একসময় নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে বেড়ে ওঠা এক তরুণী জীবিকার তাগিদে কাজ করতেন সুপারমার্কেটে, পরে স্ট্রিপ ক্লাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অকপট কথাবার্তা তাঁকে পরিচিত করে তোলে। সেই পরিচিতিকে পুঁজি করেই একসময় সংগীতজগতে পা রাখেন তিনি। এরপর ‘বোদাক ইয়েলো’ গান দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংগীতের শীর্ষে উঠে আসা, গ্র্যামি জয়, কোটি কোটি ডলারের সম্পদ, আর একের পর এক বিতর্ক—সব মিলিয়ে তিনি কার্ডি বি।
আজ ১১ অক্টোবর ৩৪ বছরে পা দিলেন এই মার্কিন র্যাপার। তাঁর প্রকৃত নাম বেলকালিস মারলেনিস আলমানজার। ১৯৯২ সালের এই দিনে নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসে জন্ম তাঁর। ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত এই শিল্পীর মা ত্রিনিদাদের এবং বাবা ডোমিনিকান বংশোদ্ভূত। ছোটবেলা থেকেই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি। তবে নিজের অতীত আড়াল না করে বরং সেই অভিজ্ঞতাকেই পরিণত করেছেন তাঁর পরিচয়ের অংশে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংগীতের শীর্ষে
কার্ডি বির পরিচিতি প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয়। তাঁর সরাসরি কথা বলার ধরন, হাস্যরস, অকপট স্বীকারোক্তি এবং নিজের জীবন নিয়ে রাখঢাক না করার প্রবণতা দ্রুত মানুষের নজর কাড়ে। পরে ২০১৫ সালে রিয়েলিটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘লাভ অ্যান্ড হিপ হপ: নিউইয়র্ক’–এ যোগ দিয়ে আরও বড় দর্শকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যান তিনি।
তবে টেলিভিশনের পরিচিতিকে স্থায়ী সংগীতজীবনে রূপ দেওয়াই ছিল তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৭ সালে অনুষ্ঠানটি ছেড়ে পুরোপুরি সংগীতে মনোযোগ দেন কার্ডি। একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর গান ‘বোদাক ইয়েলো’। গানটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যায় এবং বিলবোর্ড হট ১০০–এর ১ নম্বরে পৌঁছায়।
এ সাফল্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক মাইলফলক। প্রায় দুই দশক পর কোনো একক নারী র্যাপারের নিজস্ব গান হিসেবে ‘বোদাক ইয়েলো’ বিলবোর্ডের এই তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নেয়। এর আগে ১৯৯৮ সালে লরিন হিলের ‘ডু ওয়াপ (দ্যাট থিং)’ একই কৃতিত্ব অর্জন করেছিল। ‘বোদাক ইয়েলো’ কার্ডি বির পরিচিতিকে রাতারাতি বদলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তারকা থেকে তিনি হয়ে ওঠেন মূলধারার সংগীতশিল্পী।
২০১৮ সালে প্রকাশিত কার্ডি বির প্রথম অ্যালবাম ‘ইনভেশন অব প্রাইভেসি’ বিলবোর্ড ২০০–এর শীর্ষে ওঠে। পরের বছর এই অ্যালবামের জন্য সেরা র্যাপ অ্যালবাম বিভাগে গ্র্যামি পুরস্কার জেতেন কার্ডি। একক নারী হিসেবে এই বিভাগে পুরস্কার জেতার প্রথম শিল্পী তিনি।
‘আই লাইক ইট’ থেকে ‘ডব্লিউএপি’
কার্ডি বির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে তাঁর স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর, ছন্দের ব্যবহার ও আত্মবিশ্বাসী পরিবেশনা। ‘বোদাক ইয়েলো’র পর ২০১৮ সালে প্রকাশিত ‘আই লাইক ইট’ গানটি তাঁকে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে আরও পরিচিত করে। ব্যাড বানি ও জে বালভিনের সঙ্গে করা গানটি যুক্তরাষ্ট্রের বিলবোর্ড হট ১০০–এর শীর্ষে ওঠে। লাতিন সংগীতের প্রভাব ও র্যাপের মিশ্রণ গানটিকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
