হাজার হাজার মানুষের উল্লাস, মঞ্চে প্রিয় শিল্পী, চারদিকে গান আর আলো—কনসার্ট মানেই আনন্দের মুহূর্ত; কিন্তু সেই কনসার্টের আনন্দঘন মুহূর্ত যেন বিভীষিকায় রূপ নেয়। সংগীত উৎসব মুহূর্তেই পরিণত হয় ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে। কোথাও আগুন, কোথাও অতিরিক্ত ভিড়, কোথাও নিরাপত্তার ঘাটতি, আবার কোথাও সন্ত্রাসী হামলাসহ বেশ কিছু কারণে বহু দর্শককে প্রাণ দিতে হয়। তেমন কিছু ঘটনাই বিশ্বের লাখো সংগীতভক্তকে চমকে দিয়েছিল।

কিস নাইট ক্লাব পরিণত হয় নরকে
মাত্র কয়েক মিনিটেই যেন আগুনের নরকে পরিণত হয়। সময়টা ২৭ জানুয়ারি ২০১৩। ব্রাজিলের সান্তা মারিয়ার কিস নাইট ক্লাবে পার্টি চলছিল। মঞ্চে পারফর্ম করছিল গুরিজাদা ফানদাঙ্গুয়েইরা ব্যান্ড। পারফরম্যান্সের সময় ব্যবহৃত পাইরোটেকনিকসের আগুন ছাদের শব্দনিরোধক ফোমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বিষাক্ত ধোঁয়ায় ভরে যায় ক্লাব।
আগুনের পাশাপাশি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় বের হওয়ার ব্যবস্থা। জরুরি নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নির্দেশনার ঘাটতি ছিল। আতঙ্কে মানুষ বের হওয়ার চেষ্টা করলে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা। বেশির ভাগ মানুষ ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে নিয়েই মারা যান। এতে মোট ২৪২ জন প্রাণ হারান এবং ৬৩০ জনের বেশি আহত হন। ঘটনাটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে পরে ব্রাজিলে নাইট ক্লাব ও বিনোদনকেন্দ্রের অগ্নিনিরাপত্তা আইন নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি ওঠে।
কনসার্টে আতশবাজির আগুনে ১৯৪ মৃত্যু
২০০৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর। আর্জেন্টিনার রক ব্যান্ড কায়েহেরোসের কনসার্টে দর্শকে পরিপূর্ণ ছিল বুয়েনস এইরেসের রেপুবলিকা ক্রোমানন ক্লাব। কনসার্ট চলার সময় ছোড়া আতশবাজির আগুন ছাদের দাহ্য উপাদানে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শুরু হয় ধোঁয়া, আতঙ্ক ও বেরিয়ে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা। এখানেও অতিরিক্ত দর্শক, নিরাপত্তার ঘাটতি এবং জরুরি নির্গমন পথ নিয়ে গুরুতর সমস্যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ১৯৪ জনের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি আর্জেন্টিনায় কনসার্ট ও নাইট ক্লাবের নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেয়।
মঞ্চের আতশবাজি থেকে মৃত্যুফাঁদ
ঘটনাস্থল ওয়েস্ট ওয়ারউইক, রোড আইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র। সেদিন ছিল ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৩। রক ব্যান্ড গ্রেট হোয়াইট পারফর্ম শুরু করার কয়েক মুহূর্তের মধ্যে মঞ্চের আতশবাজিতে দেয়াল ও ছাদের শব্দনিরোধক ফোমে আগুন ধরে যায়। আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে দর্শকদের বেরোনোর সময় ছিল মাত্র কয়েক মুহূর্ত। মানুষ দরজার দিকে ছুটতে শুরু করলে সেখানে ভয়াবহ জটলা তৈরি হয়। হাজারো মানুষের চাপাচাপিতে ১০০ জন মারা যান এবং ২০০ জনের বেশি আহত হন। দ্য স্টেশন নাইট ক্লাবের এ ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে বিনোদনকেন্দ্রে পাইরোটেকনিকস এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। রোড আইল্যান্ডের আইনসভাও পরে এ দুর্ঘটনার স্মরণে নতুন অগ্নিনিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে।
ভয়াবহ ক্রাউড টারবুলেন্স, ছিল মৃত্যুর ফাঁদ
২৪ জুলাই ২০১০। জার্মানির ডুইসবুর্গে ইলেকট্রনিক মিউজিক উৎসব লাভ প্যারেডে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। উৎসবস্থলে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথের একটি সংকীর্ণ অংশে মানুষের ঘনত্ব বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যায়। মানুষ সামনে এগোতে না পারলেও পেছন থেকে চাপ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মানুষ পড়ে যেতে শুরু করলে তৈরি হয় ভয়াবহ ক্রাউড টারবুলেন্স, একজনের ওপর আরেকজন পড়ে যেতে থাকেন। এ ঘটনায় ২১ জন মারা যান এবং ৬৫০ জনের বেশি আহত হন। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা দেয়—ভিড়ের দুর্ঘটনা সব সময় ‘প্যানিক’ থেকে হয় না, অতিরিক্ত ঘনত্ব ও মানুষের পারস্পরিক চাপই কখনো প্রাণঘাতী হতে পারে।
মঞ্চের দিকে ছুটে গেলেন ৫০ হাজার মানুষ, অতঃপর...
৫ নভেম্বর ২০২১। র্যাপার ট্রাভিস স্কটের অ্যাস্ট্রোওয়ার্ল্ড ফেস্টিভ্যালে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। শিল্পীর পারফরম্যান্সের সময় দর্শকদের একটি বড় অংশ মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলে ভিড় বাড়তে থাকে। মানুষ এতটাই চাপে পড়ে যাযন যে অনেকে হাত পর্যন্ত নাড়াতে পারছিলেন না। চিকিৎসা পরীক্ষায় ১০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে শ্বাস নিতে না পারাকে চিহ্নিত করা হয়। মৃত ব্যক্তিদের বয়স ছিল ৯ বছর থেকে ২৭ বছরের মধ্যে। প্রায় ৩০০ জন ঘটনাস্থলে চিকিৎসা নেন এবং ২৫ জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। অ্যাস্ট্রোওয়ার্ল্ডের পর কনসার্টে ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে জরুরি পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠান বন্ধ করা।
গান শেষ হওয়ার পর আত্মঘাতী বোমা
২২ মে ২০১৭। আরিয়ানা গ্র্যান্ডের কনসার্ট শেষ হয়েছে। তরুণ দর্শকেরা অ্যারেনা থেকে বেরিয়ে আসছিলেন, অনেকে বাইরে অপেক্ষা করছিলেন স্বজনদের জন্য। ঠিক তখনই অ্যারেনার সিটি রুম এলাকায় আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়। ব্রিটিশ সরকারি তদন্ত অনুযায়ী, হামলায় ২২ জন নিহত হন এবং বহু মানুষ আহত হন। নিহত মানুষের মধ্যে শিশুসহ তরুণেরা ছিলেন। ম্যানচেস্টারে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে পরে ‘গ্লেড অব লাইট’ নামে স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়।