
‘বাদল না থাকলে আমাদের সংগীত আজ এ জায়গায় আসত না। শ্রোতারা তো শুধু আমাদেরই চিনে গেল, যেসব মানুষের জন্য গানগুলো শ্রোতা পর্যন্ত পৌঁছেছে, তাঁদের খবর কজন জানে? বাদল এমন একজন সংগীত প্রযোজক ছিলেন, যাঁর ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের সংগীত। একটা ভবন যেমন ফাউন্ডেশন আর পিলারের ওপর দাঁড়ায়, কিন্তু ভবনটি নির্মাণ হয়ে গেলে ঢাকা পড়ে পিলারগুলো। বাদল আমাদের সেই পিলার। আমাদের সংগীতের পিলার।’ কথাগুলো বলছিলেন সংগীতশিল্পী রফিকুল আলম। সদ্য প্রয়াত ‘সারগাম’ স্টুডিওর কর্ণধার ফারুক আহমেদ বাদলের স্মরণসভায় কথাগুলো বলছিলেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বনানীর ক্লাব নটরডেমিয়ানে এ আয়োজনে হাজির হয়েছিলেন বাংলা সংগীতের গীতিকার, সুরকার থেকে সংগীতশিল্পীরা।
আশির দশকের বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত তখনো মূলধারায় জায়গা করে নিতে পারেনি। এ ধারার গান নিয়ে আগ্রহ ছিল মূলত পশ্চিমা সংগীতপ্রেমী এক ছোট শ্রোতাগোষ্ঠীর মধ্যে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও ব্যান্ড অ্যালবাম ছিল বড় এক ঝুঁকির নাম। নতুন ধাঁচের সংগীত মানেই ছিল অনিশ্চয়তা, আর সেই অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগের সাহস তখন খুব কম মানুষেরই ছিল। সবাই যখন প্রচলিত ধারার নিরাপদ পথেই হাঁটছিল, ঠিক তখনই স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিলেন একজন—ফারুক কবির বাদল।
এই সময়েই ফারুক কবির বাদল তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘সারগাম’ নিয়ে এগিয়ে আসেন। তার আগে শাফাত আলীর ‘ইপসা রেকর্ডিং’ কিংবা জিগাতলার ‘ডিসকো রেকর্ডিং’ বেশ কিছু কাজ করেছিল। কিন্তু ‘সারগাম’ এসে যেন পুরো পরিস্থিতি পাল্টে দেয়।
স্টুডিওর পাশাপাশি স্টেডিয়াম মার্কেটে ছিল তাঁর ক্যাসেটের ব্যবসা। যেখানে বেশি বিক্রি হতো বিদেশি ব্যান্ডের ক্যাসেট। এটা দেখে বাদল ভাবেন, সবাই তো একক শিল্পীদের নিয়ে ব্যস্ত। দেশের ব্যান্ডগুলো দিয়ে যদি এ ধরনের অ্যালবাম বের করা হয়, তাহলে ঝুঁকি হলেও পরিস্থিতি পালটে যেতে পারে। শুরুর পর সাউন্ড কোয়ালিটি, প্রডাকশনের যত্ন আর শিল্পীদের প্রতি আস্থা—সব মিলিয়ে ‘সারগাম’ হয়ে ওঠে এক নতুন মানদণ্ড।
‘সারগাম’ শুধু একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল একটি আস্থার জায়গা। দিনের পর দিন টাকা ছাড়া নতুন ব্যান্ডদের শিফট দিতেন বাদল। অ্যালবাম ফ্রি রেকর্ড করে দিয়ে আবার নতুন ব্যান্ডের হাতে গুঁজে দিতেন টাকা। বলতেন, ‘দেখিস, এটা হিট করবে।’ তাঁর কথা যেন মিলে যেত। শ্রোতাদের কাছেও আস্থার নাম হয়ে উঠেছিল ‘সারগাম’।
তবে এই আস্থা তৈরি করা সহজ ছিল না। এর পেছনে ছিল বছরের পর বছর পরিশ্রম, এক্সপেরিমেন্ট, আর সবচেয়ে বড় কথা—শিল্পীদের প্রতি বিশ্বাস। স্মরণসভায় এমনই বলছিলেন বাংলা সংগীতের দিকপালেরা।