একই বছর মার্কিন ব্যান্ড মারুন ৫–এর ‘গার্লস লাইক ইউ’ গানে অতিথি শিল্পী হিসেবে অংশ নেন কার্ডি। গানটি দীর্ঘ সময় জনপ্রিয় তালিকায় ছিল। পরে ‘আপ’, ‘মানি’ এবং মেগান দি স্ট্যালিয়নের সঙ্গে ‘ডব্লিউএপি’ তাঁর আলোচিত গানগুলোর তালিকায় যুক্ত হয়। ‘ডব্লিউএপি’ প্রকাশের পর এর স্পষ্ট যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা ও ভিডিও নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে সেই বিতর্কই গানটিকে ঘিরে জনআলোচনার পরিসর বাড়িয়ে দেয়।
কার্ডি বির গান নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই উঠে আসে তাঁর ভাষা, আত্মপ্রকাশের ধরন ও নারীর যৌনতা নিয়ে প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। সমর্থকেরা তাঁর অকপটতাকে স্বাধীনতার প্রকাশ হিসেবে দেখেন। সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, তাঁর গানের ভাষা ও উপস্থাপনা অতিরিক্ত স্পষ্ট। এই দুই বিপরীত প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই গড়ে উঠেছে তাঁর তারকাখ্যাতির একটি বড় অংশ।
২০২৫ সালে সাত বছরের বিরতির পর প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় স্টুডিও অ্যালবাম ‘অ্যাম আই দ্য ড্রামা?’। অ্যালবামটি বিলবোর্ড ২০০–এর শীর্ষে অভিষেক করে। দীর্ঘ বিরতির পরও শ্রোতাদের আগ্রহ ধরে রাখতে পারা তাঁর সংগীতজীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক।
২০২৬ সালেও নতুন গান প্রকাশ অব্যাহত রেখেছেন কার্ডি। ৮ অক্টোবর প্রকাশিত ‘ডোন্ট চার্ট’ গানটি ‘জিটিএভিআই: দ্য অ্যালবাম’–এর অংশ।
সংগ্রামের গল্প, নিজের অতীত আড়াল করেননি
কার্ডি বির জীবনের শুরুর দিকটা সহজ ছিল না। ব্রঙ্কসে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী কৈশোরে নানা আর্থিক ও ব্যক্তিগত সমস্যার মুখোমুখি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহের জন্য সুপারমার্কেটে কাজ করেছেন। পরে স্ট্রিপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন ও প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে সেই কাজ তাঁকে সহায়তা করেছিল।
কার্ডি বির জীবনের এই অধ্যায় নিয়ে নানা সময় সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু কার্ডি নিজের অতীতকে লুকানোর চেষ্টা করেননি; বরং কীভাবে জীবিকার প্রয়োজনে বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, নিজের পরিস্থিতি বদলানোর জন্য তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, সেটিকে তিনি জীবনের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবেই দেখেন।
বিতর্কও পিছু ছাড়েনি
কার্ডি বি যতটা জনপ্রিয়, তাঁকে ঘিরে বিতর্কও ততটাই আলোচিত। তাঁর গানের কথা, প্রকাশ্য মন্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডা এবং ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে ‘ডব্লিউএপি’ গানটির যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথা ও ভিডিও নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি সমর্থকেরাও যুক্তি দেন, নারীর নিজের শরীর ও যৌনতা নিয়ে কথা বলার অধিকার রয়েছে।
২০১৯ সালে এক পুরোনো ঘটনা নিয়ে নতুন করে বিতর্কে জড়ান কার্ডি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি স্ট্রিপার হিসেবে কাজ করার সময় পুরুষদের মাদক প্রয়োগ করে অর্থ নেওয়ার কথা বলেছিলেন। বক্তব্যটি ঘিরে তীব্র সমালোচনা হয়। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট ঘটনার আইনি অবস্থাকে এক করে দেখা উচিত নয়।
