের পথে—যেখানে আনন্দ, প্রশ্ন, অপেক্ষা ও নীরবতা একসূত্রে গাঁথা।
ব্যতিক্রম এ আসরে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির ভেতরের দর্শন ও তাঁর সৃজনশীল পথচলার বাঁকগুলোকে সংগীত ও কবিতার মাধ্যমে তুলে ধরেন ফাহিম হোসেন চৌধুরী, সঞ্চিতা রাখি এবং স্বীকৃতি প্রসাদ বড়ুয়া। যন্ত্রানুষঙ্গে অংশ নেন গৌতম কুমার সরকার, রবিন্স চৌধুরী, অশোক কুমার সরকার, মো. নাসির উদ্দীন ও ওস্তাদ মো. মনিরুজ্জামান।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই দর্শক-শ্রোতাদের নিয়ে যাওয়া হয় রবীন্দ্রনাথের কৈশোরে; ভানুসিংহের পদাবলী থেকে নেওয়া ‘গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে’ গান দিয়ে শুরু হয় যাত্রা। গানের কথায় আছে—ভালোবাসার মানুষটি চোখের আড়ালে থাকলেও বিশ্বাস যেন হারিয়ে না যায়, এই অনুভূতিই যেন আসরের ছন্দ ধরিয়ে দেয়। এরপর আসে ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’। জীবনের চলার পথে হঠাৎ করে যাকে দেখা যায়—অল্প সময়ের জন্য, ক্ষণিকের জন্য—সেই দেখা পাওয়ার আনন্দই এই গানের কথা। আলো যেমন হঠাৎ এসে আবার মিলিয়ে যায়, তেমনি এই গানও পথচলার মাঝখানে পাওয়া একমুহূর্তের উজ্জ্বলতা। সঞ্চিতা রাখির কণ্ঠে পরবর্তী পরিবেশনা ‘হৃদয়ের একূল ওকূল’।
মানুষ যখন জীবনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে পড়ে—না পারে ফিরে যেতে, না পারে সামনে এগোতে—ঠিক সেই দ্বিধার জায়গাটাকেই এই গান সহজ ভাষায় প্রকাশ করে। দুই তীরের মাঝখানে দাঁড়িয়েও যে বিশ্বাস রাখা যায়, সেই আস্থার কথাই এখানে ধরা পড়ে। পরের পরিবেশনা, ‘আজি যত তারা তব আকাশে’। চারপাশে অন্ধকার থাকলেও আকাশে যে তারা জ্বলে আছে, এই গান মনে করিয়ে দেয়—ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আলো এখনো আছে, আশাও আছে।
এরপর ‘কোথা হতে বাজে’ গানটি যেন একটি গভীর উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। জীবনের আনন্দ কোথা থেকে আসে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে। এই ভাবনারই বিস্তার ঘটে ‘জগতে আনন্দ যজ্ঞে’ গানে। এখানে আনন্দ কোনো ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; বরং কাজ, সৃষ্টি ও চলমানতার সঙ্গে যুক্ত থাকার নামই আনন্দ।
ফাহিম হোসেন চৌধুরীর পরিবেশনায় একের পর এক গান—‘নয়ন ছেড়ে গেলে চলে’, ‘তাই তোমার আনন্দ আমার এ পথ’, ‘আমি আছি তোমার সভার’, ‘আমায় থাকতে দে’, ‘সেই ভালো সেই ভালো’, ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে’। নির্বাচিত প্রতিটি গানের আগে গানের পেছনের গল্প ও কবিতার পাঠ দর্শক-শ্রোতাদের আরও গভীরভাবে যুক্ত করে রাখে। এখানে গান শুধু শোনা হয়নি, গান হয়ে উঠেছে জীবনের কথা বলার এক সহজ ভাষা।
রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিজীবনকে কোনো নির্দিষ্ট বয়সে আটকে না রেখে, এক দীর্ঘ যাত্রা হিসেবে দেখার এই প্রয়াস—‘যাত্রাপথের আনন্দগান’, সেদিনের উপস্থিত শ্রোতাদের জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবে এক ব্যতিক্রমধর্মী সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে। এখানে গান শুধু সুর নয়, গানই হয়ে উঠেছে পথ, আর সেই পথের নামই আনন্দ।