
নিরাপত্তা ছাড়পত্র না পেয়ে একের পর এক স্থগিত হচ্ছে কনসার্ট। আবার অনুমতি পাওয়ার পরও দর্শকের চাপ সামলাতে না পেরে অনুষ্ঠান বাতিল হচ্ছে, কখনো অনুমতি ছাড়াই পরিবর্তন হচ্ছে ভেন্যু, আবার কখনো টিকিট ছাড়াই ভেন্যুতে ঢুকে পড়ছেন দর্শক। সব মিলিয়ে দেশে ওপেন এয়ার কনসার্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আয়োজক, শিল্পী ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বললেন মনজুর কাদের
যমুনা ফিউচার পার্কে ‘রক এন রিদম ৫.০: নো লিমিটস ইন দ্য জোন’ কনসার্ট ছিল গত ২৩ অক্টোবর। সেখানে জেমস গান গাইতে মঞ্চে ওঠার আগেই নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে টিকিট ছাড়াই অনুষ্ঠানস্থলে ঢুকে পড়েন শতাধিক মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে প্রধান ফটক খুলে দিতে বাধ্য হয় আয়োজক। এতে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটে আসা দর্শকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও কনসার্টের ব্যবস্থাপনা নিয়েও অসন্তোষ দেখা যায়।
এই কনসার্টের প্রভাব পরবর্তী আয়োজনেও গিয়ে পড়েছে। ১৪ নভেম্বর ‘নভেম্বর রেইন’ নামে একটি ওপেন এয়ার কনসার্টের আয়োজন করেছিল ব্রান্ডমিথ কমিউনিকেশনস। প্রতিষ্ঠানটির বিপণন বিভাগের প্রধান রাকিবুল আজম গত শুক্রবার প্রথম আলোকে জানান, ভেন্যুর সঙ্গে চুক্তি এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের অনাপত্তিপত্রসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু ২৩ অক্টোবরের কনসার্টে বিশৃঙ্খলার পর নিরাপত্তার অজুহাতে নতুন করে উন্মুক্ত কনসার্ট আয়োজন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভেন্যু কর্তৃপক্ষ। বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সামনের জায়গা ও মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও ইতিবাচক সাড়া পাননি তাঁরা। আয়োজকদের মতে, শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটি স্থগিত রাখতে হয়েছে। তাঁদের মতে, একটি ভিন্ন আয়োজনের অব্যবস্থাপনার প্রভাব তাঁদের তিন মাসের প্রস্তুতি ও বিনিয়োগের ওপরও পড়েছে।
এর আগে এ বছরেরই ১৮ এপ্রিল ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে ব্যান্ড অ্যাশেজের একটি উন্মুক্ত কনসার্ট বাতিল হয়। সম্ভাব্য দর্শকের সংখ্যা সামলানোর মতো জায়গা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় আয়োজকেরা পিছিয়ে আসেন। অ্যাশেজের ভোকাল জুনায়েদ ইভান তখন জানিয়েছিলেন, প্রত্যাশিত দর্শক সামলানো সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা ছিল। এরপর গত ২৪ জুলাই পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী আতিফ আসলামের ঢাকার কনসার্টেও অনুমতি নেওয়া ভেন্যুর পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে নিরাপত্তার ছাড়পত্র না পাওয়ায় স্থগিত হয় ‘মাহএক্স রিপাবলিক’ ও কাবিশের ‘ওয়েভ ফেস্ট’।
আয়োজক ও নিরাপত্তা বাহিনী কী বলছে
কনসার্ট আয়োজনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ট্রিপল টাইম কমিউনিকেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রীতম দে বলেন, ভেন্যু বড় একটি বিষয়। ঢাকার অনেক জায়গায় কনসার্ট হলেও সেগুলো প্রকৃত অর্থে কনসার্ট আয়োজনের উপযোগী ভেন্যু নয়। প্রবেশপথে যেন বিশৃঙ্খলা না হয়, সে জন্য সিসিটিভি ক্যামেরাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা রাখা হয়। তবে বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের সহযোগিতাও প্রয়োজন হয়। আর্মি স্টেডিয়ামের মতো জায়গায় নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সহযোগিতা থাকায় জটিলতা থাকে না। কনসার্টে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ওসমান গণি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি কনসার্টের আগে আমরা সিকিউরিটি অ্যাসেসমেন্ট করি, এরপর আয়োজক প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিই। সিকিউরিটি অ্যাসেসমেন্টে সমস্যা থাকলে আমরা অনুমতি দিই না।’ তাঁর মতে, আয়োজকদের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা, সিসিটিভি ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করতে হয়। সেগুলো মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকির ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে পুলিশের জনবলের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিটি কনসার্টে শত শত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা সম্ভব নয়। আয়োজকদের আনসার সদস্য ও নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীর মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
অনুমতির শর্ত লঙ্ঘন করলে আয়োজকদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং নিরাপত্তা তদারকিতে ঘাটতি পাওয়া গেলে কী করা হয়, জানতে চাইলে ওসমান গণি বললেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সতর্ক করা হয় এবং পরেরবার সেই প্রতিষ্ঠানকে আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয় না।’
কনসার্টের বাইরের সড়ক ও যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তুলে ধরেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান। গত শুক্রবার বিকেলে তিনি বলেন, কনসার্টের খবর আগে থেকে জানানো হলে সংশ্লিষ্ট এলাকাকে কেন্দ্র করে ট্রাফিক পরিকল্পনা করা হয়। আয়োজকেরা তাঁদের পরিকল্পনা জানান, ডিসি পর্যায়ে সভা হয়, এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁর মতে, কনসার্টের আগে ও পরে এক ঘণ্টা ট্রাফিক পুলিশকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। নিরাপত্তার বিষয়টি ডিএমপির ক্রাইম বিভাগ দেখে আর যানবাহন চলাচলের দিকটি সামলায় ট্রাফিক বিভাগ। দুই বিভাগ যৌথভাবে কাজ করে।
চাই স্থায়ী ভেন্যু
তবে সংকটের সমাধান হিসেবে শুধু নিরাপত্তাকর্মী বাড়ানোকে যথেষ্ট মনে করছেন না বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা) সভাপতি হামিন আহমেদ। তাঁর মতে, কনসার্টে দর্শকের ব্যাপক উপস্থিতি বেড়েছে। অথচ সেই চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ স্থায়ী ভেন্যু নেই। হামিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণে দুটি কনসার্টের ভেন্যু এখন সময়ের দাবি।’ তাঁর প্রস্তাব, এমন দুটি স্থায়ী ও উপযুক্ত ভেন্যু থাকা দরকার, যেখানে নিয়মিত কনসার্ট আয়োজন করা যাবে এবং দর্শকের প্রবেশ, বের হওয়া ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের যথাযথ ব্যবস্থা থাকবে।
হামিন আহমেদ আরও মনে করেন, বড় কনসার্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনকে আয়োজকদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। পুলিশের জনবলের সীমাবদ্ধতা থাকলে আনসার বাহিনীকেও যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি কনসার্ট আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, ‘ইচ্ছা হলো কয়েকজন বন্ধু মিলে করে ফেললাম, এসবের জায়গা এখন বাংলাদেশে নেই।’ আয়োজকদের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় জনবল যাচাই করে নিবন্ধনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
কথা হয় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মের সঙ্গে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি প্রথম আলোকে বললেন, ‘দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন দীর্ঘদিন ধরে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কনসার্ট আয়োজনের উপযুক্ত ভেন্যুর সংকটও রয়েছে। এ সমস্যা সমাধানে পূর্বাচলের শেষ প্রান্তে বড় পরিসরে একটি কালচারাল হাব গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা চলছে। সেখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কনসার্ট আয়োজনের জন্য নির্দিষ্ট ভেন্যু রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।’