নিজেদের প্রথম অ্যালবামের স্মৃতিচারণা করেন ওয়ারফেজ ব্যান্ডের দলনেতা শেখ মনিরুল আলম। জানান, বাদল না থাকলে ব্যান্ডটি আজ এ পর্যন্ত পৌঁছাত না। সে সময়ের স্মৃতিচারণা করে টিপু বলেন, ‘তখন আমরা ইংরেজি গান করতাম। এমন সময় দেখা গেল ব্যান্ডের প্রায় সবাই উচ্চশিক্ষায় বাইরে চলে যাচ্ছে। মনে হলো, অন্য আরও ব্যান্ডের সঙ্গে মিলে একটা মিক্সড অ্যালবাম করে ফেলি। নিলয় দাদার (দাশ) মাধ্যমে পরিচয় হয় বাদল ভাইয়ের সঙ্গে। ভাইকে এ প্রস্তাব দেওয়ার পর মুখের ওপর না করে দেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলেন, ‘‘একক অ্যালবাম করার পটেনশিয়ালিটি তোমাদের আছে। তোমরা কেন মিক্সড করবে? গান নিয়ে আসো। আমি করে দিচ্ছি।’’ কিন্তু আমাদের তো এত গান ছিল না, এদিকে সবার হাতেই সময় কম, ফ্লাইটের সময় হয়ে গেছে। তো আমরা বলা যায় সংসার পাতলাম সারগামে। বালিশ, কাঁথা নিয়ে চলে এলাম। এখানেই বাজার, খাওয়া, আর গান। গানগুলো যখন একটি একটি করে শুনছিলেন বাদল ভাই। আর বলছিলেন, ‘‘দেখছ মিয়া, বলছিলাম না।’’ এভাবেই শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি পাই আমরা।’ এদিন টিপু আরও জানান, দ্বিতীয় অ্যালবামের জন্য ‘সারগাম’ থেকে তাঁরা সম্মানী পেয়েছিলেন প্রথম অ্যালবামের ১০ গুণের বেশি।
ওয়ারফেজের মতো রেনেসাঁ ব্যান্ডের প্রথম অ্যালবামও প্রকাশ পেয়েছিল ‘সারগাম’ থেকে। সে স্মৃতি নিয়ে নকীব খান বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে তখন ঢাকায় এলাম। নতুন ব্যান্ড, নিজেরা প্র্যাকটিস নিয়ে ব্যস্ত। এমন সময় একদিন প্যাডে এল বাদল। বলল, ‘‘ভাই, একটা অ্যালবাম করে দিই।’’ এ কথা শুনে বললাম, তুমি কি পাগল, একটা অ্যালবামের এত গান কই পাব। আর আমাদের এ মেলোডি–ধাঁচের অ্যালবাম তো চলবেই না। তুমি ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবা। বাদল বলল, ‘‘ভাই, আপনারা যা করবেন, তাতেই হবে। আমি এখানে কোনো কথা বলব না। ব্যবসা নিয়ে ভাবছি না।’’ এভাবেই প্রথম অ্যালবাম বের হয় আমাদের।’
নকীব খান আরও বলেন, ‘ব্যান্ডশিল্পীরা যে একক অ্যালবামে কাজ করতে পারে, এ বিশ্বাস বাদল করিয়েছিল। ফাহমিদা নবী, সামিনার প্রথম অ্যালবাম বাদলের সাহসেই করেছিলাম।’
স্মরণসভায় সুখের স্মৃতির সঙ্গে কষ্টের স্মৃতিও উঠে এসেছিল। পুরো আয়োজনে বারবার চোখ মুছেছেন সবাই। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি থেকে সংগীতের বাজারে পরিবর্তন আসতে শুরু করে, নতুন নতুন প্রযুক্তি আসে, প্রতিযোগিতা বাড়ে। এই সময়টাতে বাদল ধীরে ধীরে নিজেকে প্রযোজনার মূল স্রোত থেকে সরিয়ে নেন। একসময় তিনি প্রবাসে চলে যান। টানা ২৭ বছর সেখানে থেকে তিন বছর আগে দেশে ফেরেন তিনি। তবে কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। শুধু গীতিকার বাপ্পী খানের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তাঁর মাধ্যমেই সবাই বাদলের মৃত্যুসংবাদ জানতে পারেন।
বাদলের অভিমান নিয়ে বাপ্পী খান বলেন, ‘আমাকে প্রমিজ করিয়েছিল, কাউকে যেন না বলি যে তিনি দেশে আছেন। কয়েকবারই জানতে চেয়েছি, ভাই কিসের এত কষ্ট আপনার? চুপ করে থাকতেন।’
স্মরণসভায় এসেছিলেন বাদলের একমাত্র কন্যা মাইশা কবির। যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা পেশায় যুক্ত তিনি। বাবার এ গল্পগুলো কখনো জানতেন না মাইশা। এমনকি বাবার সঙ্গে দেশেও কোনো স্মৃতি নেই তাঁর। শুধু অ্যালবাম দেখে জেনেছিলেন, দেশের সব তারকা সংগীতশিল্পীরা বাবার পরিচিত।
ফারুক কবির বাদলের স্মরণসভায় আরও কথা বলেন ফিডব্যাকের ফোয়াদ নাসের বাবু, সুরকার ও সংগীত পরিচালক মাকসুদ জামিল মিন্টু, নোভা ব্যান্ডের আহমেদ ফজল, গীতিকার লিটন অধিকারী রিন্টু , আসিফ ইকবাল, মাইলস–এর মানাম আহমেদ, নাসিম আলী খান। পুরো আয়োজন সঞ্চালনায় ছিলেন ফেরদৌস বাপ্পী।