
কলকাতার জনপ্রিয় নির্মাতা অনীক দত্তের মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য। দক্ষিণ কলকাতার হিন্দুস্তান পার্ক এলাকার বহুতল আবাসনের ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধারের খবর জানিয়েছে কলকাতার কয়েকটি গণমাধ্যম। এর পর থেকেই এই মৃত্যু নিয়ে চাঞ্চল্য আরও বেড়েছে।
বুধবার দুপুরে গুরুতর আহত অবস্থায় অনীক দত্তকে উদ্ধার করে ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয় থানার পাশাপাশি লালবাজারের হোমিসাইড শাখার কর্মকর্তারাও তদন্তে নেমেছেন। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, এটি দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে। যদিও ওই নোটে ঠিক কী লেখা ছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি পুলিশ। বহুতলের সিসিটিভি ফুটেজও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, বহুতলের নিচে একটি গাছের ডাল ভাঙা অবস্থায় দেখা গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, নিচে পড়ার আগে সেটিতে ধাক্কা লেগেছিল। তবে পুরো ঘটনাটি নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা কাটেনি।
ঘনিষ্ঠদের সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই অবসাদে ভুগছিলেন অনীক দত্ত। শারীরিক অসুস্থতার কারণেও ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। এমনকি গত বছর নিজের শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ মুক্তির আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ ছবি।’ টলিউডের ভেতরের দলাদলি ও অসহযোগিতা নিয়েও প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়েছিলেন তিনি। মুম্বাইয়ের বিজ্ঞাপনী জগতের প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছেড়ে বাংলা সিনেমার জন্য কলকাতায় ফিরেছিলেন এই নির্মাতা। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির নানা রাজনীতি ও হতাশা তাঁকে ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত করছিল বলেও জানিয়েছিলেন ঘনিষ্ঠদের কাছে।
২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন অনীক দত্ত। প্রথম ছবিতেই তিনি বাংলা সিনেমায় আলোড়ন তুলেছিলেন। ব্যঙ্গ, রসবোধ আর রাজনৈতিক ইঙ্গিতে ভরা ছবিটি শুধু বক্স অফিসে সফলই হয়নি, সময়ের সঙ্গে ‘কাল্ট ক্ল্যাসিক’-এর মর্যাদাও পায়। কলকাতার এক পুরোনো ভুতুড়ে বাড়িকে কেন্দ্র করে তৈরি এই সিনেমায় মধ্যবিত্ত বাঙালির নস্টালজিয়া, রাজনীতি ও আধুনিক পুঁজিবাদের সংঘাতকে ভিন্নধর্মী ভাষায় তুলে ধরেছিলেন তিনি।
এরপর ২০১৩ সালে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘আশ্চর্য প্রদীপ’। এই ছবিতে মধ্যবিত্ত মানুষের লোভ, ভোগবাদ আর করপোরেট সংস্কৃতিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেন তিনি। ছবির গানের গীতিকার হিসেবেও কাজ করেছিলেন অনীক দত্ত নিজেই।
২০১৭ সালে আসে ‘মেঘনাদবধ রহস্য’। মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্যিক আবহকে ঘিরে নির্মিত এই রহস্য-থ্রিলার ছবিতেও দেখা যায় তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত গল্প বলার ধরন। পরে ‘ভবিষ্যতের ভূত’ নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেন তিনি। রাজনৈতিক ব্যঙ্গধর্মী এই ছবিটি মুক্তির পর হঠাৎ কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহ থেকে সরিয়ে নেওয়া হলে তুমুল আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই এটিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন হিসেবে দেখেছিলেন।
২০২০ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘বরুণবাবুর বন্ধু’। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়ে নির্মিত এই ছবিতে এক নিঃসঙ্গ, নীতিমান বৃদ্ধের জীবনসংকট ও সামাজিক বাস্তবতা উঠে আসে। তবে অনীক দত্তের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় মাইলফলক হয়ে আছে ২০২২ সালের ‘অপরাজিত’। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ নির্মাণের নেপথ্যের গল্প নিয়ে তৈরি এই সাদা-কালো সিনেমাটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা পায়। অনেকেই ছবিটিকে সত্যজিৎ রায়ের প্রতি অনীকের শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে দেখেছেন।
সবশেষে ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ দিয়ে আবারও রহস্য ও ব্যঙ্গের মিশেলে দর্শকদের সামনে হাজির হয়েছিলেন তিনি। ট্রেলার প্রকাশের পর থেকেই ছবিটি নিয়ে দর্শকদের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
চলচ্চিত্র পরিচালনায় আসার আগে দীর্ঘদিন বিজ্ঞাপনজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অনীক দত্ত। বহু জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলা সিনেমাই হয়ে উঠেছিল তাঁর মূল পরিচয়। সমসাময়িক বাংলা সিনেমায় তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ ও নাগরিক রসবোধকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন তিনি।
মাত্র পাঁচ দিন আগেই ছিল এই নির্মাতার জন্মদিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো স্মৃতিও ভাগ করে নিয়েছিলেন তিনি। সেই জন্মদিনের কয়েক দিনের মধ্যেই এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে টলিউডে।