তখন অনুষ্ঠান পুরোদমে জমে উঠেছে। উচ্ছ্বাসে মুখর ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন। একের পর এক গান গেয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। অনুষ্ঠান শেষের দিকে, ঠিক এমন সময় অভিনয়শিল্পী আফজাল হোসেনকে অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করার জন্য হ্যান্ডশেক করে ধন্যবাদ জানালেন রুনা লায়লা। তবে সেই মুহূর্তেই স্বভাবসুলভ রসবোধে রুনা লায়লা এমন একটি কথা বললেন, যা শুনে পুরো মিলনায়তনের দর্শক উচ্চ স্বরে হেসে ওঠেন।
গতকাল শুক্রবার ঢাকার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় রুনা লায়লার একক সংগীতানুষ্ঠান ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’। পুরো অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন দেশের নন্দিত অভিনেতা, নির্মাতা ও চিত্রকর আফজাল হোসেন।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে আফজাল হোসেনকে মঞ্চে ডেকে রুনা লায়লা বলেন, ‘আপনি আপনার ব্যস্ততার মাঝেও সময় করে এসেছেন, এ জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।’ এরপর তাঁর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করেই বলেন, ‘আমি কিন্তু সবার সঙ্গে হাত মেলাই না। কারণটাও জেনে নেন—আংটিগুলো আছে না, এগুলো যদি হুট করে কেউ নিয়ে নেয়!’ কথাটি বলেই হেসে ওঠেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে পুরো মিলনায়তনও হাসিতে মেতে ওঠে। এরপর আবার মজার ছলে তিনি বলেন, ‘কিন্তু উনি (আফজাল হোসেন) তো নিরাপদ।’
রুনা লায়লার হাতে থাকা হীরার আংটির সংগ্রহ নিয়ে ভক্তদের কৌতূহল বহুদিনের। ১৫ বছর বয়সে করাচিতে মা আমিনা লায়লার কাছ থেকে পাওয়া একটি ডায়মন্ডের আংটি দিয়েই শুরু হয়েছিল তাঁর এই সংগ্রহ। পরে পেশাদার সংগীতজীবনে নিজের পছন্দে আরও নানা হীরার আংটি সংগ্রহ করেন তিনি। মঞ্চে তাঁর পরিবেশনার মতোই হাতে থাকা বাহারি আংটিগুলোও বরাবরই দর্শকের দৃষ্টি কাড়ে।
রুনা লায়লার কথার পর স্মৃতিচারণা করেন আফজাল হোসেন। প্রায় ৪০ বছর আগের একটি ঘটনার কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমাদের জীবনের বিস্ময়গুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা আজও সেই বিস্ময় হয়ে আছেন।’
বাংলাদেশ টেলিভিশনের শুরুর দিনের স্মৃতি মনে করে আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমি তখন নতুন অভিনয় শুরু করেছি। রিহার্সাল শেষে দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছি। আর রুনা লায়লা স্টুডিও থেকে বের হয়ে আসছেন। তিনি আমাকে দেখেননি, কিন্তু আমি দূর থেকে তাঁকে দেখছিলাম। হঠাৎ কথাটা মনে হলো, মাথাটা তখন যেন ঘুরছে। আমি সিঁড়ির রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’
কেন এমন অনুভূতি হয়েছিল, তার ব্যাখ্যায় আফজাল হোসেন বলেন, ‘আমরা তারকাখ্যাতির অনেক রূপ দেখেছি। সময়ের সঙ্গে অনেকের সেই দীপ্তি ম্লান হয়ে যায়। কিন্তু রুনা লায়লা নিজেকে যেভাবে বিশেষ করে রেখেছেন, তাই তিনি আজও সত্যিকার অর্থেই আকাশের তারকা। চার দশক আগে যেমন তাঁর তারকাদীপ্তি ছিল, আজও ঠিক তেমনই আছে।’
রুনা লায়লার এই একক সংগীতানুষ্ঠান ঘিরে দর্শক-শ্রোতাদের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ৭০০ আসনের জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে একটি আসনও ফাঁকা ছিল না। আয়োজকদের ভাষ্য, টিকিট বিক্রি শুরুর প্রথম দিনেই সব টিকিট শেষ হয়ে যায়।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার কিছু পরে মঞ্চে উঠে রুনা লায়লা দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যাঁরা’ দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করেন। এরপর পরিবেশন করেন ‘শিল্পী আমি’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায়’, ‘যে জন প্রেমের ভাব জানে না’, ‘আমায় গেঁথে দাও না’, ‘বন্ধু তিন দিন’, ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’, ‘সাধের লাউ’ এবং প্রথমবারের মতো মঞ্চে নজরুলসংগীত ‘ভুলিতে পারি না’। দর্শকের বিশেষ অনুরোধে বহুল জনপ্রিয় ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ গেয়ে এই সংগীতসন্ধ্যার ইতি টানেন তিনি।
প্রতিটি গান শেষে মিলনায়তনজুড়ে করতালি আর উচ্ছ্বাস যেন জানিয়ে দিচ্ছিল—সময় বদলায়, কিন্তু রুনা লায়লার গান প্রজন্মের পর প্রজন্মে একই রকম আবেদন নিয়ে বেঁচে থাকে।