ইউটিউব ব্যক্তিত্ব তাশা কের সঙ্গে তাঁর আইনি লড়াইও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কার্ডি অভিযোগ করেছিলেন, তাশা কে তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচার করেছেন। ২০২২ সালে ফেডারেল জুরি কার্ডির পক্ষে রায় দেন এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে সেই অর্থ আদায় নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
এ ছাড়া ২০১৮ সালে বেভারলি হিলসের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে সংঘটিত কথিত হামলার অভিযোগে সাবেক এক নিরাপত্তাকর্মীর করা দেওয়ানি মামলায়ও ২০২৫ সালে বিচারের মুখোমুখি হন কার্ডি। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং এসব অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি।
অফসেটের সঙ্গে বিয়ে, বিচ্ছেদ ও নতুন সম্পর্ক
কার্ডি বির ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি র্যাপার অফসেটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। ২০১৭ সালে তাঁদের সম্পর্কের কথা প্রকাশ্যে আসে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে গোপনে বিয়ে করেন তাঁরা। পরে অক্টোবরে একটি অনুষ্ঠানে অফসেট তাঁকে প্রকাশ্যে বিয়ের প্রস্তাব দেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে ভক্তদের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
তবে সম্পর্কটি ছিল উত্থান–পতনে ভরা। বিচ্ছেদ, পুনর্মিলন ও পরস্পরকে ঘিরে নানা গুঞ্জনের মধ্যে ২০২০ সালে প্রথমবার বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেছিলেন কার্ডি। পরে সেই আবেদন প্রত্যাহার করেন। ২০২৩ সালের শেষ দিকে তাঁরা আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা জানান। ২০২৪ সালের আগস্টে কার্ডি আবার বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও তাঁদের বিচ্ছেদ আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। সন্তানদের জন্মদিনের মতো পারিবারিক আয়োজনে অবশ্য দুজনকে একসঙ্গে দেখা গেছে।
কার্ডি ও অফসেটের তিন সন্তান—কালচার, ওয়েভ ও ব্লসম। তাঁদের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য ও প্রকাশিত তথ্য আলাদা করে দেখা জরুরি; সব গুঞ্জনকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
অফসেটের সঙ্গে সম্পর্ক ভাঙার পর কার্ডির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল তারকা স্টেফন ডিগসের সম্পর্কের খবর সামনে আসে। ২০২৫ সালে কার্ডি জানান, তিনি ডিগসের সন্তানের মা হতে চলেছেন। একই বছরের নভেম্বরে তাঁদের ছেলে জন্ম নেয়।
কত সম্পদের মালিক কার্ডি বি
সংগীতের সাফল্য কার্ডি বির জীবনে এনেছে বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। গান থেকে আয়, অ্যালবাম বিক্রি, স্ট্রিমিং, কনসার্ট, বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তি, অভিনয় ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ—সব মিলিয়ে তাঁর আয়ের উৎস বিস্তৃত।
‘সেলিব্রিটি নেট ওর্থ’–এর ২০২৬ সালের আগস্টে হালনাগাদ করা হিসাব অনুযায়ী, কার্ডি বির আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ ১২ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়েও কাজ করেছেন কার্ডি। ২০১৯ সালে ‘হাসলার্স’ ছবিতে জেনিফার লোপেজের সঙ্গে দেখা গেছে তাঁকে। পরে ‘এফ নাইন’–এও অভিনয় করেন। এসব কাজ তাঁর পরিচিতিকে সংগীতের বাইরেও ছড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৬ সালে কার্ডি ‘গ্রো–গুড বিউটি’ নামে প্রসাধনী ব্র্যান্ডও চালু করেছেন।
গ্র্যামিডটকম, পেজ সিক্স ও বিলবোর্ড অবলম্বনে